ক্যাটাগরি: মান নিয়ন্ত্রণ | মাৎস্য প্রযুক্তি

ক্রেতা অধিকার সংরক্ষণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের চিংড়ি পণ্যের মান উন্নয়ন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চিংড়ি শিল্প একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে চিংড়ির মোট উৎপাদন ছিল ২২৩,০৯৫ মে. টন যার মধ্যে ৪৯৯০৭ মে. টন চিংড়ি রপ্তানী করে ২৮৬৩.৯২ কোটি টাকার সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে (মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৯)। বর্তমানে চিংড়ি কারখানায় চিংড়ি ও মত্স্যজাত পন্যের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য হ্যাসাপ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয়েছে । মাঠ পর্যায়েও হ্যাসাপ নীতিমালার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। কারণ চুড়ান্ত পর্যায়ে চিংড়ির মান রক্ষার প্রথম পদক্ষেপই হল খামার থেকেই এর পরিচর্যা ও পরিবহনের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা। তাই গুণগতমান নিয়ন্ত্রণের জন্য আহরণের পর থেকেই সতর্কতার সাথে চিংড়ি পরিচর্যা, সংরক্ষন ও পরিবহনের কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন যাতে ক্রেতার অধিকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির গুণগতমানের বিষয়ে ক্রেতাদের অভিযোগের কারণে ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে ১৭,৭৯০.৫২ মে. টন, ২০০৫-০৬ এ ১৮,২১১.৫২ মে. টন, ২০০৬-০৭এ ২৩,৭৭৬.৩৭ মে. টন, ২০০৭-০৮ এ ৩৪,৫৬০.০০ মে. টন ও ২০০৮-০৯ এ ২৯,৭৬০.০০ মে. টন চিংড়ি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয় প্রধানত নাইট্রোফুরানের উপস্থিতির কারণে (কামাল, ২০১০)। নাইট্রোফুরানসহ অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান খামার, ডিপো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার যে কোন পর্যায়ে সংমিশ্রিত হতে পারে। এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণ কোন পর্যায়ে ঘটছে তা খুঁজে বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদিও তা একটি দুরূহ ব্যাপার। কারণ একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় চিংড়ি সরবরাহ করে একাধিক ডিপো এবং এবং একটি ডিপোতে চিংড়ি সরবরাহ করে অসংখ্য খামারিরা। তবুও তা নির্ণয়ের জন্য বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ একটি ট্রেসিবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছে যা সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছে এবং তা সারাদেশে বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। চিংড়ি দ্রুত পচনশীল পণ্য হওয়ায় এর আহরণ, আহরণোত্তর পরিচর্যা ও পরিবহনের সময় থেকেই এর মান দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। তিনটি প্রধান পর্যায়ে মূলত চিংড়ির মান দ্রুত হ্রাস পেয়ে থাকে।

  • খামার পর্যায়ঃ চিংড়ির পোনা (পি.এল.) সংগ্রহ, মজুদ, চাষ, আহরণ ও ডিপোতে পৌছানো পর্যন্ত এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
  • ডিপো পর্যায়ঃ ডিপোতে প্রবেশের থেকে থেকে চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পৌছানো পর্যন্ত এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
  • প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পর্যায়ঃ কারখানায় প্রবেশের পর থেকে রপ্তানী পর্যন্ত এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

উল্লেখিত পর্যায় গুলোতে কিভাবে চিংড়ির মান হ্রাস পেতে পারে এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় কি তা নিচে আলোচনা করা হল।

খামার পর্যায়ঃ

মৎস্য অধিদপ্তর এবং বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ (২০০৭ ক) প্রণীত গুণগতমান নষ্টের প্রধান কারণ ও মান উন্নয়নে করণীয় বিষয়গুলো নিম্নরূপ-

গুণগতমান নষ্টের গুরুত্বপূর্ণ কারণসমূহঃ

  • চিংড়ি ধরার পর অধিকাংশ সময়েই পরিষ্কার পানিতে না ধোয়া ও ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখার ব্যবস্থা না থাকা।
  • দীর্ঘ সময় ধরে চিংড়ি ধরা এবং দীর্ঘ সময় বরফ ছাড়া উচ্চ তাপমাত্রায় চিংড়ি রেখে দেয়া।
  • অপরিষ্কার মেঝেতে চিংড়িকে স্তূপীকৃত করে রাখা।
  • পানির মধ্যে চিংড়িকে ডুবিয়ে রাখা এবং চাপ প্রয়োগ করে শরীর থেকে পানি বের করা।
  • গুণগতমান ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে কর্মচারীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা।

উচ্চমান সম্পন্ন চিংড়ি উৎপাদনে অবশ্য করণীয়ঃ

  • ভোরে বা ঠান্ডা আবহাওয়ায় চিংড়ি আহরণ করতে হবে এবং আহরণের সময় যাতে আঘাত প্রাপ্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • আহরণের পর জীবাণুমুক্ত মসৃন পাকা জায়গা বা পরিষ্কার প্লাস্টিক সিটের ব্যবস্থা করা ও ধোয়ার জন্য স্বাস্থ্য সম্মত ভাল পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • চিংড়ি খামারে গোবর, হাঁস, মুরগির বিষ্ঠা ও খাদ্য, ক্ষতিকারক অ্যান্টিবায়োটিকস যেমন: নাইট্রোফিউরান ও ক্লোরামফেনিকল, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, হরমোন ও কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না।
  • চিংড়ি ধরার সাথে সাথে চিংড়ি সংরক্ষন, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি ধাপে পর্যাপ্ত বরফ ব্যবহার করতে হবে।
  • পৃথক, পৃথক সময়ে ধরা চিংড়ি আলাদা করে রাখতে হবে।
  • চিংড়ি খামারে হ্যাসাপ পদ্ধতি চালু করতে হবে এবং সঠিক পানি ব্যাবস্থাপনা ও সুস্থ-সবল পোনা মজুদ করতে হবে।

ডিপো পর্যায়ঃ

মৎস্য অধিদপ্তর এবং বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ (২০০৭ খ) প্রণীত ডিপোতে গুণগতমান নষ্টের কারণ ও মান উন্নয়নে করণীয় বিষয়গুলোর নিম্নরূপ-

চিংড়ির গুণগতমান নষ্টের প্রধান কারণঃ

  • অধিকাংশ সময়ই পরিষ্কার পানিতে চিংড়ি ধোয়া হয় না ও বেশিরভাগ ডিপোতে সেনেটারি লেট্রিনের না থাকা।
  • ফুট ডিপো এর ব্যবস্থা না থাকা, ধুলাবালি, কাদামাটি, ঘাস, মাছি ইত্যাদির মাধ্যমে চিংড়ি দুষিত হওয়া।
  • অপরিষ্কার মেঝের উপর চিংড়িকে বাছাই করা এবং বাছাই এর জন্য স্টেইনলেস স্টিল টেবিল ব্যবহার না করা।
  • পানির মধ্যে চিংড়িকে ডুবিয়ে রাখা এবং চাপ প্রয়োগ করে শরীর থেকে পানি বের করা।
  • গুণগতমান ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে কর্মচারীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা এবং সাধারন স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলা।
  • ডিপো থেকে কারখানার দুরত্ব বেশী হওয়া এবং কারখানার চিংড়ি সরবরাহকারীর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা।

উচ্চমান সম্পন্ন চিংড়ি উৎপাদনে করণীয় প্রধান প্রধান বিষয়াবলিঃ

  • ডিপোতে হ্যাসাপ পদ্ধতি চালু করা।
  • বরফ ঠান্ডা পানিতে দ্রুত ভালভাবে পরিষ্কার করা এবং স্তরে স্তরে কুচি বরফ মিশিয়ে চিংড়ি সাময়িকভাবে মজুদ রাখা।
  • ১:১ অনুপাতে চিংড়ি ও বরফ মিশিয়ে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় প্রেরণ করা এবং প্রেরণের জন্য এমন বাক্স ব্যবহার করা যেন চোয়ানো পানি বাক্সের মধ্যে না পড়ে।
  • স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পর্যায়ঃ
মৎস্য অধিদপ্তর এবং বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ (২০০৭ গ) প্রণীত প্রসেসিং কারখানায় গুণগতমান নষ্টের প্রধান কারণ ও মান উন্নয়নে করণীয় –

চিংড়ির গুণগতমান নষ্টের প্রধান কারণঃ
ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারা খাদ্য বিভিন্নভাবে দুষিত হতে পারে যেমন:

  • মানুষ বা যন্ত্রপাতি খাদ্যের সংস্পর্শে আসলে।
  • এক খাদ্য হতে অন্য খাদ্যে।

উচ্চমান সম্পন্ন চিংড়ি উৎপাদনে করণীয়ঃ

  • প্রসেসিং কারখানাতে হ্যাসাপ পদ্ধতি চালু করতে হবে।
  • বাহির থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় নিয়ে আসা এবং কারখানায় ব্যবহৃত পোশাক, জুতা, গামবুট এবং অন্যান্য সামগ্রী রাখার জায়গা আলাদা রাখতে হবে।
  • খাবারের পূর্বে ও পরে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পূর্বে ও পরে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে।
  • প্রসেসিং কারখানা ব্যতীত অন্য কোথাও চিংড়ির মাথা ছাড়ানো যাবে না ও চিংড়ি শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

উপরোক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে একদিকে যেমন যথাযথ গুনগত মানসম্পন্ন চিংড়ি পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানী সম্ভব হবে তেমনি সাথে সাথে ক্রেতার অধিকারও সংরক্ষন সম্ভব হবে। ক্রেতার অধিকার রয়েছে গুণগতমান সম্পন্ন পণ্য কেনার। ক্রেতা মাত্রই পণ্যের গায়ে ঘোষিত তথ্যাদি সঠিক রয়েছে তার নিশ্চয়তা চায়। এছাড়াও ক্রেতা চায় তার ক্রয়কৃত পণ্য যথাযথ মান সম্মত হবে এবং স্বাস্থ্যে জন্য ক্ষতিকর হবে না। এ বিষয়সমূহ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে অধিক রপ্তানির মাধ্যমে দেশের যেমন উন্নয়ন হবে তেমনই এর সাথে সাথে ক্রেতা অধিকারও যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে।

তথ্যসুত্রঃ

  • কামাল এম, ২০১০, Traceability Implementation in Shrimp Value Chain, মৎস্য পণ্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারকরণ প্রকল্প, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কোয়ালিটি সাপোর্ট প্রোগ্রাম- ফিশারিজ কম্পোনেন্ট, ইউনিডো কর্তৃক ২ মার্চে ২০১০ তারিখে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সেমিনার।
  • মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৯, প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ দিন বদলের সুবাতাস, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ সংকলন, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রনালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১০৮-১১০।
  • মৎস্য অধিদপ্তর এবং বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ, ২০০৭ ক, আহরণ ও আহরণোত্তর পরিচর্যা চিংড়ি চাষীর করণীয়, মৎস্য পণ্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারকরণ প্রকল্প, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কোয়ালিটি সাপোর্ট প্রোগ্রাম- ফিশারিজ কম্পোনেন্ট, ইউনিডো কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেট।
  • মৎস্য অধিদপ্তর এবং বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ, ২০০৭ খ, আহরণোত্তর পরিচর্যা চিংড়ি ডিপোর করণীয়, মৎস্য পণ্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারকরণ প্রকল্প, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কোয়ালিটি সাপোর্ট প্রোগ্রাম- ফিশারিজ কম্পোনেন্ট, ইউনিডো কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেট।
  • মৎস্য অধিদপ্তর এবং বি. কিউ. এস. পি- ফিশারিজ, ২০০৭ গ, উন্নত পরিচর্যার মাধ্যমে চিংড়িকে রক্ষা করুন, মৎস্য পণ্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারকরণ প্রকল্প, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কোয়ালিটি সাপোর্ট প্রোগ্রাম- ফিশারিজ কম্পোনেন্ট, ইউনিডো কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেট।

Visited 141 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

গবেষক, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্তারিত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.