ক্যাটাগরি: আচরণবিদ্যা | মাৎস্য জীববিজ্ঞান

মাছের সহজাত (Instinctive) আচরণ

সহজাত (Instinctive) আচরণ:
একটি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি সদস্য কোন রকম পূর্বজ্ঞান বা শিক্ষণ ছাড়াই জৈবিক প্রয়োজনে বা আত্মরক্ষার জন্য বংশ পরস্পরায় একইভাবে যেসব জন্মগত অপরিবর্তনীয় আচরণ প্রদর্শন করে তাকে সহজাত আচরণ বলে। প্রতিটি প্রাণীই এক বা একাধিক সহজাত প্রবৃত্তি (Instinct) এবং প্রতিবর্তী ক্রিয়ার (reflex action) এর ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।

সহজাত আচরণের বৈশিষ্ট্য:

  • বংশগত এবং জিন নিয়ন্ত্রিত। এটি বংশ পরস্পরায় একই ভাবে আত্মপ্রকাশ করে অর্থাৎ এ আচরণ অপরিবর্তনীয়।
  • প্রতিটি প্রজাতির জন্য এ আচরণ সুনির্দিষ্ট
  • একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি সদস্য একইভাবে এ আচরণ প্রদর্শন করে থাকে।
  • জন্মগত হলেও অনেক আচরণ জন্মের সাথে সাথে প্রকাশ না পেয়ে একটি নির্দিষ্ট বয়সে প্রকাশ পেয়ে থাকে। যেমন- মাছ বা পাখির বাসা তৈরি।
  • কোন রকম পূর্বজ্ঞান বা শিক্ষণ ছাড়াই এ আচরণ প্রদর্শিত হয়ে থাকে।
  • অভিজ্ঞতা বা শিক্ষণের মাধ্যমে এ আচরণ অর্জন করা সম্ভব নয়।
  • ফলাফল সম্পর্কে কোন পূর্ব ধারণা না থাকলেও প্রাণী একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই এ আচরণ প্রদর্শন করে থাকে।
  • প্রাণীর জৈবিক প্রয়োজনীয়তা পূরণসহ আত্মরক্ষা, বংশরক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করে।

মাছে যেসব সহজাত আচরণ দেখতে পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিচে আলোচনা করা হল-
খাদ্যগ্রহণ আচরণ (Feeding Behaviour):
মাছ খাদ্য অনুসন্ধান ও গ্রহণের সময় যেসব আচরণ প্রদর্শন করে তাই মাছের খাদ্যগ্রহণ আচরণ। প্রজাতিভেদে মাছে খাদ্য অনুসন্ধান ও গ্রহণের সময়ে প্রদর্শিত আচরণে সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বিষয়টি মাছের খাদ্যগ্রহণের স্বভাবের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

কত প্রকারের খাদ্য গ্রহণ করে তার উপর ভিত্তিকরে মাছকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  • ইউরিফেজিক (Euryphagic) মাছ: এরা বহু প্রকারের খাবার গ্রহণ করে।
  • স্টোনোফেজিক (Stenophagic) মাছ: এরা কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রকারের খাবার গ্রহণ করে।
  • মনোফেজিক (Monophagic) মাছ: এরা কেবলমাত্র এক প্রকারের খাবার গ্রহণ করে।

কি ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে তার উপর ভিত্তিকরে মাছকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  • শাকাশী (Herbivorous) মাছ: এরা উদ্ভিদ জাতীয় খাবার গ্রহণ করে। যেমন- কাতলা, সিলভার কার্প ইত্যাদি।
  • মাংসাশী (Carnivorous) মাছ: এরা প্রাণী জাতীয় খাবার গ্রহণ করে। যেমন- শিং, সোল, বোয়াল ইত্যাদি।
  • সর্বভুক (Omnivorous) মাছ: এরা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় ধরনের খাবারই গ্রহণ করে। যেমন- তেলাপিয়া ইত্যাদি।

কিভাবে খাদ্য গ্রহণ করে তার উপর ভিত্তিকরে মাছকে প্রধানত পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  • শিকারি (Predator) মাছ:
    • এরা অন্য মাছ বা প্রাণীকে শিকার করে খায়। যেমন- বোয়াল, সোল ইত্যাদি
  • চারনিক (Grazer) মাছ:
    • এরা উদ্ভিদ বা নিশ্চল প্রাণীর অংশ বিশেষ কামড়ে খেয়ে থাকে। যেমন- গ্রাস কার্প, তেলাপিয়া ইত্যাদি।
  • ছাঁকনদার (Strainer) মাছ:
    • এরা প্লাঙ্কটন জাতীয় খাবার পানির মধ্য থেকে ছেঁকে গলধঃকরণ করে থাকে। যেমন- রুই, ইলিশ ইত্যাদি।
  • শোষক (Sucker) মাছ:
    • এরা জলাশয়ে তলদেশস্থ কাঁদায় বসবাসকারী প্রাণী (মূলত বেন্থোস) কাদামাটিসহ গলধঃকরণ করে থাকে। যেমন- কালবাউশ, মিরর কার্প ইত্যাদি।
  • পরজীবী (Parasite) মাছ:
    • সরাসরি পুষ্টি উপাদান গ্রহণের উদ্দেশ্যে এরা অন্য মাছ বা জলজ প্রাণীর দেহরস (মূলত রক্ত) গ্রহণ করে থাকে। যেমন- ল্যাম্প্রে স্যামন মাছের উপর পরজীবী।

 

প্রজননিক আচরণ (Reproductive Behaviour):
যে জৈবিক প্রক্রিয়ায় একটি পরিণত প্রাণী তার অনুরূপ সন্তান উৎপাদন করে তাকে প্রজনন বলে। প্রজননের সময় মাছ যে আচরণ প্রদর্শন করে তাই মাছের প্রজননিক আচরণ।
মাছের প্রজননিক আচরণে প্রধান দুটি ধাপ সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। যথা- পূর্বরাগ (Courtship) আচরণ এবং মৈথুন (Mating) আচরণ।

  • পূর্বরাগ (Courtship) আচরণ:
    • প্রজননের উদ্দেশ্যে একই প্রজাতির বিপরীত লিঙ্গের দুটি প্রাণী (যথা পুরুষ ও স্ত্রী) পরস্পরকে আকৃষ্ট করার জন্য যে আচরণ প্রদর্শন করে তাই পূর্বরাগ (Courtship) আচরণ। এক যুগলবন্দী আচরণও বলা হয়ে থাকে।
    • প্রজনন ঋতুতে মাছে বিশেষত পুরুষ মাছের দেহত্বক বিশেষভাবে বর্ণিল হতে দেখা যায় যা স্ত্রী মাছকে আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রাখে।
    • পুরুষ ব্যাঙ, কোকিল ইত্যাদি প্রাণীরা প্রজনন ঋতুতে সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ কণ্ঠে ডাকে যা মৈথুন ডাক (Mating call) বা প্রণয় ডাক (Love call) নামে পরিচিত।
    • অনেক প্রাণীতে দেহস্থ গন্ধ-গ্রন্থি (Scent gland) নিঃসৃত নিঃসরণ বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীকে আকৃষ্ট করতে ব্যবহৃত হয়।
    • সফল পূর্বরাগ আচরণের ফলাফল হিসেবে একক সময়ে একই প্রজাতির একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী প্রাণী নিজেদের মধ্যে প্রজননের উদ্দেশ্যে জোড়া গঠন করে।
  • মৈথুন (Mating) আচরণ:
    • প্রজননের উদ্দেশ্যে জোড়া গঠনের পর হতে পুরুষ মাছ কর্তৃক স্ত্রী মাছকে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করা, স্ত্রী মাছ কর্তৃক ডিম ছাড়া এবং পুরুষ মাছ কর্তৃক নিষেক ঘটানোর সময়ে প্রদর্শিত আচরণ এ ধাপের অন্তর্ভুক্ত।


পিতৃমাতৃযত্ন (Parental care):
প্রতিকূল পরিবেশ এবং খাদক ও ক্ষতিকর প্রাণী থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ডিম ও অপত্যের স্বনির্ভরতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত মা-বাবা কর্তৃক যে বিশেষ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয় তাই পিতৃমাতৃযত্ন।

মাছ সাধারণত নিম্নলিখিত ব্যবস্থাপনার মধ্য থেকে এক বা একাধিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণের মাধ্যমে পিতৃমাতৃযত্ন প্রদর্শন করে থাকে-

 

অভিপ্রয়াণ (Migration) আচরণ:
সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে প্রাণীর বসবাসের স্থল হতে অন্যস্থানে গমন এবং উদ্দেশ্য পূরণের পর আবার পূর্বের স্থানে ফিরে আসাকে অভিপ্রয়াণ বা Migration বলে। যেমন- ইলিশ মাছের বসবাসের স্থল হল সমুদ্র। প্রজননের সময় এরা নদীতে আসে এবং প্রজননের পর আবার অপত্যসহ সমুদ্রে ফিরে যায়।

উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে:

  • প্রজনন (Reproduction)
  • খাদ্য গ্রহণ (Feeding)
  • অনুকূল পরিবেশ (Suitable environment)

 

নিদ্রামগ্ন আচরণ (Sleeping Behaviour):
প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য শীতলরক্তবিশিষ্ট প্রাণীদের বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নিষ্ক্রিয় অবস্থায় (এ অবস্থায় খাদ্যগ্রহণসহ সকল কর্মতৎপরতা ও বিপাকীয় হার খুবই হ্রাস পায়) কাটাতে হয় যা নিদ্রামগ্ন আচরণ (Sleeping Behaviour) হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এসময় এরা খাবার গ্রহণ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়।

  • গ্রীষ্ম নিদ্রা (Aestivation)
    • উষ্ণ পরিবেশ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য শীতলরক্তবিশিষ্ট প্রাণীদের বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নিষ্ক্রিয় অবস্থায় (এ অবস্থায় খাদ্যগ্রহণসহ সকল কর্মতৎপরতা ও বিপাকীয় হার খুবই হ্রাস পায়) কাটাতে হয় যা Aestivation নামে পরিচিত।
    • চৈত্র-বৈশাখ মাসে আমাদের দেশের বিল বা হাওড়ের অনেক মাছ (যেমন- শিং, মাগুর, টাকি, সোল ইত্যাদি) দলবদ্ধভাবে মাটির নীচে কোকুন তথা গর্ত তৈরি করে সেই গর্তে নিষ্ক্রিয়ভাবে অবস্থান করে শুষ্ক অবস্থা অতিক্রম করে। পরের বছর বৃষ্টি বা ঢলের পানিতে বিল বা হাওড় প্লাবিত হলে তারা সেই গর্ত থেকে বের হয়ে আসে।
    • নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের মাছে এ আচরণ বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
  • শীতনিদ্রা (Hibernation)
    • শীতল পরিবেশ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য শীতলরক্তবিশিষ্ট প্রাণীদের বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নিষ্ক্রিয় অবস্থায় (এ অবস্থায় খাদ্যগ্রহণসহ সকল কর্মতৎপরতা ও বিপাকীয় হার খুবই হ্রাস পায়) কাটাতে হয় যা Hibernation নামে পরিচিত।
    • আমাদের দেশের মাছ শীতকালে খাবার গ্রহণ ও অন্যান্য কর্মতৎপরতা পরিমাণ কমিয়ে দেয় তবে তাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় অবস্থা বলা যায় না।
    • শীতপ্রধান দেশের প্রধানত বদ্ধ পানির মাছদের মধ্যে এ আচরণ বেশী দেখতে পাওয়া যায়। এসময় মাছেরা অক্সিজেনের অভাব থেকে রক্ষা পাওয়া, উদ্ভিদজাতীয় খাদ্যের অভাব থেকে রক্ষা পাওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে তলদেশের পানিতে (জলাশয়ের উপরের স্তরের পানি জমে বরফে পরিণত হলেও তলদেশের পানি বরফে পরিণত হয় না) একসাথে জড় হয়ে নিষ্ক্রিয়ভাবে অবস্থান করে।
    • নদীর মাছেরা তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত তুলনামূলক উষ্ণ জলের স্রোতের মুখে যেয়ে জড় হয়।
    • আমাদের দেশে উভচর (কুনোব্যাঙ), সরীসৃপ (সাপ) ইত্যাদি প্রাণীদের মধ্যে সুস্পষ্ট শীতনিদ্রা দেখতে পাওয়া যায়।


বিগ্রহ আচরণ (Fighting Behaviour):

  • মাছসহ বিভিন্ন প্রাণীতে মূলত প্রজননক্ষেত্র নির্বাচনে একে অপরের সাথে বিগ্রহে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। অনেক সময় খাদ্য সংগ্রহের মত প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডেও প্রাণীরা বিগ্রহে জড়িয়ে যেতে পারে। তবে আসলে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকল বিগ্রহের নেপথ্যে বলে বিবেচনা করা হয়।
  • সাধারণত পুরুষ মাছেরা প্রজনন ক্ষেত্র নির্ধারণ করে বাসা তৈরি করে বা না করে স্ত্রী মাছকে নানা ভাবে আকৃষ্ট করে থাকে। এসময় ঐ প্রজনন ক্ষেত্রে কোন পুরুষ মাছ প্রবেশ করলে তাকে তাড়িয়ে দিতে প্রথমে ভয় প্রদর্শন (Threat) করে বিগ্রহের সূচনা করে। তাকে কাজ না হলে সরাসরি বিগ্রহে জড়িয়ে যায়।
  • সাধারণত পুরুষেরাই বিগ্রহে অংশ নেয়। অনেক প্রাণীতে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়েই অংশ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে পুরুষেরা পুরুষের সাথে এবং স্ত্রীরা স্ত্রীর সাথে বিগ্রহে অংশ নেয়।

 

পলায়ন প্রবৃত্তি (Escape Behaviour):

  • শিকারি প্রাণী থেকে পরিত্রাণ পাবার উদ্দেশ্য মাছসহ অনেক প্রাণীতেই পলায়ন প্রবৃত্তি দেখতে পাওয়া যায়।
  • শিকারি (Predator) মাছের উপস্থিতি বুঝতে পারা মাত্রই শিকার (Pray) মাছ জলজ উদ্ভিদ বা কাঁদার মধ্যে লুকিয়ে পড়ে এবং শিকারি প্রাণী চলে না যাওয়া পর্যন্ত নিশ্চুপ অবস্থান করে।
  • কেমোফ্লেজ (Camouflage) তথা বসবাসস্থলের প্রকৃতির সাথে মিশে যায় এমন বর্ণ ধারণ করে নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা অনেক মাছেই দেখতে পাওয়া যায়।
  • অনুকৃতি (Mimicry) তথা দেহস্থ বিশেষায়িত দাগ, বিন্দু ইত্যাদির মাধ্যমে শক্রকে ফাঁকি দিয়ে নিজেকে আত্মরক্ষার করার প্রবণতা অনেক মাছে উপস্থিত। যেমন অনেক মাছের পুচ্ছ বা পৃষ্ঠদেশে চোখ আকৃতির দাগ দেখতে পাওয়া যায় যা শক্রকে বিভ্রান্ত করে।


Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply