ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা | লাইভলিহুড

সামুদ্রিক জেলেদের হালচাল

পৃথিবীতে যত ধরণের পেশা রয়েছে তার মধ্যে সামুদ্রিক জেলেদের মাছ ধরার পেশা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশার অন্যতম একটি। প্রায় সনাতন পদ্ধতির নৌকা আর জাল সম্বল করে সামুদ্রিক জেলেরা একদিকে যেমন প্রতিকূল প্রকৃতির সাথে জীবন বাজি রেখে মাছ শিকার করতে সাগরে যায় অন্যদিকে তেমনই রয়েছে জলদস্যুর অপতৎপরতা।

ফলশ্রুতিতে নৌকা, জাল, ধৃত মাছ সর্বোপরি জীবন হারানোর ঝুঁকি থাকা স্বত্বেও মূলত বংশগত এই পেশা থেকে বের হয়ে আসতে না পারার করণে এইসব জেলেরা সমুদ্রে মাছ শিকারে যায় এবং জীবন তুচ্ছ করে দেশের সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদনে রাখে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু এই সব প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে সামুদ্রিক জেলেরা আসলে কেমন আছে? সেই উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করবো এই লেখায়, যার ভিত্তি হবে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবর (যদিও আমরা জানি বাস্তবে যা ঘটে তার খুব কম অংশই পত্রিকার পাতায় আসে)।

গত ২৩ মার্চ ২০১০ তারিখে প্রথম আলোর বিশাল বাংলা পাতায় (পাতা-৪) সুমেল সারাফাতের “ভালো নেই দুবলার চরের জেলেরা” শিরোনামে যে খবরটি এসেছে তার মূল বক্তব্য হচ্ছে-

  • দুবলার চরের আটটি জেলেপল্লীতে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার জেলের অস্থায়ী বসতি।
    দুবলার চরে মাছ আহরণ ও শুঁটকির খাত থেকে অনেক রাজস্ব আয় হলেও জেলেদের সমস্যা নিরসনে তেমন কোন উদ্যোগ নেই।
  • কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করলেও জেলেদের জন্য চরগুলোতে নেই পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও চিকিত্সার ব্যবস্থা। পুরো চরে রয়েছে মাত্র পাঁচটি আশ্রয়কেন্দ্র, যাতে আশ্রয় নিতে পারে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মানুষ। আশার কথা এই যে, সাগর ও সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় শিগগিরই কয়েকটি ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।
  • নির্ধারিত রাজস্ব জমা দেওয়ার পরও বন কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। বন কর্মকর্তারা জেলেদের কাছ থেকে জালপ্রতি চার কেজি শুঁটকি জোর করে আদায় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
  • অন্তত ১০টি দস্যুদলের দুই শতাধিক সদস্য নিয়মিত চাঁদার দাবিতে তাড়া করে ফিরছে জেলেদের। এই দস্যুরা জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ এবং নৌকা ও ট্রলারপ্রতি চাঁদা আদায় করে। চাঁদা দিতে না পারলে জেলেদের নৌকা ও জাল লুট করে, ক্ষেত্রবিশেষে জেলেদের মেরেও ফেলে। তবে সম্প্রতি ‘অপারেশন সন্ধান’ নামক বিশেষ অভিযান পরিচালনার কারণে দস্যুদের তত্পরতা অনেক কমেছে বলে দাবি করা হয়।
  • সারা মৌসুমে জেলেরা যা আয় করেন, তার দুই-তৃতীয়াংশ লুটে নেয় দস্যুরা।

৮ এপ্রিল ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলা, পাতা-৪ এ প্রকাশিত “বঙ্গোপসাগরে ডাকাতি ট্রলারসহ দুই জেলে নিখোঁজ” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বঙ্গোপসাগরে ছয়টি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় বঙ্গোপসাগরের গুলিরধার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ডাকাতেরা জেলেদের মারধর করে ট্রলারের জাল, মেশিনের যন্ত্রাংশ, ডিজেলসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। ডাকাতের কবল থেকে বেঁচে আসা কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি বদিউল আলম বলেন, মঙ্গলবার রাতে ১০/১২টি ট্রলার বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য গেলে সাগরে জাল ফেলা অবস্থায় ১৫/১৬ জনের একটি ডাকাতদল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। ডাকাতদল ট্রলারে ওঠে জাল মেশিন, মাছ, ডিজেল, মেশিনের যন্ত্রাংশসহ প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়।

২৫ মার্চ ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলায় প্রকাশিত “ট্রলারে ডাকাতি” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বঙ্গোপসাগরের বরগুনার পাথরঘাটা ও সুন্দরবনসংলগ্ন ফেয়ারওয়ে বয়ার কাছাকাছি এলাকায় সোমবার ১০টি ট্রলারে একদল জলদস্যু হামলা চালিয়েছে। জলদস্যুরা এসব ট্রলার থেকে আট লাখ টাকা মূল্যের মাছ লুট করে নিয়ে গেছে।

০৪ মার্চ ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলায় প্রকাশিত “সাত দিনে ৩০টি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতি” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- সেন্টমার্টিন দ্বীপের অদূরে পশ্চিম ও দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে গত এক সপ্তাহে ৩০টি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় জলদস্যুদের বেদম প্রহারে ১০ জেলে আহত হন।

০২ মার্চ ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলায় প্রকাশিত “ভোলায় জলদস্যু, শরীয়তপুরে চাঁদাবাজ আতঙ্কে জেলেরা” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- ভোলার সাগর মোহনা মেঘনায় জলদস্যুরা গত দুই মাসে অর্ধশতাধিক হামলা চালিয়ে জেলেদের মাছ, জাল, নৌকা ও মালামাল লুটে নিয়েছে। হাতিয়ার জাহাজমারার ‘মুন্সিয়া বাহিনী’ ও চরফ্যাশন ঢালচরের ‘কমান্ডার বাহিনী’ এসব হামলার সঙ্গে জড়িত বলে জেলেরা অভিযোগ করেছেন। এদিকে পদ্মা ও মেঘনার শরীয়তপুর অংশে প্রায় প্রতিদিনই জেলে নৌকা থেকে চাঁদাবাজি হচ্ছে।

৩০ জানুয়ারী ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলায় প্রকাশিত “মনপুরায় মেঘনা থেকে তিনটি ট্রলার লুট, আহত ২১” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- মেঘনা নদীর ভোলার মনপুরা উপজেলার জাহাজমারা চর এলাকা থেকে একদল জলদস্যু গতকাল শুক্রবার মাছ ধরার তিনটি ট্রলার মাছসহ লুট করে নিয়ে গেছে। এ সময় জলদস্যুদের হামলায় ২১ জেলে আহত হয়েছেন। তাঁদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা রয়েছে। গতকাল ভোর রাতে মনপুরার হাজিরহাট থেকে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে মেঘনায় জাল পাততে পাততে জাহাজমারা চর এলাকার সীমান্তে চলে যান। জলদস্যু মুন্সিয়া বাহিনীর ৫০-৬০ জন সদস্য তাঁদের ট্রলারে এসে লুটপাট শুরু করে। এ সময় প্রতিরোধ করতে গেলে জলদস্যুরা জেলেদের কুপিয়ে ও মারধর করে নদীতে ফেলে দেয়। যাওয়ার সময় ট্রলারে থাকা সব মাছ লুট করে নিয়ে যায় এবং ট্রলার ফিরিয়ে আনতে জেলেদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে।

২৬ জানুয়ারী ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলায় প্রকাশিত “আমতলীতে জলদস্যু-কোস্টগার্ড গুলিবিনিময়, মাঝি নিহত” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বরগুনার আমতলী উপজেলার বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী আশারচর শুঁটকি পল্লিতে গত রোববার রাতে জলদস্যুরা হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট করেছে। এ সময় জলদস্যুদের সঙ্গে কোস্টগার্ড সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়। জলদস্যুদের গুলিতে নৌকার এক মাঝি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

আবার জলদস্যুদের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি ধারনা পেতে এই খবরটিই যথেষ্ঠ যা রয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১০, প্রথম আলো, শেষের পাতায় প্রকাশিত “জলদস্যুদের কাছে একে-৪৭ দমনে হিমশিম কোস্টগার্ড” এই প্রতিবেদনে।

এসবের পাশাপাশি কিছু ভাল খবরও পাওয়া যায়, যেমন- ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০১০, প্রথম আলো, বিশাল বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনঃ ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৩০ জলদস্যু গ্রেপ্তার এবং ০১ ফেব্রুয়ারী ২০১০, প্রথম আলো, সারাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনঃ চার জলদস্যু গ্রেপ্তার। কিন্তু তা জলদস্যু নির্মূলের জন্য যথেষ্ট নয়।

উপরের তথ্য গুলো থেকে সামুদ্রিক জেলেদের জীবনের বর্তমান হালচাল সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তা মোটেও সুখকর নয়। তাই এখনই প্রয়োজন জেলেদের সমস্যা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যেমন-

  • সামুদ্রিক জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • রাজস্বের বাইরে অতিরিক্ত কোন টাকা বা শুঁটকির আদায় বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • জল বা বন দস্যুদের অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

Visited 80 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত …

Leave a Reply