ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | মাৎস্য জীববৈচিত্র্য | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা

মৃত গরু-মহিষের রক্ত-মাংসের টোপ দিয়ে কাঁকড়া শিকারঃ জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি হুমকি

বাজশাহী শহরাঞ্চলের নিকটবর্তী পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে মৃত গরু, ছাগল বা মহিষকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে মাছ শিকারে বিষয়টি প্রথম যখন আমার নজরে আসে তখন একই সাথে যেমন অবাক হয়েছিলাম তেমনি হয়েছিলাম বিস্মিত। এ নিয়ে বিডিফিশ বাংলায় “মৃত প্রাণী ব্যবহার করে মাছ শিকারঃ মৎস্য বৈচিত্র্যের জন্য একটি বড় হুমকি” শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেছিলাম। পরবর্তিতে দেশের বেশ কয়েকটি পত্রিকায় মৃত গরু-মহিষের রক্ত-মাংশের টোপ দিয়ে কাঁকড়া শিকারের খবর আমার নজরে আসে। এক্ষেত্রে সাধারণত কাঁকড়া ধরার ফাঁদ চাঁই-এ টোপ হিসেবে মৃত গরু-মহিষের রক্ত-মাংশ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

চাঁই হচ্ছে- বাঁশের শলা দিয়ে তৈরি মাছ ধরার ফাঁদ। বাঁশ ও সুতা এসব বানানোর প্রধান কাঁচা মাল। একটি মুলি বাঁশ দিয়ে চারটি চিংড়ি মাছ ধরার চাঁই হয় আর একটি মোড়ল বাঁশ দিয়ে ২৫ টি কুঁচে ধরার চাঁই হয়। মাছ কিংবা কুঁচে ধরার জন্য বিভিন্ন মাপে বাঁশের শলা তুলে এগুলো রোদে শুকিয়ে তারপর শুরু হয় চাঁই তৈরির প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ধরনের ফর্মার মধ্যে ফেলে নাইলনের সুতা দিয়ে বাঁশের শলা গুলো সেলাই করে বেড়ার মতো বানানো হয়। আর পলিথিন কাগজ বা প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে বেড়া তৈরি হয় চিংড়ি মাছ ধরার চাঁই। নদী-নালা, খাল-বিল হাওরের সুবিধা মতো স্থানে রাখা হয়। মাছ পানিতে চলাচল করতে করতে এক সময় চাঁইয়ের মধ্যে ঢুকলে আর বের হতে পারে না। [১]

জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ‘চাঁই’-এর কদর বেড়ে যায়। এ সময় বৃষ্টির পানিতে খাল, বিল, নালা, পুকুর টইটুম্বুর হয়ে যায়। মিঠা পানির মাছ মুক্ত পানি পেয়ে এদিক ওদিক ঘুড়ে বেড়ায়। মাছের চলার গতির বিপরীতে ‘চাঁই’ ফাঁদ পেতে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মৎস্য অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, কারেন্ট ও ঘন ফাঁসের জাল সাগর এবং নদী মৎস্য শূন্য করছে। তেমনি ‘চাঁই’ খাল-বিল-নালা-পুকুরের মাছশূন্য করে দিচ্ছে। [২}

গলাচিপার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে সমুদ্রের কাঁকড়া শিকারে শুরু হয়েছে এক অশুভ তৎপরতা। মরা গরু-মহিষের পচা মাংস এবং রক্ত সামুদ্রিক কাঁকড়ার প্রিয় খাবার। এই তথ্যটিকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত চাঁই পেতে কাঁকড়া ধরার জন্য গরু-মহিষের রক্ত ও মাংস টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে। একশ্রেণীর কাঁকড়া শিকারি সমুদ্র উপকূলবর্তী নদী মোহনায় বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের বড় ঝুড়ি বা চাঁই পেতে কাঁকড়া শিকার করে। তারা কাঁকড়ার টোপ হিসেবে মরা গরু-মহিষের পচা মাংস ও রক্ত ব্যবহার করছে। সামুদ্রিক কাঁকড়া শিকারের জন্য টোপের যোগান নিশ্চিত করতে রাতের অন্ধকারে গোপনে কৃষকদের গরু-মহিষের ওপর হামলা করে আহত করার এমন কি মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। কৃষক যখন গবাদিপশুর মরদেহ নদীতে বা দূরে কোথাও ফেলে দেয় তখন তারা তা সংগ্রহ করে কাঁকড়া ধরার চাঁইয়ের মধ্যে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। [৩]

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বড়বাইশদিয়া ও রাংগাবালি ইউনিয়নে গবাদিপশুর ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা বেড়েই চলেছে। গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা কৃষকদের খোঁয়াড়ে গিয়ে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গবাদিপশু জখম বা হত্যা করে। সমসাময়িক সময়ে এ এলাকায় এজাতীয় যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলো হচ্ছে- ৫ মে গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা খোঁয়াড়ে ঢুকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে দুটি গরু কুপিয়ে জখম করে, ৪ মে রাতে একটি গরুর পেছনের দুই পায়ের রগ ধারাল অস্ত্র দিয়ে কেটে দিয়েছে, খোঁয়াড়ে বাঁধা দুটি মহিষের পেছনের দুই পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে, ২৭ এপ্রিল রাতে একটি মহিষের পেছনের দুটি পা কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা, গত কয়েক মাসে তাঁর আরও পাঁচটি মহিষ নিখোঁজ হয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা, সামুদ্রিক কাঁকড়া শিকারিরা শিকারের টোপের জন্য গবাদিপশু হত্যা বা জখম করছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সামুদ্রিক কাঁকড়া শিকারি জানান, গবাদিপশুর পচা মাংস কাঁকড়ার প্রিয় খাবার। [৪]

এসব তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মৃত গরু, ছাগল বা মহিষের রক্ত-মাংশ কাঁকড়া শিকারের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গবাদিপশুর পচা রক্ত-মাংস কাঁকড়ার প্রিয় খাবার। ফিশারীজের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিপদজনক কারণ এর ফলে সহজেই অভার ফিশিং এর ঘটনা ঘটছে যা কাঁকড়া তথা মাছের জীববৈচিত্র্যে জন্য হুমকি স্বরূপ।

তথ্যসূত্রঃ
[১] চাঁই থেকে সচ্ছলতা, প্রথম আলো, ০৬-০৮-২০১০।
[২] কলাপাড়ায় ‘চাঁই’-এর কদর, দৈনিক সংবাদ, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১০।
[৩] গলাচিপায় গরু-মহিষ মেরে নৃশংস পন্থায় কাঁকড়া শিকার!, দৈনিক জনকন্ঠ, ০৬ জুন ২০১০।
[৪] গরু-মহিষ মেরে কাঁকড়া শিকার!, প্রথম আলো ৯ মে ২০১০।


Visited 100 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question? Ask here

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply