ক্যাটাগরি: চিংড়ি ও অন্যান্য | মাৎস্য জীববৈচিত্র্য | মাৎস্য সম্পদ

শুশুক: বাংলাদেশের স্বাদুপানির বিপন্ন স্তন্যপায়ী

শুশুক: বাংলাদেশের স্বাদুপানির বিপন্ন স্তন্যপায়ী

শুশুক: বাংলাদেশের স্বাদুপানির বিপন্ন স্তন্যপায়ী


একত্রিশে মে, দুই হাজার এক সাল। পদ্মা নদীতে (সাহাপুর,রাজশাহী) মাছ ধরার সময় জেলেদের জালে ধরা পড়ে বাংলাদেশের স্বাদুপানির বিপন্ন স্তন্যপায়ী শুশুকের একটি সদস্য। খবর পেয়ে সেটি দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারীজ বিভাগ। পরবর্তীতে সেটির কঙ্কাল ঐ বিভাগে সংরক্ষণ করা হয়। উল্লেখিত শুশুকটি ছিল স্ত্রী জাতীয়। দেহের বর্ণ পৃষ্ঠীয় দিকে ধুসর এবং অঙ্কীয় দিকে সাদাটে। মোট দৈর্ঘ্য ৮.৮৩ ফুট এবং গড় পরিধি ৪.২৫ ফুট। ওজন ১৬৫ কেজি, নীচের এবং উপরের চঞ্চুর দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ১.৩৩ ও ১.১৯ ফুট। উভয় চোয়ালের প্রতি পাশে ২৭টি করে দাঁত বর্তমান। চঞ্চু থেকে পায়ু পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৫.০৮ ফুট। নীচের চোয়ালের শেষ থেকে জনন ছিদ্রের দূরত্ব ৩.০৮ ফুট। জনন ছিদ্রটি হচ্ছে ৪x১.৫ ইঞ্চি। এর উভয় পার্শ্বে একটি করে স্তনবৃন্ত বর্তমান। উভয় স্তনবৃন্তের মধ্যবর্তী দূরত্ব ৫.২৫ ইঞ্চি। চঞ্চুর গঠন ও দাঁতের সংখ্যা P. gangetica থেকে ভিন্নতর হওয়ায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিশিষ্ট প্রাণিবিজ্ঞানী P. gangetica কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। প্রাণিবিজ্ঞানের ইতিহাসে পদ্মা নদীতে অন্য কোন প্রজাতির শুশুক পরিলক্ষিত না হওয়ায় এই সংশয় কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়েও আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি। পরবর্তীতে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত প্রাণিবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. ফরিদ আহসান এবং প্রফেসর ড. বেনজির আহমেদ ছবি দেখে নিশ্চিত করেন  যে, শুশুকটির প্রজাতি P. gangetica  তবে বয়স বৃদ্ধিজনিত বা বার্ধক্যজনিত কারণে ধৃত শুশুকটির গঠনগত পরিবর্তন সমূহ হয়েছে।

এরপর কেটে গেছে এক  দশক, কিন্তু শুশুক রক্ষায় সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য ঘোষণার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ প্রজাতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায় না। বরং এর আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস এবং বিবেচনাহীন শিকারের কারণে এর স্থান হয়েছে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায়। বাংলাদেশের স্বাদুপানির শুশুক ১৯৯৪ সালে IUCN, Bangladesh কর্তৃক প্রথমবারের মত Vulnerable অর্থাৎ আশংকাজনক বা সুরক্ষিত নয় হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়। ঠিক এর দুই বছর পর ১৯৯৬ সালে এটি বিপন্ন (Endangered) প্রজাতির তালিকায় স্থান পায়। প্রাণী-প্রেমীদের জন্য যা মোটেও সুখের সংবাদ নয়। বিপন্ন এই জলজ স্তন্যপায়ীকে মাত্র তিন দশক আগেও পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী এবং এদের শাখানদীতে বড় বড় ঝাঁক বেঁধে বিচরণ করতে দেখা যেতো। বর্তমানে মাঝে মধ্যে বিশেষ কয়েকটি স্থানে এদের একাকী অথবা ছোট দলে (১-৩টি কখনো কখনো সর্বোচ্চ ২০টি) বিভক্ত হয়ে বিচরণ করতে দেখতে পাওয়া যায়।

এ পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বাদুপানির শুশুক বা ডলফিনের চারটি জেনাসের (Genus) কথা জানা যায়। এগুলো হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার IniaStenodelphis চীনের Lipotes (বর্তমানে বিলুপ্ত) এবং ভারতবর্ষের Platenista । এর মধ্যে Platenista gangetica যা Ganges Dolphin বা শুশু বা শুশুক নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। P. gangetica এর শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান (taxonomic position) প্রাণীরাজ্যের উপরের দিকে। এটি Phylum-Chordata, Class-Mammalia, Order-Cetacea এবং Family-Platanistidae এর অন্তর্গত। নেপাল, পাকিস্তান,  ভারত ও বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদী এবং এর শাখা নদীই এদের প্রধান আবাসস্থল। বসবাস উপযোগী তাপমাত্রা ৮-৩৩ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। রেকর্ডকৃত তথ্য থেকে জানা যায় এদের মোট দৈর্ঘ্য সীমা ২.৩ থেকে ২.৬ মিটার আর প্রস্থে গড়ে ৪৬ সেমি। চঞ্চু বা রোস্ট্রামের দৈর্ঘ্য ১৮-২১ সেমি। উভয় চোয়ালের প্রতি পাশে দাঁতের সংখ্যা ২৮-২৯টি। স্ত্রীরা পুরুষের চেয়ে দৈর্ঘ্যে বড় হয়ে থাকে। দেহের বর্ণ পৃষ্ঠীয় দিকে ধুসর এবং অঙ্কীয় পাশে তা হালকা ধুসর বা সাদাটে হয়ে থাকে।

মাছ এবং অমেরুদণ্ডী জলজ প্রাণী এদের খাদ্য। মাছের মধ্যে ক্যাট ফিশ, বেলে ও কার্পজাতীয় মাছ উল্লেখযোগ্য এবং অমেরুদণ্ডীদের মধ্যে উল্লেখ করার মত হচ্ছে চিংড়ী। শুশুক শিশুরা জন্মের ১-২ মাস পরেই কঠিন খাদ্য গ্রহণ করতে পারলেও এক বছর পর্যন্ত স্তন্যপান করে থাকে। এরা সর্বোচ্চ ২৬-২৮ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

স্ত্রীরা বছরের যে কোন সময়ই বাচ্চা প্রসব করতে পারে তবে অধিকাংশই মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বাচ্চা প্রসব করে থাকে।  এছাড়াও ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসও এদের উল্লেখযোগ্য প্রসবকাল। গর্ভধারণ কাল ৯-১০ মাস, ক্ষেত্র বিশেষে তা ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারে। ১০ বছর বয়সে এদের প্রজনন পরিপক্বতা আসে। এরা একসাথে কেবলমাত্র একটি বাচ্চাই প্রসব করে।

শুশুক মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। অনেকই এদের মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে তবে তার উল্লেখযোগ্য নয়। কারণ মাংস খাওয়ার জন্য জেলেরা শুশুক শিকার করে না। তবে শুশুকের ভেষজ গুণসম্পন্ন তেল ঔষধ তৈরি ছাড়াও মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। এজন্য এর বাজারমূল্য অনেক। তাই একটি শুশুক ধরতে পারলেই মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়। মাঝারি আকারের একটি শুশুকের দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা। আর প্রতি লিটার তেল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাজারে বিক্রি হয়। ফলে জেলেদের নজর শুশুকের দিকে পড়েছে। সবমিলিয়ে বলা যায় নিরীহ এই প্রাণীটির বিলুপ্তির প্রধান কারণসমূহ হচ্ছে- মাংস বিশেষত তেল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিবেচনাহীন শিকার এবং আবাস ও প্রজননস্থল ধ্বংস যেমন- নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ (ব্যারেজ বা ড্যাম) ও উভয় তীরে সুদৃঢ় বাঁধ নির্মাণ, নদীতে আড়াআড়ি ভাবে জাল বা বানা ইত্যাদি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ইত্যাদি। এছাড়াও আরও যেসব কারণকে বিবেচনায় নেয়া যায় তা হল- কৃষি জমিতে সেচে জন্য মাত্রাতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, রাসায়নিক দূষণসহ অন্যান্য জলজ দূষণ, নদীর পানিতে জলযান কর্তৃক উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের স্বাদুপানির বিপন্ন এই স্তন্যপায়ীকে বাঁচাতে এখনই বড় পরিসরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এজন্য প্রথমেই শুশুক শিকার, বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে।  একই সাথে নদীর পরিবেশ উন্নয়নে নদীকে তার মত চলতে দিতে হবে। সকল বাঁধ অপসারণ, যৌক্তিক সেচ ব্যবস্থা প্রবর্তন, রাসায়নিক দ্রব্যের অপব্যবহার বন্ধ এবং শুশুক অধ্যুষিত এলাকায় যন্ত্রচালিত নৌযানের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের  দাবী।

তথ্যসূত্র:

 

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply