ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ

পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মাছ চাষের ভূমিকা

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা

একটু ভাবুন তো! বাংলাদেশ-২০৫০। আকাশচুম্বী সব অট্টালিকা, শত সহস্র কলকারখানা, আর লাখো গাড়ি ঘোড়ার এক আধুনিক দেশ। কিন্তু সেই অট্টালিকা, কলকারখানা আর গাড়ি চালাচ্ছে- হাড্ডিসার, কঙ্কালসার, অভুক্ত, পুষ্টিহীন কিছু মানুষ। আপনার শরীর শিহরিত হবে নিশ্চয়? শিহরণ হওয়ারই কথা, কিন্তু এমন সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়া যায় না। হ্যাঁ খাদ্যের জন্যই পৃথিবীর মানুষেরা এতো কর্মরত। কারণ যার খাদ্য নেই, তার কাছে পৃথিবীটা যে কেমন, কবির একটি লাইনেই তা স্পষ্ট- “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের যে দেশের জনসংখ্যা অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০০৮ অনুসারে ১৪ কোটি ৪২ লাখ, পত্রিকান্তরে প্রকাশ বর্তমানে তা ১৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সে দেশের মানুষগুলো কিভাবে হাসিমুখে চলাফেরা করছে সেটাই একটি বিস্ময়! কিন্তু এ দেশকে প্রকৃতি উদার হাতে দান করতে কৃপণতা করেনি কখনো। কিন্তু প্রকৃতিরও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। অকৃপণ প্রকৃতির তিক্ততাকে পাশ কাটিয়ে এ দেশের ক্ষুধার্ত আর পুষ্টিহীন মানুষগুলোকে খাদ্যের যোগান দিতে হলে প্রয়োজন যথার্থ কৃষি ব্যবস্থাপনা। তারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো মাছ চাষ। বাঙালীর জীবনে মাছের গুরুত্ব কতটুকু তা “মাছে-ভাতে বাঙালী” এই প্রবাদটির দিকে আলোকপাত করলে সহজেই বোঝা যায়। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত এই দেশে মাছ চাষ খুবই গুরুত্ব।

জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে প্রায় ৯৭০ জন অর্থাৎ প্রায় ১০০০ জন। আর দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে প্রায় ৪০% মানুষ (মৎস্যপক্ষ, ২০০৯)। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষ পাচ্ছে না সঠিক মাত্রায় খাদ্য ও পুষ্টি। এই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মিটাতে মাছ বহুলাংশে সক্ষম।

পুষ্টিহীনতার শিকার জনগোষ্ঠী

পুষ্টিহীনতার শিকার জনগোষ্ঠী

মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর আমিষ জাতীয় খাদ্য। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৫৮% আসে মৎস্য থেকে (মৎস্যপক্ষ, ২০০৯)। অর্থাৎ আমাদের দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের বেশিরভাগই যোগান দিচ্ছে মাছ। অপরদিকে খাদ্যগুণ বিবেচনায় মাছের কোন তুলনা হয়না। মাছ মানুষের দেহের বিভিন্ন ভিটামিনের অভাব (বিশেষত ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন-ই) পূরণসহ বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় খনিজ লবণের (মিনারেল) যোগান দেয় (যেমন, ক্যালসিয়াম, লৌহ, আয়োডিন, ফসফরাস ইত্যাদি)। সমীক্ষায় দেখা গেছে ভিটামিন-এ এর অভাবে আমাদের দেশে ত্রিশ হাজার মানুষ দৃষ্টিহীন হয়ে যায় এবং ৭০% মা ও শিশু রক্তশূন্যতার শিকার হয় যা লৌহের অভাবে ঘটে থাকে (মিঞা ও মিঞা, ২০০৭)। ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড় গঠনে সহায়ক। ফসফরাস নতুন কোষ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। বিভিন্ন দেশীয় ছোট মাছ শিশুদের অন্ধত্ব, রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।শুধু তাই নয়, সামপ্রতিককালে বিজ্ঞানীরা মাছকে সবচেয়ে নিরাপদ আমিষের উৎস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

কয়েকটি মাছের পুষ্টি উপাদান (মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম মাছ): [তথ্য উৎস্য- ওহাব, ২০০৭]

প্রজাতি ভিটামিন-এ ক্যালসিয়াম লৌহ
মলা ১,৯৬০ ১,০৭১
ঢেলা ৯৩৭ ১,২৬০
দারকিনা ১,৪৫৭
চান্দা ৩৪১ ১,১৬২
পুঁটি ৩৭ ১,০৫৯
ইলিশ ৬৯ ১২৬
সিলভার কার্প ১৭ ২৬৮
রুই ২৭ ৩১৭
তেলাপিয়া ১৯

 

আজকাল প্রায় প্রতিটি দৈনিক ও স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় লেখায় খাদ্য হিসেবে মাছের গুরুত্ব উঠে আসছে। মাছ হলো ওমেগা-৩ এর একটি উৎকৃষ্ট উৎস্য। ওমেগা-৩ রক্ত চাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হার্টঅ্যাটাক কমিয়ে দেয় (জনকণ্ঠ, ২০১০)। অতএব, সহজেই বোঝা যাচ্ছে খাদ্য হিসেবে মাছের গুরুত্ব। কিন্তু এত মাছের যোগান দেওয়া মাছ চাষ ছাড়া কখনই সম্ভব নয়। মাছ চাষের মাধ্যমে শুধু খাদ্য সমস্যাই নয়, একই সাথে বেকারত্ব দূরীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নসহ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব। বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিমাণ ৪৫.৭ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় ৪০.৪৭ লাখ হেক্টর এবং অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয় ৫.২৮ লাখ হেক্টর (FRSS, ২০০৯)। দেখা যায়, সাধারনত অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণ করা হয় এবং অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষ করা হয়। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকাংশে কম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশাল আয়তনের মুক্ত জলাশয়ে এবং অব্যবহৃত বদ্ধ জলাশয়গুলোতে মাছ চাষ করা গেলে দেশে মাছের উৎপাদন অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব।

পুকুরে বেড় জাল দিয়ে চাষকৃত মাছ আহরণ

পুকুরে বেড় জাল দিয়ে চাষকৃত মাছ আহরণ

বিভিন্ন সমীক্ষা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যদি বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়কে মাছ চাষের আওতাভুক্ত করা যায় তাহলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বহুগুণে। যেমন, বদ্ধ জলাশয়ে ১৯৯৮-৯৯ সালে উৎপাদন ছিল সর্বমোট ৫.৯০ লক্ষ মে.টন যা ২০০৭-০৮ সালে এসে দাঁড়ায় ১০.০০ লক্ষ মে.টন যা ১.৬৯৫ গুণ বেশী। অপরদিকে মুক্ত জলাশয়ে ১৯৯৮-৯৯ সালে ৬.৫ লক্ষ মে.টন মাছ আহরিত হয় এবং ২০০৭-০৮ সালে এসে দাঁড়ায় ১০.৬০ লক্ষ মে.টন অর্থাৎ ১.৬৩ গুণ বেশী (মৎস্যপক্ষ, ২০০৯)।

চাষকৃত মাছ

চাষকৃত মাছ

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বদ্ধ জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে যা মাছ চাষের মাধ্যমে। কিন্তু মুক্ত জলাশয়ে আহরণ তেমনভাবে বৃদ্ধি পায়নি যার কারণ হিসেবে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ চাষের যথোপযুক্ত ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের রপ্তানী আয়ের প্রায় ৪.০৪ শতাংশ, মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.৭৪ শতাংশ এবং দেশের মোট কৃষিজ আয়ের ২১ শতাংশ মৎস্যসম্পদের অবদান (মৎস্যপক্ষ, ২০০৯)।

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য সেক্টর দ্বিতীয় অবস্থানে। যার অর্থ দাঁড়ায় এই রকম যে নিবির, আধা নিবির পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তন করা সম্ভব আমূল ভাবে। মৎস্যজাত পণ্যগুলোর মাঝে চিংড়ির অবস্থান প্রথম তাই এর রয়েছে অমিত সম্ভাবনার দ্বার। চাষের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির দ্বারা যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটানো সম্ভব তেমনি সম্ভব উদ্ধৃত মৎস্যসম্পদ বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রার অর্জন বাড়ানো।

আমরা জানি প্রতিটি আলাদা সত্তা মিলিত হয়ে জাতিসত্ত্বার উদ্ভব। যদি প্রতিটি আলাদা সত্তা ভাল থাকে তাহলে একটি জাতি ভাল থাকতে বাধ্য। এভাবেই মাছ চাষ ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত পরিশেষে জাতিগত উন্নয়নে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। মাছ চাষের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য, পুষ্টি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারিতে আসতে পারে সহজেই।

তথ্যসূত্রঃ

  • অর্থনৈতিক সমীক্ষা. ২০০৮. বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৮, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অনুবিভাগ, অর্থ বিভাগ, অর্থমন্ত্রণালয়, পৃ. ২৭৯।
  • ওহাব, মো.আ. ২০০৭। দেশীয় ছোট মাছ চাষ: জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ, দেশীয় প্রজাতির মৎস্য সংরক্ষণ ও সমপ্রসারণ অভিযান ২০০৭, মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়, পৃ. ১৭।
  • জনকণ্ঠ , ২০১০। দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৮ মে ২০১০।
  • মৎস্যপক্ষ, ২০০৯। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০০৯, মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়, ১২০ পৃ.।
  • মিঞা, মো.আ.মা. এবং মিঞা, মো.মা.আ., ২০০৭। পুষ্টি চাহিদা পূরণে ছোট মাছের ভূমিকা, দেশীয় প্রজাতির মৎস্য সংরক্ষণ ও সমপ্রসারণ অভিযান ২০০৭, মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়, পৃ. ৩৬-৩৭।
  • FRSS (Fisheries Resources Survey System). 2009. Fisheries Statistical Yearbook of Bangladesh 2007-2008. Department of Fisheries (DoF), Ministry of Fisheries and Livestock, Bangladesh, 25(1): 1-42.

Visited 1,235 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

শিক্ষার্থী, বি.এস-সি. ফিশারীজ (সম্মান) পার্ট-২ [ব্যাচ-৯], ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্তারিত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.