ক্যাটাগরি: অঙ্গসংস্থানবিদ্যা | মাৎস্য জীববিজ্ঞান

জলজ স্তন্যপায়ীদের অভিযোজন: পর্ব-২

প্রিয় পাঠক, আমরা আগের পর্বে জেনেছি অস্থায়ী জলজ স্তন্যপায়ীদের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন এবং স্থায়ী স্তন্যপায়ীদের  নতুন বৈশিষ্ট্যের আবির্ভাব (Development of New Structure) এবং আদি বৈশিষ্ট্যের অবলুপ্তি (Loss of Original Structure) সম্পর্কে। এ পর্বে থাকলো স্থায়ী স্তন্যপায়ীদের মূল বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন (Modification of Original Structure) সম্পর্কে।

 

মূল বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন (Modification of Original Structure)

 

দেহের আকৃতি (Body Shape):

  • এদের বেশিভাগের দেহের বহিঃ আকৃতি ফুজিফর্ম (Fusiform) প্রকৃতির অর্থাৎ দেহের মধ্য ভাগের চেয়ে অগ্র ও পশ্চাৎ প্রান্ত ক্রমশ সরু হয়ে থাকে।
  • ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশেরই লম্বা আকৃতির মস্তক (Head) বর্তমান।
  • ঘাড় (Neck) সংক্ষিপ্ত এবং এ অঞ্চলের কশেরুকাগুলো ছোটা, চ্যাপ্টা ও কমবেশি একত্রে সংযুক্ত।
  • দেহাকৃতির উল্লেখিত পরিবর্তন এদেরকে পানিতে সহজে ও দ্রুত চলতে সহায়তা করে থাকে।

 

ফিনব্যাক তিমি (The Finback Whale)

ফিনব্যাক তিমি (The Finback Whale) ১

দেহের আকার ও ওজন (Body Size and Weight):

  • অনেক জলজ স্তন্যপায়ীদের দেহের আকার তুলনামূলক অনেক বেশী বৃহৎ আকৃতির হয়ে থাকে। যেমন- হোয়েল-বোন তিমি (Whale-bone whale) সর্বোচ্চ ৩৫ মিটার লম্বা এবং ১৫০ টন ওজন বিশিষ্ট হতে পারে।
  • বৃহৎ আকার এবং অত্যধিক ওজন স্থলচর প্রাণীর জন্য একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও জলচর প্রাণীর জন্য তা বাড়তি সুবিধা প্রদান করে। যেমন- এর ফলে তার হারানোর পরিমাণ তুলনামূলক কম হয়ে থাকে এবং পানির মধ্যে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।

 

অগ্রপদের ফ্লিপারে রূপান্তর (Modification of forelimbs in flippers):

  • অগ্রপদ আদি প্রকৃতির (Rudimentary) এবং খর্বাকার।
  • অগ্রপদের প্রোক্সিমাল (Proximal) অংশ দেহ গহ্বরে (Coelom) অবস্থান করে।
  • ডিসটাল (Distal) অংশ ত্বক দ্বারা আবৃত হয়ে প্রশস্ত ও চ্যাপ্টা বৈঠা বা দাঁড়ের আকৃতির (Paddle-like) ফ্লিপার (Flipper) তথা চ্যাপ্টা পদ গঠন করে।
  • চ্যাপ্টা ও প্রশস্ত ফ্লিপার (Flipper) জলীয় পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষা এবং সাঁতারে সহায়তা করে থাকে।

 


জলজ স্তন্যপায়ীদের ফ্লিপার (Flippers)

 

অতিরিক্ত আঙ্গুল (Digit) ও ফ্যালেঞ্জেস (Phalanges) অস্থির সংখ্যা বৃদ্ধি:

  • ফ্লিপারে (Flipper) অতিরিক্ত আঙ্গুল দেখতে পাওয়া যায়। এ বিষয়কে জীববিজ্ঞানে হাইপারডেকটাইলি (Hyperdactyly) হিসেবে অভিহিত করা হয়।
  • ফ্লিপারে (Flipper) অতিরিক্ত ফ্যালেঞ্জেস (Phalanges) অস্থি উপস্থিত। এ বিষয়টি জীববিজ্ঞানে হাইপারফ্যালেঞ্জি (Hyperphalangy) হিসেবে পরিচিত।
  • এর ফলে চ্যাপ্টা ফ্লিপারের উভয় তলের আয়তন বৃদ্ধি পায় যা এদের জলীয় পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষা এবং সাঁতারে বাড়তি সহায়তা প্রদান করে থাকে।

 

কপাটিকা (Valve) বিশিষ্ট বহিঃনাসারন্ধ্রের (Nostril) সুবিধাজনক অবস্থান:

  • জলজ স্তন্যপায়ীদের বহিঃনাসারন্ধ্রে কপাটিকা দেখতে পাওয়া যায় যার ফলে পানির গভীরে অবস্থান করার সময় ভেতরে পানি প্রবেশ করতে পারে না। বহিঃনাসারন্ধ্র ব্লো-হোল (Blow-hole) নামে অধিক পরিচিত।
  • মস্তকের উপরিতলের (Dorsal side) সবচেয়ে উঁচুতে একটিমাত্র মধ্যগ (Median) বহিঃনাসারন্ধ্র অবস্থান করে। এর ফলে সম্পূর্ণ মাথা পানির উপরে না উঠিয়েই এরা প্রয়োজনীয় বাতাস তথা অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।
বটল-নোজ ডলফিন (bottlenose-dolphin)

বটল-নোজ ডলফিন (bottlenose-dolphin) ২

 

সংকোচনশীল পেশী (Compressor muscles) সমৃদ্ধ স্তন্য নালিকা (Mammary ducts):

  • স্তন্যদানকালে মায়েদের স্তন্য নালিকা প্রশস্ত হয়ে দুগ্ধগ্রন্থি নিঃসৃত দুধ সংরক্ষণের উপযোগী ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
  • প্রশস্ত স্তন্য নালিকা সংলগ্ন উপস্থিত সংকোচনশীল পেশীর (Compressor muscles) ক্রিয়ায় সংরক্ষিত দুধ সরাসরি দুগ্ধপানরত নবজাতকের মুখে প্রবেশ করে।
  • এই প্রক্রিয়াটি পানির নিচে অপত্যকে দুধ পান করতে বাড়তি সুবিধা প্রদান করে। এছাড়াও এদের দুধে ৪০-৫০ শতাংশ চর্বি (Fat) থাকে যেখানে মানুষের মত স্থলচর প্রাণীর দুধে মাত্র ৩.৩% চর্বি (Fat) বর্তমান। ফলে এদের অপত্যরা দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পরিণত হয়ে থাকে।

 


সাদাতিমি (The beluga or white whale, Delphinapterus leucas) অপত্যের দুধ পান

 

তির্যকভাবে (Oblique) অবস্থিত ডায়াফ্রাম (diaphragm):

  • জলজ স্তন্যপায়ীদের মধ্যচ্ছদা বা ডায়াফ্রাম তির্যকভাবে অবস্থিত।
  • এদের ডায়াফ্রামে শক্তিশালী মাংসপেশি দেখতে পাওয়া যায়।
  • উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতির ফলশ্রুতিতে এদের বক্ষ অঞ্চল প্রশস্ত হয়ে থাকে যাতে করে ফুসফুসকে অধিক পরিমাণে বাতাস ধারণ করতে পারে। এ সুবিধাটি এদেরকে গভীর সমুদ্রে গমনাগমনে সহায়তা করে থাকে।

 

বৃহৎ আকৃতির ফুসফুসের উপস্থিতি:

  • জলজ স্তন্যপায়ীদের ফুসফুস আকারে বৃহৎ হয়ে থাকে। তবে মানুষের দেহায়তন ও ফুসফুসের আয়তনের অনুপাতের চেয়ে জলচর স্তন্যপায়ীদের দেহায়তন ও ফুসফুসের আয়তনের অনুপাত কম হয়ে থাকে।
  • ফুসফুস একক লোব (Lobe) বিশিষ্ট এবং অত্যন্ত সংকোচন-প্রসারণশীল গুণ (Elastic) সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রতিবারে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বাতাস পরিবর্তন করতে সক্ষম। ফলে এরা সমুদ্রের গভীরে গমনের পূর্বে অধিকমাত্রায় নতুন বাতাস গ্রহণে সক্ষম হয়ে থাকে।
  • গভীর সাগরে থাকার সময় যখন এদের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ থাকে তখন এদের পেশী অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতেও কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম। ফলে এরা অধিক কার্বন-ডাই-অক্সাইড ঘনত্বেও টিকে থাকতে সক্ষম।
  • এছাড়াও সাঁতারের সময় আনুভূমিক তল বরাবর দেহের বিভিন্ন বহিঃঅঙ্গের অবস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় ফুসফুস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

অন্তঃকঙ্কাল (Endoskeleton):

  • এদের হাড়গুলো হালকা এবং স্পঞ্জের বৈশিষ্ট্য বিশিষ্ট (Spongy) অর্থাৎ ছিদ্রময়, স্থিতিস্থাপক এবং বাতাস বা তরল ধারণে সক্ষম। তিমির স্পঞ্জের মত হাড় তেলে পূর্ণ থাকে।
  • এদের সংক্ষিপ্ত ও প্রশস্ত মস্তিষ্ক ধারণ করার জন্য এদের করোটিও (Cranium or Skull) সংক্ষিপ্ত ও প্রশস্ত হয়েছে।
  • এদের ঘাড়ের কশেরুকাগুলো ক্ষুদ্রাকার, চ্যাপ্টা এবং একত্রিত হয়ে ঘাড়কে সংক্ষিপ্ত করেছে।
  • করোটির (Skull) সম্মুখের অস্থি প্রলম্বিত হয়ে লম্বা তুণ্ড গঠন করেছে।
  • উভয় শ্রোণী অস্থির (Pelvis) মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত স্যাক্রাম (Sacrum ) নামক ত্রিকোণাকৃতির অস্থি প্রায় বিলুপ্তি পেয়েছে।
  • পাঁজরের হাড়গুলো (Ribs) পৃষ্ঠ দিকে এমনভাবে বাঁক নেয় যে বক্ষ গহ্বরের আয়তন বৃদ্ধি পায়।

 

দাঁত (Teeth):

  • অনেকের দাঁত থাকে না। যেমন হোয়েল-বোন তিমি (Whale-bone whale)।
  • যাদের দাঁত উপস্থিত তাদের দাঁত স্থায়ী প্রকৃতির (Monophyodont) অর্থাৎ এদের অস্থায়ী দাঁত দেখতে পাওয়া যায় না।
  • দাঁতগুলো একই ধরণের (Homodont) এবং অসংখ্য (প্রায় ২৫০ টি)।

 

বিশেষায়িত রক্ত সংবহনতন্ত্র (Circulatory System):

  • জলজ স্তন্যপায়ীদের রক্ত সংবহনতন্ত্র স্থলচর প্রাণীদের রক্ত সংবহনতন্ত্রের চেয়ে জটিল প্রকৃতির।
  • অনেকের রক্তনালী সরু শাখায় বিভক্ত হয়ে জালের ন্যায় গঠন তৈরি করে যাকে রেটিয়া মিরাবিলিয়া (Retia mirabilia) বলে।
  • রক্তে লোহিত রক্ত কণিকার (Red Blood Corpuscles) সংখ্যা অনেক বেশী।

 

অন্যান্য অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • এদের যকৃতের (Liver) গঠন সরল প্রকৃতির এবং দুই লোব (Lobe) বিশিষ্ট।
  • এদের বিশেষায়িত বৃক্ক (Kidney) যে মূত্র তৈরি করে তাতে সামুদ্রিক পানির লবণের চেয়ে অধিকমাত্রায় লবণ থাকে।
  • সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীরা স্বাদুপানি পান করে না বললেই চলে। এরা প্রয়োজনীয় পানির বেশিরভাগই সংগ্রহ করে তাদের খাদ্যের অভ্যন্তরস্থ তরল থেকে।
  • এরা পানির নীচে যোগাযোগ রক্ষা করে শব্দের মাধ্যমে। অনেকেই তাদের শিকারের অবস্থান জানার জন্য শব্দ (Echolocation) ব্যবহার করে।
  • এদের স্পর্শ ইন্দ্রিয় অনুভূতি (Touch Sense) উন্নত প্রকৃতির।
  • অনেকের উন্নতভাবে বিকশিত তুণ্ড-গোঁফ (Facial whiskers) বর্তমান।

 

চিত্র-সূত্র:

 

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply