ক্যাটাগরি: জলাশয় | মাৎস্য সম্পদ

বাংলাদেশের নদী: হালদা

মানচিত্রে হালদা নদী

মানচিত্রে হালদা নদী

হালদা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জেলা পার্বত্য চট্টগ্রামের বদনাতলী নামক পাহাড় হতে উৎপন্ন হয়ে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, এবং চট্টগ্রাম সদরের কোতোয়ালী থানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালুরঘাটের নিকটে কর্ণফুলী নদীর সাথে মিলেছে। এর মোট দৈর্ঘ্য ৮১ কিলোমিটার হলেও মাত্র ২৯ কিলোমিটার অংশে সারা বছর বড় নৌকা চলাচলের উপযোগী থাকে। ছোট বড় অসংখ্য পাহাড়ী ছড়া নদীর মূল স্রোতে এসে মিশে মূলত স্বাদুপানির উৎস হিসেবে কাজ করছে। এছাড়াও নদীটি কর্ণফুলীর সাথে মিলিত হওয়ার ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটা খেলা করায় একে জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর করে তুলেছে।

অপার জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ এ নদী একদিকে যেমন মৎস্য খাতে অবদান রাখছে তেমনই অবদান রেখে চলেছে জাতীয় অর্থনীতিতে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়- এ নদী থেকে ২০১০ সালে মাত্র দু’সপ্তাহেই আয় হয় ৯০০ কোট টাকা। গত ১০ বছরে এ নদী থেকে রেনু প্রাপ্তির হার প্রতি বছর ৬০৪.৬৪ কেজী। শুধু এ নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে আছে তিন হাজার জেলে আর এর সাথে জড়িয়ে আছে ২০ হাজার মানুষের জীবন। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ছয় শতাংশ আসে হালদা থেকে। একটি গবেষণার তথ্যানুসারে- একটি মা কাতলামাছ হালদায় গত পাঁচ বছরে ডিম ছেড়েছে ১৯ কোট ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার।

এক নজরে হালদার গুরুত্ব:
হালদা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম যার মধ্যে মৎস্য বিষয়ক গুরুত্ব সর্বাধিক। যেমন-

  • হালদা নদী বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র।
  • এটিই বিশ্বের একমাত্র জোয়ারভাটার নদী যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়।
  • হালদা নদী থেকে ডিম আহরণ, আহরিত ডিম থেকে রেণু উৎপাদন এবং পরিচর্যার প্রযুক্তি স্থানীয়দের সম্পূর্ণ নিজস্ব (Indigenous) যা স্মরণাতীত কাল থেকে ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সংমিশ্রণে উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
  • জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতি বছর হালদার অবদান ৮০০ কোটি টাকা যা এখানে প্রাপ্ত ডিম, উৎপাদিত রেণু এবং মাছ থেকে আসে। এছাড়াও রয়েছে কৃষিজ উৎপাদন, যোগাযোগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যা হালদার অবদানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
  • আমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত, উজানের পাহাড়ি ঢল, জোয়ার-ভাটার ক্রিয়া, তীব্র স্রোত, ফেনিল ঘোলা পানিসহ নদীর ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে মাছকে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদ-নদী থেকে একে আলাদা করেছে।
  • হালদা নদী বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের প্রধান বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক।
  • হালদা নদী বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শহরের সুপেয় পানির প্রধান উৎস।

উল্লেখিত বিষয়াবলীকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে একে জাতীয় ঐতিহ্য এমনকি বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণার দাবি রয়েছে। আবার সম্প্রতি একে বাংলাদেশের জাতীয় নদী ঘোষণার দাবি উচ্চারিত হতে দেখা যাচ্ছে।

হালদা নদী

হালদা নদী

হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের ডিম ছাড়ার কারণ:
হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের ডিম ছাড়ার কারণ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সংক্ষেপে এর কারণ হিসেবে একটি বিশেষ সময়ে বা তিথিতে এই নদীর ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যসমূহ রুই জাতীয় মাছের ডিম পড়ার অনুকূলে থাকার বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। যেমন-

  • ভৌত প্রভাবক: নদীতে পতিত পাহাড়ি ঝর্ণা বা ছড়ার মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ উজানের বিল থেকে আসা ঢল, নদীর বাঁক ও গভীরতা, পরিমিত তাপমাত্রা, তীব্র স্রোত, ফেনিল ঘোলাত্ব, জোয়ার-ভাটার ক্রিয়া ও বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত একটি বিশেষ সময়ে বা তিথিতে উপযুক্ত মাত্রায় বিরাজ করে।
  • রাসায়নিক প্রভাবকগুলি হচ্ছে কম কন্ডাক্টিভিটি, সহনশীল দ্রবীভূত অক্সিজেন।
  • জৈবিক প্রভাবক: উজানে অবস্থিত বিল থেকে উৎপন্ন হওয়া পাহাড়ি ঝর্ণা বা ছড়া বিধৌত পানিতে প্রচুর ম্যাক্রো ও মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকায় নদীর পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্যতা থাকে যা প্রজনন পূর্ব গোনাডের পরিপক্বতায় সাহায্য করে।

হুমকির মুখে হালদা ও এর মৎস্য সম্পদ:
বিভিন্ন কারণে আজ এমন একটি বৈচিত্র্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ নদী তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

  • এ নদীর পাড়ে গড়ে উঠা বেশ কিছু ভারী শিল্প (যেমন- কাগজকল) প্রতিষ্ঠান যাদের কোন বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নেই। ফলে এসব কারখানা থেকে বর্জ্য পদার্থ সরাসরি হালদায় পড়ছে যা এর মাটি ও পানিকে দূষিত করছে।
  • এ ছাড়াও নদীর উভয় পাড়ের নিকটবর্তী জমিতে কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এর পানি ও মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করে ফেলছে সহজেই।
  • হালদা থেকে বালু উত্তোলন এবং যাত্রী ও মালামাল পরিবহণে ব্যবহৃত ইঞ্জিন চালিত নৌকার ইঞ্জিন থেকে নিঃসৃত তেল দূষিত করে চলেছে হালদার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়াও এসব জলযান কর্তৃক সৃষ্ট শব্দ সরাসরি মাছের আচরণের উপর প্রভাব ফেলছে। এসব যানবাহন চলাচলের কারণে সৃষ্ট ঢেউ সহজেই পাড়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে ভাঙ্গনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
  • হালদার নিকটবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোতে নদীর পাড়ের মাটি ব্যবহার করায় নদীটির পাড়ের ভাঙ্গন বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নদীর ভাঙ্গনকে ত্বরান্বিত করছে।
  • ডিম ফুটানোর জন্য নদীর পাড় ঘেঁসে অসংখ্য আয়তাকার চৌবাচ্চা তৈরি করা হয় যা হালদার পাড় ভাঙ্গার আর একটি অন্যতম একটি কারণ।
  • হালদার স্বাদুপানির উৎস খালের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণ এর ভৌত বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করার সাথে সাথে বিল থেকে আগত পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে মৎস্য প্রজননের উপর।
  • বিগত ১০০ বছরে হালাদার ১১টি বাঁক কেটে নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের অনেকটাই পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ এজাতীয় বাঁকই রুই জাতীয় মাছে প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র।
  • সম্প্রতি নদীটির বিভিন্ন স্থানে ড্রেজিং এর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যা নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্ষতিকর মাত্রায় পরিবর্তিত করে ফেলবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব সমুদ্র থেকে মাত্র ১২ কিমি দূরে অবস্থিত হালদা উপর পড়বে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর শুষ্ক মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) হালদার পানির লবণাক্ত অনেক বেশী মাত্রায় বেড়ে যাবার বিষয়টি সবার নজরে আসে যা স্বাদুপানির মাছের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
  • পানির বিশেষ গুণগতমান ও পরিমাণের কথা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৮৭ সাল থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসা মোহরা পানি শোধনাগারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি গ্যালন পানি উত্তোলন করে শহরের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করে আসছে। প্রতিনিয়ত এই বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের ফলে হালদার উপর এর প্রভাব কী তা ভেবে দেখা দরকার।
  • রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিমের গণ-সংগ্রহ ভবিষ্যতে এ নদীর মৎস্য সম্পদের বিশেষত ব্রুডস্টকের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে কিনা বা দূর ভবিষ্যতে ফেলবে কিনা সেই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়।
  • হালদা রুই জাতীয় মাছের জিন-স্টক বর্তমানে হুমকির মুখে। অনেক অসাধু পোনা সংগ্রহকারী অধিক লাভের আশায় হালদার রেণুর সাথে হ্যাচারির রেণু মিশিয়ে থাকে। এ জন্য তারা নদীর সন্নিকটে নির্মিত একই চৌবাচ্চায় হালদা ও হ্যাচারির রেণু লালন-পালন করে থাকে। ফলে সহজেই হ্যাচারির পোনা নদীতে প্রবেশের সুযোগ পায় যা হালদার রুই জাতীয় মাছে কৌলিতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা জন্য হুমকি স্বরূপ। অন্যদিকে হালদার রেণুকে পুকুরে প্রতিপালন করে আবার হালদায় অবমুক্ত করার প্রক্রিয়াটিও রুই জাতীয় মাছে কৌলিতাত্তিক বিশুদ্ধতা জন্য হুমকি স্বরূপ।
  • অবাধে ব্রুড মাছ শিকারের ফলে হালদা মা-বাবা মাছ শূন্য হতে বেশী সময় লাগার কথা না। মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০০৭ সালে পোনা বড় হয়ে ব্রুড মাছে পরিণত হওয়ার জন্য যে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয় তা নানাবিধ কারণে কার্যকর ভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি। অথচ হালাদার ব্রুড মাছ রক্ষায় অভয়াশ্রমের বিকল্প এখন ভাবা যায় না।
  • হালদা থেকে রুই জাতীয় মাছের রেণু ছাড়াও গলদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করা হয়। ২০০৮ সালের এক সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে চিংড়ির একটি রেণু সংগ্রহের সময় অন্যান্য মাছের ৯৭টি পোনা নষ্ট করা হয় যা মৎস্য বৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট।

উল্লেখিত কারণে হালদার ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অনুকূল অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলশ্রুতিতে একদিকে ব্রুড মাছের পরিপক্বতা আসতে যেমন দেরী হচ্ছে অন্যদিকে তেমনই ব্রুডমাছের ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয়ের কার্যকারিতা অনেকটাই হ্রাস পাচ্ছে যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি প্রজননের উপর।

আমাদের করণীয়:

  • হালদার মত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী নদীকে রক্ষার একমাত্র উপায় একে যতটা সম্ভব সকল ধরণের কৃত্রিমতা থেকে দূরে রাখা তথা নদীটিকে নিজের মত করে চলতে দেয়া। যেমন-
  • বাঁক কাটা, পাড় থেকে মাটি অপসারণ, নদী থেকে বালি উত্তোলন, ড্রেজিং এর মত নদীর ভৌত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনয়নকারী কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা।
  • নদীর উৎস খাল তথা ছড়ায় স্লুইসগেট বা বাঁধ জাতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করা।
  • বিভিন্ন ধরণের দূষণের জন্য দায়ী শিল্প কারখানায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, কৃষিজ কীটনাশক ব্যবহার পরিমিত করা, ইঞ্জিন চালিত নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
  • চাষ অথবা খাবারের জন্য মাত্রারিক্ত পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত করা।
  • গলদা পোনা সংগ্রহের সময় অন্যান্য জলজ প্রাণীর পোনার ধ্বংস রোধ, মা-বাবা মাছ রক্ষায় অভয়াশ্রমের পরিসর বৃদ্ধি ও কার্যকর করা।
  • ব্রুডস্টক রক্ষায় নদী থেকে রুই জাতীয় মাছের গণহারে রেণু সংগ্রহ, পাড়ের নিকটবর্তী আয়তাকার জলাশয়ে লালন-পালনের বিষয়টি একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।
  • উপরোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়সমূহ গবেষণার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। দরকার সেই গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

তথ্যসূত্র:


View Larger Map
গুগল ম্যাপে হালদা নদী


Visited 1,364 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.