ক্যাটেগরি: মাৎস্য জীববৈচিত্র্য | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা | মাৎস্য সম্পদ

বাংলাদেশের মৎস্য বৈচিত্র্য রক্ষার উপায়

বাংলাদেশের মৎস্য বৈচিত্র্যের অতীত ও বর্তমান এবং বাংলাদেশের মৎস্য বৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ বিষয়ক লেখা দুটি তৈরির সময় এবিষয়ে বেশ কয়েকটি লেখা (তথ্যসূত্র ০১-১৬) পড়ার সুযোগ আমার হয়। সেসব লেখায় এদেশের মৎস্য বৈচিত্র্যের বর্তমান চিত্র উপস্থাপনার পাশাপাশি তা রক্ষায় উপায় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। সেই আলোচিত উপায়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

  • মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র উদ্ধার ও সংস্কার
  • জলজ বনায়ন সৃজন ও টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন
  • জলাশয়ের স্বল্পমেয়াদী বাণিজ্যিক ইজারা প্রথার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞানসম্মত উৎপাদনভিত্তিক জৈবব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রচলন
  • উন্মুক্ত জলাশয় হতে মাছ আহরণের ক্ষতিকর উপকরণ ও পদ্ধতি ব্যবহার না করা
  • অভয়াশ্রম স্থাপন ও তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ
  • কৃষি ক্ষেত্রে পরিমিত সার ব্যবহার করা
  • ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন করা
  • কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিপন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন এবং বাণিজ্যিকভাবে এসব মাছ চাষে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করা
  • বিদেশী মাছ আমদানির পূর্বে দেশীয় মৎস্য প্রজাতি ও জলজ পরিবেশের এর প্রভাব সম্পর্কিত গবেষণার পর ভাল ফলাফল সাপেক্ষে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া
  • সময় উপযোগী মৎস্য, জলাশয় ও পানিসম্পদ বিষয়ক আইন প্রণয়ন ও প্রচলিত মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ
  • মৎস্যজীবীসহ সকল জনসাধারণের মধ্যে এবিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি

উপরোক্ত উপায়সমূহ উপস্থাপন করা যতটা সহজ বাস্তবায়ন করা ততোধিক কঠিন। এর সাথে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ এবং বাণিজ্য বিষয়ক নানাবিধ প্রভাবক ওতপ্রোতভাবে জড়িত যা এই সব উপায় বা কৌশল বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। এই অন্তরায় অর্থাৎ বাধাসমূহ দূর করা সম্ভব না হলে দেশের মৎস্য বৈচিত্র্য রক্ষায় কোনভাবেই অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের হারাতে শুরু করা সমৃদ্ধ মৎস্য ঐতিহ্য রক্ষায় মৎস্য বৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপায় এবং তা বাস্তবায়নের কৌশলের নানা দিক বিস্তৃতভাবে নিচে আলোচনা করা হল।

১. দেশীয় প্রজাতির মাছের বসবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র উদ্ধার এবং উভয় জলাশয়ের মাঝে মাছ চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ:

দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক বসবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস এবং উভয় জলাশয়ের মাঝে মাছ চলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির নেপথ্যের কারণগুলো প্রাকৃতিক নয় বরং কৃত্রিম। যেমন- অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ, জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য আর ধান চাষের ধাঁচে পরিবর্তন, জলাশয় দখল ও ভরাট এবং জলাশয়ের পানি দূষণ ইত্যাদি। সবগুলো বিষয়ই আবার একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আবার এসব কারণকে দূর করার জন্য যেসব ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে তাও কৃত্রিম (যেমন- ফিশপাস বা ফিশ ফ্রেন্ডলি অবকাঠামো নির্মাণ, ক্ষুদ্র পরিসরে অভয়াশ্রম নির্মাণ ইত্যাদি) যা আমাদের দেশের মত গঠন প্রক্রিয়া চলমান এরকম একটি ব-দ্বীপের ক্ষেত্রে কোন ভাবেই কার্যকর হতে পারে নি। হওয়ার কথাও নয়। একটা মিথ্যা যেমন হাজারটা মিথ্যার জন্ম দেয় তেমনই একটি কৃত্রিম সংকটের সমাধানে কৃত্রিম ব্যবস্থাপনা গ্রহণ কেবলমাত্র কৃত্রিমতাকেই বাড়িয়ে দেয় সমস্যার মূল সমাধান পাওয়া সম্ভব হয় না।

মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র উদ্ধার এবং এবং উভয় জলাশয়ের মাঝে মাছ চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত যেসব অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাশয়ের ভূপ্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা অপসারণ করা এবং নির্মিত ও নির্মিতব্য রাস্তায় পর্যাপ্ত সেতুর ব্যবস্থা করা যাতে করে বৃষ্টি বা ঢলের পানি স্বাভাবিক গতিতে নদীর দুকূল ভাসিয়ে জমিকে প্লাবিত করে ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে। অনেকেই আমার সাথে ভিন্নমত প্রদর্শন করবেন কারণ সেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল প্লাবন ভূমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বর্ষায় হাইব্রিড ধানের আবাদ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রথমত এসব বাঁধ তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে নি অর্থাৎ পুরোপুরি বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। যা হয়েছে তা হল বন্যার স্থান, সময়কাল ও ধরণ পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে দেশীয় মাছ এবং বর্ষালী ধান অভিযোজিত হতে না পেরে আজ বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছে। বর্ষালী ধান কম উৎপাদনশীল হওয়ায় চাষিরা এর পরিবর্তে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান চাষে পক্ষপাতী ফলে তারাও চায় না তাদের জমি প্রতি বছর প্রাকৃতিকভাবে প্লাবিত হোক। আবার প্লাবিত জমিতে যতদিন পানি থাকে ততদিন জমির মালিকের একক মালিকানা না থাকায় সেও প্লাবনমুক্ত জমি পেতে উৎসাহী। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আর ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির মুলো ঝুলিয়ে যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করার মাধ্যমে একদিকে যেমন প্লাবন-ভূমি পুরোপুরি বন্যা-মুক্ত করা সম্ভব হয় নি অন্যদিকে তেমনই প্রায় প্রতি বছরই বাঁধ ভেঙ্গে ফসলহানির মত নতুন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের আবির্ভাব ঘটেছে। প্লাবনভূমিতে দেশীয় বর্ষালী ধানের বা পাটের আবাদ না থাকায় জলজ পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটেছে তার সাথে দেশীয় মাছ খাপ খাইয়ে নিতে পারে নি। কারণ দেশীয় বর্ষালী ধান/পাটের ক্ষেতই হচ্ছে দেশীয় ছোট মাছের প্রধান প্রজননক্ষেত্র। আবার বাঁধ ভেঙ্গে সৃষ্ট বন্যা স্বল্পস্থায়ী হওয়ায় পৃথিবীতে আগত নতুন প্রজন্মের মাছ (শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যাদের পক্ষে পৃথিবীতে আসা সম্ভব হয়) বড় হবার সুযোগ পাবার আগেই মানুষের খাবারে পরিণত হয় ফলে পরের বছরে পর্যাপ্ত মা-বাবা মাছের স্বল্পতা দেখা দেয় যা মাছের প্রজাতি হুমকির মুখে পড়ার প্রধান কারণ।

তাই দেরীতে হলেও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন যে দেশের সব জমিতে সারা বছর উচ্চ ফলনশীল ধান উৎপাদন করতে যেয়ে মাছের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে আমরা হারিয়ে যেতে দেবো কি না? মানুষের যেমন শক্তির জন্য শর্করা তথা ভাত গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে তেমনই শরীর গঠনের জন্য প্রয়োজন রয়েছে মাছের মত আমিষের। তাই ঢালাওভাবে সারা দেশের প্লাবনভূমিকে শুষ্ক ধানের জমিতে পরিণত করার কৃত্রিম এই পদ্ধতি থেকে সরে আসা এখন সময়ের দাবী। প্লাবনভূমি ছাড়া অন্যান্য জমি তো রয়েছেই উচ্চ ফলনশীল ধানের আবাদের জন্য। এমনকি প্লাবনভূমিতেও বর্ষাকাল ছাড়া অন্যান্য সময়ে উচ্চ ফলনশীল ধান আবাদ করা যায়। প্লাবনভূমিতে বন্যার সময় পলি পড়ায় তাতে সারও কম লাগে খরচও কম হয়। তাই প্লাবনভূমি ছাড়া অন্যান্য স্থানে সারা বছর এবং প্লাবনভূমিতে বর্ষার সময় ছাড়া অন্যান্য সময়ে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান চাষ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হাজার বছর ধরে প্লাবনভূমি যেভাবে সনাতন পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে তাকে সেভাবে চলতে দেয়া যাতে মা-বাবা মাছ নিশ্চিতভাবে বাধাহীনভাবে প্রজননে অংশ নিতে পারে এবং নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ পায়।

কৃত্রিম বাঁধ ও রাস্তার পাশাপাশি বিশাল জনসংখ্যার চাপ ও ভূমিদস্যুদের লোভী দখলবাজ চরিত্র বাধাহীন ভাবে বিকশিত হওয়ায় প্লাবন-ভূমি ও নদীর মতো উন্মুক্ত জলাশয়ের আয়তন কমেছে ক্রমশ। জলাভূমি হিসেবে স্বীকৃত স্থান ভরাট করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র এবং উভয় জলাশয়ের মাঝে মাছের চলাচলের সংযোগ খাল বা নদী দখল হয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে দ্রুতই। এছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ নানা ধরণের কৃষি বর্জ্যে আজ প্লাবনভূমি, বিল হাওরের পানির রাসায়নিক গুনাগুণ এমনভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে যে তা মাছের প্রজননের প্রতিকূলতার আর একটি বড় কারণ। এর সাথে যোগ হয়েছে নদী তীরবর্তী কল-কাখানার বর্জ্যের দূষণ যা নদীকে দূষিত করে মাছকে নদী ছাড়া করেছে অনেক আগে আর বর্ষায় নদীর এই দূষিত পানি প্লাবিত হয়ে বিলে বা হাওরে প্রবেশ করায় সেখানকার পানিও দূষিত হয়ে পড়ছে। এমত অবস্থায় জলাশয় দখল ও ভরাট করা এবং কল-কারখানা বা জাহাজভাঙ্গা বর্জ্যে দূষিত করা থেকে বিরত রাখার জন্য যা যা করা প্রয়োজন যেমন- কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা একান্ত জরুরী।

২. ত্রুটিপূর্ণ জলাশয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং মাত্রা অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ নিয়ন্ত্রণ:
জলাশয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের লোভে এসব তুলে দেয়া হয়েছে মৎস্য বৈচিত্র্য বিষয়ে অনাগ্রহী ও অবিবেচক অনেক ইজারাদারদের হাতে। এসব জলাশয়ে সর্ব সাধারণেরা প্রবেশাধিকার হারিয়ে একদিকে যেমন সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তেমনই অধিক লাভের আশায় ইজারাদার কর্তৃক নিয়মনীতি না মেনে অবৈধভাবে মাত্রা অতিরিক্ত মাছ আহরণ করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। তাই এসব জলাশয় ব্যবস্থাপনায় অর্থনৈতিক বিষয়াবলীকে কম গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক ও জীবতাত্ত্বিক বিষয়াবলীকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নত জলাশয় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মাত্রা অতিরিক্ত মাছ আহরণের লক্ষ্যে মাছ শিকারে ক্ষতিকর পদ্ধতি যেমন- সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল (যা কারেন্ট জাল নামে অধিক পরিচিত) ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ ধরা বা বিষ প্রয়োগে মাছ বা চিংড়ি শিকার করা ছাড়াও নদীতে আড়াআড়ি বানা বা জালের বাঁধ নিয়ে মাছ ধরা, কাঠা ফিশিং, মৃত প্রাণী ব্যবহার করে মাছ শিকার এবং প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে চিংড়ির পোনা ধরা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, গণসচেতনতা ও শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা।

৩. বিদেশী মাছের যুক্তিসঙ্গত আগমন নিশ্চিতকরণ:
বর্তমানে দেশে বিদেশী মাছের প্রজাতি ও জাতের সংখ্যা সব মিলিয়ে (চাষকৃত ও বাহারি) শতাধিক। এসব বিদেশী মাছ নিয়ে আসার আগে সেই মাছের বিস্তারিত জীবতাত্ত্বিক ইতিহাস, পরিবেশতন্ত্রে ক্ষতিকর সম্ভাব্য প্রভাব, কোন রোগ-জীবাণুর বাহক কি-না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন, খাদ্যাভ্যাস কী, দেশের জলজ পরিবেশের জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনবে কিনা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উন্নত কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা থাকা দরকার এবং তার প্রয়োগ যেন হয় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রবেশ করা বিদেশী মাছের বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করা প্রয়োজন। যেমন বন্যা কবলিত এই দেশে তেলাপিয়া, আফ্রিকান মাগুর, পিরানহা, মিরর বা কমন কার্প, থাই পাঙ্গাশ, সাকার মাউথের মত মাছ উন্মুক্ত জলাশয়ে ঢুকে জীববৈচিত্র্যের উপর কি ধরণের প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে গবেষণা দরকার। দরকার কী কী মাছ ছিল, কী কী মাছ আছে, কী কী মাছ নতুন যোগ হয়েছে সে বিষয়ে দেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি জরিপ হওয়ার। এসব জরিপ ও গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে আমদানির অনুমতি চাওয়া মাছের প্রজাতির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।

৪. মাছ চাষের বিবেচনাহীন প্রসার বন্ধ করা প্রয়োজন:
মাছ চাষের দোহাই দিয়ে পুকুর থেকে আগেই দেশীয় ছোট মাছকে ঝেটিয়ে বিদায় করা হয়েছে, বর্তমানে মাছ চাষ বিলে বিস্তার লাভ করায় এখন বিলের মতো উন্মুক্ত জলাশয় (যা দেশী ছোট মাছের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র) থেকে ক্রমশ দেশীয় ছোট-বড় মাছ বিদায় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই বিল, হাওর ও হ্রদের মত জলাশয়গুলোতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষের পরিবর্তে দেশীয় ছোট মাছ যাতে নিশ্চিতভাবে প্রজনন করতে পারে এবং বড় হতে পারে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বিলের মত উন্মুক্ত জলাশয় জুড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষের প্রেক্ষাপটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তার নিকটবর্তী জলাশয়ে প্রবেশাধিকার হারিয়ে নতুন সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয়াবলী বিবেচনায় নিয়ে বিল, হাওর ও হ্রদের মত বৃহৎ জলাশয়ের ব্যবস্থাপনায় মাছ চাষের মতো বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে মৎস্য বৈচিত্র্যের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে কলাকৌশল নির্ধারণ করা একান্ত প্রয়োজন।

উল্লেখিত বিষয়াবলীকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে মৎস্য প্রজাতি রক্ষার যে কৌশল আলোচিত হল তা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবী। কিন্তু তা সহজ নয় কারণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এর সাথে রয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ ও বাণিজ্যিক বিষয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু তাই বলে তা অসম্ভবও নয়। তবে যতদিন উল্লেখিত কৌশল বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছে না ততদিন নানাবিধ কৃত্রিম কৌশল প্রয়োগ করা দরকার। তবে অবশ্যই স্মরণে রাখা প্রয়োজন এসব কৃত্রিম কৌশল স্থায়ী বা টেকসই কোন সমাধান নয়। যেমন-

বৃহৎ পরিসরে অভয়াশ্রম নির্মাণ ও সংরক্ষণ:
যেসব প্রজাতির মাছ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় সেসব মাছের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, উন্নত মানের ও বৃহৎ এলাকা জুড়ে অভয়াশ্রম তৈরি করে তাদের বংশ বৃদ্ধি ও বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। বর্তমানে স্থাপনকৃত ছোট আকারের অভয়াশ্রমের পরিবর্তনে বড় এলাকাজুড়ে (যেমন সম্পূর্ণ বিল বা হাওর) অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে এবং তা কড়া নজরদারির মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।

কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক চাষ উন্নয়ন:
যেসব মাছ হুমকির মুখে রয়েছে সেসব মাছের কৃত্রিম প্রজননের কলাকৌশল উদ্ভাবন ও চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে জার্মপ্লাজমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ক্রায়োপ্রিজারভেশনের মতো উচ্চতর প্রযুক্তি নির্ভর জার্মপ্লাজম ব্যাংক পরিচালনা করা যেতে পারে যাতে হ্যাচারি মালিকরা কাঙ্ক্ষিতমানের পোনা উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে। অন্যদিকে থাই কৈ, থাই পুঁটির মতো বিদেশী মাছের কৃত্রিম প্রজননের পরিবর্তে একই প্রজাতির দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজননের কলাকৌশল উদ্ভাবন ও এর সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। যাতে করে হারাতে বসা বিপন্ন দেশীয় মাছ আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পারে।

পরিশেষে সংক্ষেপে বলা যায় দেশীয় মৎস্য প্রজাতি রক্ষার প্রধান এবং স্থায়ী উপায় হিসেবে প্লাবনভূমি, বিল, হাওর, নদীর মতো উন্মুক্ত জলাশয়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে ক্ষতিকর বাঁধ অপসারণ এবং পর্যাপ্ত সেতুসহ রাস্তা নির্মাণ করতে হবে। প্রাকৃতিক জলজ পরিবেশ হাজার বছর ধরে (সাম্প্রতিক তিন দশক ছাড়া) যেভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে সেভাবে পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতে যাতে ব্যবহৃত হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি বর্জ্য ও কলকারখানার দূষক সরাসরি যাতে জলাশয়ে না মেশে তার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। মাছ ধরার ক্ষতিকর পদ্ধতি পরিহার ও বাণিজ্যিক ইজারা প্রথার পরিবর্তে সামাজিক ও জীবতাত্ত্বিক বিষয়াবলীকে গুরুত্ব দিয়ে জলাশয় ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করতে হবে। সব জলাশয়কে মাছ চাষের আওতায় নিয়ে আসার নীতি থেকে সরে এসে সকল বদ্ধ জলাশয়ে এবং সুনির্দিষ্ট উন্মুক্ত জলাশয়ের একাংশে (খাঁচায়. পেনে ইত্যাদি) তা সম্প্রসারণ করতে হবে। দেশে বিদেশী মাছের প্রবেশ পথে উন্নত কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরে অভয়াশ্রম নির্মাণ ও সংরক্ষণ এবং হুমকির মুখে থাকা দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণে মনোযোগী হতে হবে। তবেই আমরা ফিরে পেতে সক্ষম হবো আমাদের মৎস্য বৈচিত্র্যের হারানো ঐতিহ্য।

তথ্যসূত্র:
[০১] গৌতম কুমার রায়, চলন বিল হারাচ্ছে সক্রিয়তা: বিলুপ্ত পঁচিশ প্রজাতির মাছ, দৈনিক জনকণ্ঠ, ১১ জুন ২০১০।
[০২] হাসনাইন ইমতিয়াজ, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র: হারিয়ে যাবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, শীর্ষনিউজ, ১৩ মে ২০১১।
[০৩] সুনামগঞ্জের হাওরে ৫৪ প্রজাতির মাছ বিপন্ন: বেসরকারী সংস্থার গবেষণা রিপোর্ট, দৈনিক জনকণ্ঠ, ১১ মে ২০১১।
[০৪] এ.বি.এম. মহসিন, জাহাজভাঙ্গা কার্যক্রমঃ বিপন্ন মানুষ, মাছ আর পরিবেশ, বিডিফিশ বাংলা, ২০১০।
[০৫] আরাফাত সিদ্দিকী, কাঠা দিয়ে মাছ শিকার: হুমকির মুখে মুক্তজলাশয়ের মৎস্যবৈচিত্র্য, বিডিফিশ বাংলা, ২০১০।
[০৬] এ.বি.এম. মহসিন, মৃত প্রাণী ব্যবহার করে মাছ শিকারঃ মৎস্য বৈচিত্র্যের জন্য একটি বড় হুমকি, বিডিফিশ বাংলা, ২০১০।
[০৭] হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, কৃষক কমিউনিটি।
[০৮] হাবিবুর রহমান, উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে, প্রবাসবার্তা, ১১ মে ২০১০।
[০৯] এ.বি.এম. মহসিন, উপকূলীয় এলাকায় অবৈধভাবে চিংড়ির পোনা আহরণঃ হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য, বিডিফিশ বাংলা, ২০১০।
[১০] এস এম নাজমুল হক ইমন, বাজারজাত হচ্ছে পিরানহা! , দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ নভেম্বর ২০১০।

[১১] মো.শফিকুর রহমান, রাঙামাটির হ্রদে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে: কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ হুমকির মুখে, বিএনবি নিউজ, ১৭ মার্চ ২০১১।

[১২] ফজলে এলাহী, বদলে যাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য বৈচিত্র্য, সাপ্তাহিক ২০০০, ২০ জানুয়ারী ২০১১।
[১৩] ফখরে আলম, অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশের বিড়ম্বনা, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৮ মে ২০১০।
[১৪] শরীফুল ইসলাম, শতাধিক দেশি প্রজাতির মাছ বিপন্ন, প্রথম আলো, ৫ আগষ্ট, ২০০৯।
[১৫] SM Galib and ABM Mohsin, 2011. Cultured and Ornamental Exotic Fishes of Bangladesh: Past and Present. LAP LAMBERT Academic Publishing GmbH @ Co. KG, Germany. 176 pp.
[১৬] ড. সন্তোষ কুমার সরকার, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও ক্ষতিকারক বিদেশী প্রজাতি, কৃষি তথ্য সার্ভিস। ডাউনলোড ১৮ মে ২০১১।

(Visited 51 times, 1 visits today)

লেখক পরিচিতি:

সহযোগী অধ্যাপক, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। যোগাযোগ: মোবাইল- ০১৭১৬২৯৬৩৩৯ এবং ইমেইল: abmmohsin@bdfish.org

Leave a Reply