ক্যাটাগরি: জীববিজ্ঞান | পূর্বপাঠ | প্রাণিবিজ্ঞান

নিউক্লিক এসিড (ডিএনএ ও আরএনএ)

ফিশারীজ কোন মৌলিক বিজ্ঞান নয় বরং এটি জীববিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের একটি সমন্বিত বিজ্ঞান যা মাছ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশিষ্ট প্রাণীদের জীবতত্ত্ব, চাষ, আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা, আহরণ, প্রক্রিয়াজনকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করে। তাই ফিশারীজকে বুঝতে হলে অবশ্যই জীববিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। সে উদ্দেশ্য পূরণকল্পে শুরু হল বিডিফিশ বাংলার পূর্বপাঠ অধ্যায়। এলেখার বিষয় নিউক্লিক এসিড (ডিএনএ ও আরএনএ)। সাথে রইল কুইজে অংশ নেয়ার সুযোগ

ক্রোমোজোমের রাসায়নিক গঠন:

  • নিউক্লিক এসিড এবং প্রোটিন নিয়ে ক্রোমোজোম গঠিত।
  • নিউক্লিক এসিড রয়েছে দুই ধরণের যথা- ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড বা ডিএনএ (Deoxiribonuclic acid or DNA) এবং রাইবোনিউক্লিক এসিড বা আরএনএ (Ribonuclic acid or RNA)।
  • প্রোটিনও রয়েছে দু’ধরণের যথা- হিস্টোন (Histone) ও ক্রোমোজোমিন (Chromosomin)।
  • ক্রোমোজোমে ডিএনএ ও হিস্টোনের পরিমাণ যথাক্রমে ৩৫% ও ৫৫%।

 

ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড বা ডিএনএ:

  • ডিএনএ হচ্ছে ক্রোমোজোমের একমাত্র স্থায়ী রাসায়নিক পদার্থ এবং বংশগতির বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক। তবে সাইটোপ্লাজমে মুক্ত অবস্থায় অথবা অঙ্গাণুর ধাত্রে অবস্থান করতে পারে।
  • বিজ্ঞানী মিসার (Miescher) ১৮৬৮ সালে প্রথম ডিএনএ আবিষ্কার করার পর এর নাম দেন নিউক্লিন (Nuclein)।
  • বিজ্ঞানী ওয়াটসন ও ক্রিক (James Watson and Francis Crick) ১৯৫৩ সালে ডিএনএ এর ভৌত ও রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে ডিএনএ ডবল হেলিক্স মডেল (DNA Double Helix model) প্রস্তাব করেন যা তাদেরকে ১৯৬৩ সালে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়।
  • ডিএনএ এর আণবিক ওজন ১০ থেকে ১০ এর মধ্যে। এর অতিবেগুনী রশ্মি (ultraviolet ray) শোষণের ক্ষমতা অনেক বেশী।
  • পাঁচ কার্বন বিশিষ্ট ডিঅক্সিরাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, অজৈব ফসফেট এবং অ্যাডেনিন (adenine), গুয়ানিন (guanine), সাইটোসিন (cytosin) ও থাইমিন (thymine) নামক নাইট্রোজেন বেস বা ক্ষার নিয়ে ডিএনএ অণু গঠিত।
  • অ্যাডেনিন ও গুয়ানিনকে পিউরিন () এবং সাইটোসিন ও থাইমিনকে পাইরিমিডিন () বলে।
  • এক অণু ডিঅক্সিরাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা ও এক অণু নাইট্রোজেন বেস (অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও থাইমিনের যে কোন একটি) একত্রে নিউক্লিওসাইট (nucleoside) গঠন করে।
  • এক অণু নিউক্লিওসাইট ও এক অণু অজৈব ফসফেট একত্রে নিউক্লিওটাইড (nucleotide) গঠন করে। অর্থাৎ একটি নিউক্লিওটাইড অণু এক অণু ডিঅক্সিরাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, এক অণু নাইট্রোজেন বেস ও এক অণু অজৈব ফসফেট নিয়ে গঠিত।
  • দুই অণু নিউক্লিওটাইড একত্রে ডাই-নিউক্লিওটাইড, তিন অণু নিউক্লিওটাইড একত্রে ট্রাই-নিউক্লিওটাইড এবং তিনের অধিক নিউক্লিওটাইড একত্রে পলি-নিউক্লিওটাইড গঠন করে। ডিএনএ হচ্ছে একটি পলি-নিউক্লিওটাইড শিকল বা চেইন (chain) যাতে কয়েক হাজার নিউক্লিওটাইড থাকে এদের মনোমারস (monomeres) বলা হয়।
  • একটি নিউক্লিওটাইডের নাইট্রোজেন বেস হিসেবে অ্যাডেনিন থাকলে তাকে ডিঅক্সিঅ্যাডিনোসিন মনোফসফেট, গুয়ানিন থাকলে তাকে ডিঅক্সিগুয়ানোসিন মনোফসফেট, সাইটোসিন থাকলে তাকে ডিঅক্সিসাইটোসিন মনোফসফেট আর থাইমিন থাকলে তাকে ডিঅক্সিথাইমিডিন মনোফসফেট বলে।
  • নাইট্রোজেন বেস (অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও থাইমিনের যে কোন একটি) সবসময় ডিঅক্সিরাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার ১ম কার্বনের সাথে যুক্ত থাকে। অন্যদিকে ফসফেট যুক্ত থাকে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার ৩য় অথবা ৫ম কার্বনের সাথে।
  • প্যাঁচানো পলিনিউক্লিওটাইড চেইনের একটি নাইট্রোজেন বেস অপর চেইনের অন্য একটি নাইট্রোজেন বেসের সাথে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হাইড্রোজেন বন্ড দ্বারা যুক্ত থাকে। যেমন- অ্যাডেনিন ও থাইমিন দুটি এবং গুয়ানিন ও সাইটোসিন তিনটি হাইড্রোজেন বন্ড দ্বারা যুক্ত থাকে।
  • দুটি পলিনিউক্লিওটাইড চেইন ২০ Å দূরত্বে অবস্থান করে পরস্পর প্যাঁচানো অবস্থায় উল্টোমুখী হয়ে অবস্থান করে।  এক প্যাঁচ সম্পন্ন হতে মোট দশটি নিউক্লিওটাইডের প্রয়োজন হয়। এক অণু নিউক্লিওটাইডের দৈর্ঘ্য ৩.৪ Å হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাঁচের দৈর্ঘ্য ৩৪ Å ।

 

রাইবোনিউক্লিক এসিড বা আরএনএ:

  • আরএনএ সাধারণত সাইটোপ্লাজমে মুক্ত অবস্থায় থাকে। তবে অঙ্গাণুর ধাত্রে, নিউক্লিয়াসে ও রাইবোজোমেও পাওয়া যায়।
  • রাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, অজৈব ফসফেট এবং অ্যাডেনিন (adenine), গুয়ানিন (guanine), সাইটোসিন (cytosin) ও ইউরাসিল (uracil) নামক নাইট্রোজেন বেস বা ক্ষার নিয়ে আরএনএ গঠিত।
  • অ্যাডেনিন ও গুয়ানিনকে পিউরিন () এবং সাইটোসিন ও ইউরাসিল পাইরিমিডিন () বলে।
  • এক অণু রাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, এক অণু নাইট্রোজেন বেস (অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও ইউরাসিল যে কোন একটি) ও এক অণু অজৈব ফসফেট একত্রে নিউক্লিওটাইড (nucleotide) গঠন করে।
  • নাইট্রোজেন বেস (অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও ইউরাসিলের যে কোন একটি) সবসময় রাইবোজ কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার ১ম কার্বনের সাথে যুক্ত থাকে। অন্যদিকে ফসফেট যুক্ত থাকে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার ৩য় অথবা ৫ম কার্বনের সাথে।
  • আরএনএ মূলত নিউক্লিওটাইডের একক চেইন বা শিকল। কখনও কখনও একক চেইন ভাঁজ খেয়ে দ্বি-সূত্র গঠন করতে পারে।
  • যে আরএনএ প্রজননে অংশ নেয়া তাদের প্রজননিক বা জেনেটিক আরএনএ আর যে আরএনএ প্রজননে অংশ নেয় না তাদের অপ্রজননিক বা ননজেনেটিক আরএনএ বলে।
  • ননজেনেটিক আরএনএ আবার তিন প্রকার। যথা-
    1. রাইবোজোমাল আরএনএ (Ribosomal RNA or rRNA): রাইবোজোমের প্রধান সাংগঠনিক উপাদান হিসেবে প্রোটিন সংশ্লেষে ভূমিকা রাখে। কোষের ৮০ শতাংশ আরএনএ-ই এ ধরণের এবং এগুলো নিউক্লিয়াস থেকে সৃষ্ট ও রাইবোজোমে অবস্থান করে। এটি এমআরএনএ’র টেমপ্লেট বা ছাঁচ হিসেবেও কাজ করে।
    2. বার্তাবহ আরএনএ (Messenger RNA or mRNA): নিউক্লিয়াসের ডিএনএ থেকে প্রোটিন সংশ্লেষের কোড বা সূত্র সাইটোপ্লাজমে বহন করে নিয়ে আসে। কোষের ১০ শতাংশ আরএরএ-ই এ ধরণের এবং এটি প্রোটিন সংশ্লেষের সময় রাইবোজোমের সাথে যুক্ত থাকে।
    3. পরিবাহক আরএনএ (Transfer RNA or tRNA): অ্যামাইনো এসিড পোল থেকে বার্তাবহ আরএনএ’র প্রদত্ত কোড বা বার্তা অনুসারে সঠিক অ্যামাইনো এসিড প্রোটিন সংশ্লেষের স্থানে পরিবহণ করে। লবঙ্গের মত এজাতীয় আরএনএ কোষের মোট আরএনএ’র ১০ শতাংশ এবং বার্তাবহ আরএনএ’র তুলনায় আকারে ছোট।

 

ডিএনএ’র প্রতিরূপ (DNA replication):

  • বিজ্ঞানী ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের ডাবল হেলিক্স মডেলের উপর ভিত্তিকরে ডিএনএ’এ প্রতিরূপ তৈরি ব্যাখ্যা দেন যা পরবর্তীতে তেজষ্ক্রীয় পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।
  • কোষ বিভাজনের ইন্টারফেজ দশার এস বা সংশ্লেষণমূলক উপপর্যায়ে ডিএনএ’র প্রতিরূপ সৃষ্টি হয়।
  • আদি ডিএনএ থেকেই নতুন ডিএনএ’র প্রতিরূপ তৈরি বা সৃষ্টি হয়।
  • প্রতিটি অপত্য বা নতুন ডিএনএ’র একটি নিউক্লিওটাইড চেইন বা শিকল বা সূত্র পুরানা বা মাতৃ ডিএনএ’র এবং অপরটি নতুন ভাবে সংশ্লেষিত নিউক্লিওটাইড চেইন।
  • প্রতিটি নতুন ডিএনএ’র এক সূত্রের নাইট্রোজেন বেস অপর সূত্রের নাইট্রোজেন বেসের সাথে নতুনভাবে হাইড্রোজেন বন্ড দিয়ে যুক্ত হয়।
  • ১৯৫৬ সালে বিজ্ঞানী অর্থার কর্নবার্গ (Arthur Kornberg) কৃত্রিমভাবে ডিএনএ প্রতিরূপ সৃষ্টি তথা তৈরি করতে সক্ষম হন।

 

 তথ্যসূত্র:

 

কুইজে অংশ নিতে লিঙ্কটি অনুসরণ করুন

Visitors' Opinion

লেখক

প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বিস্তারিত

Leave a Reply