ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | মাৎস্য চাষ | স্বাদুপানি | হ্যাচারি

হ্যাচারিতে রেণু ও পিএল উৎপাদন: সফলতার অন্যতম প্রভাবক প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ

হ্যাচারিতে রেণু ও পিএল উৎপাদনের সফলতার প্রধান প্রধান প্রভাবক গুলো হচ্ছে- উন্নতমানের ব্রুড মাছ বা চিংড়ি, ব্রুড মাছের জন্য বিশেষ খাদ্য বা পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, সফল প্রণোদিত প্রজনন, রেনু বা পিএল এর জন্য যথাযথ খাদ্য তথা পুষ্টি ব্যবস্থাপনা। এছাড়াও রুই জাতীয় মাছের হ্যাচারিতে নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহমান পানির সরবরাহ এবং চিংড়ি হ্যাচারিতে নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহমান পানির সরবরাহের পাশাপাশি নিরবিচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যার জন্য প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত ব্যবস্থাপনার।

রুই জাতীয় মাছের হ্যাচারিতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যাবশ্যক না হলেও চাহিদামতো বিদ্যুতের সরবরাহ একান্ত প্রয়োজনীয়। কারণ হ্যাচারিতে মাছের রেনু পোনা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিরবিচ্ছিন্ন পানি প্রবাহের প্রয়োজন হয়ে থাকে। নিরবিচ্ছিন্ন পানি প্রবাহের নিশ্চয়তার জন্য ওভারহেড ট্যাঙ্কে প্রয়োজনমত পানি উত্তোলনের জন্য চাহিদামত বিদ্যুতের সরবরাহ প্রয়োজন। কোন হ্যাচারিতে পর্যাপ্ত আকারের ওভারহেড ট্যাঙ্ক না থাকলে সার্বক্ষণিক বা বেশিরভাগ সময়েই বিদ্যুতের প্রয়োজন হতে পারে। নতুবা তেল চালিত পাম্প মেশিন চালিয়ে পানি উত্তোলনে বা জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে গেলে রেনু উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে রেনু উৎপাদনে চাহিদামত বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রভাব না পড়লেও ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতির আশংকা থেকেই যায়। তাই রুই জাতীয় মাছের হ্যাচারিতে চাহিদামত বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

বিদ্যুতের অনুপস্থিতির পাশাপাশি প্রচণ্ড গরম আর খরার মত প্রাকৃতিক বিপর্যের মত ঘটনা ঘটে তা হলে দেখা দেয় বড় ধরণের বিপর্যয়। ঠিক এরকমই একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ এপ্রিল ২০১০ তারিখের প্রথম আলোর আলোকিত উত্তর এর পাতায় “মারা যাচ্ছে রেনু পোনা” শিরোনামে। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়-

ঘন ঘন লোডশেডিং, প্রচণ্ড গরম আর টানা খরার কারণে বগুড়ার আদমদীঘিতে ৫০টিরও অধিক হ্যাচারিতে লাখ লাখ রেনু পোনা মারা গেছে। এই হ্যাচারি গুলোতে প্রতিদিন উৎপাদন হয় বিভিন্ন মাছের কয়েক লাখ রেণু পোনা। উৎপাদিত রেণু পোনা এলাকার চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করা হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এছাড়াও হ্যাচারি-শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক হাজার শ্রমিক। বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হলে পোনা উৎপাদন ব্যাহত হবে এমন কি বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ক্ষুদ্র হ্যাচারি মালিকদের পথে বসতে হবে। তাই হ্যাচারি গুলোতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা একান্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়াও একদিকে লোডশেডিং এবং অন্যদিকে টানা খড়া ও গরমে মাছের রেণু পোনাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন হাজার হাজার পোনা গরমে মরে যাচ্ছে। অন্য দিকে প্রচণ্ড গরমের কারণে পুকুরে পোনা মারা যাওয়ায় পোনা মাছের ক্রেতারাও মাছ কিনতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে পোনা বিক্রিতেও পড়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। ফলশ্রুতিতে একদিকে হ্যাচারির মালিকদের চরম লোকসান গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে রেণু পোনা উৎপাদন।

চিংড়ি হ্যাচারিতে সরবরাহকৃত পানির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন এবং প্রবাহমান পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এজন্য অধিকাংশ চিংড়ি হ্যাচারিতে বিদ্যুতের বিকল্প যোগান হিসেবে জেনারেটরের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু তা মূলত আপদকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুত না থাকায় বিকল্প বিদ্যুতের সরবরাহে জেনারেটর ব্যবহার পিএল এর উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। যার প্রভাব পড়ে হ্যাচারি মালিক ও চিংড়ি চাষি উভয়ের উপরই। দীর্ঘ সময়ব্যাপী বিদ্যুত না থাকার কারণে গত এপ্রিলে শুধু কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলের ৫০টি হ্যাচারিতেই প্রতিদিন কয়েক লাখ চিংড়িপোনা মরেছে। অন্যদিকে এইসব হ্যাচারিতে চিংড়ির পোনা (পিএল) উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

গত ৫ এপ্রিল ২০১০ তারিখের প্রথম আলোর বিশাল বাংলা পাতায় প্রকাশিত “লোডশেডিংয়ে মরছে ৫০ হ্যাচারির চিংড়ি” এই শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় চিংড়ি পোনা বা পিএল উৎপাদনে এর ভয়াবহ প্রভাব বিষয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়-

দেশের চিংড়ি পোনার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কক্সবাজার শহরের সমুদ্র উপকূলের কলাতলী, উখিয়া উপজেলার সোনারপাড়া ও ইনানী এবং টেকনাফ উপজেলার সমুদ্রসৈকতে বাগদা চিংড়িপোনা উৎপাদনের উদ্দেশ্যে ৫০টি হ্যাচারি স্থাপন করা হয়। এই হ্যাচারিগুলোই দেশের চাহিদার ৯৫ ভাগ চিংড়ির পি.এল. এর চাহিদা পূরণ করে থাকে। এসব হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু উৎপাদনের ভর মৌসুমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকার কারণে হ্যাচারিগুলোয় একদিকে যেমন প্রক্রিয়াধীন থাকা অসংখ্য চিংড়ি পোনার মৃত্যু হচ্ছে, তেমনি বেঁচে যাওয়া পোনাগুলোও দুর্বল হচ্ছে। দিনে ২৪ ঘণ্টায় হ্যাচারিতে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। আর এত দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালিয়ে হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদনে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী পোনা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশে চিংড়ি উৎপাদনে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একদিকে যেমন দেশের চিংড়ি খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা বড় অংশ আসে তেমনি অপরদিকে এই হ্যাচারিগুলোতে উৎপন্ন পোনার ওপর চিংড়ি উৎপাদন অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল তাই এখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


Visited 381 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply