ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | মাৎস্য চাষ | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা | স্বাদুপানি

মিঠা পানির গলদা চিংড়ি, কাঁচা সোনার খনি

মিঠাপানিতে চাষকৃত গলদা চিংড়ি

মিঠাপানিতে চাষকৃত গলদা চিংড়ি

প্রাক কথন:
মিঠাপানির গলদা চিংড়ি চাষ করে নোয়াখালীর জলাবদ্ধ জলাভূমিগুলো হয়ে উঠতে যাচ্ছে এক একটি কাঁচা সোনার খনি। ইতিমধ্যেই বৃহত্তর নোয়াখালীর পুকুর ও বদ্ধ জলাশয়গুলোতে গলদা চিংড়ি চাষ করে অভাবনীয় সফলতা পাওয়া গেছে। আশার সঞ্চার হয়েছে গরিব অসহায় চাষিদের। নোয়াখালীর প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর একর কৃষি জমিতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে কোন ফসল হয় না। শুকনো বোরো মৌসুমে মাত্র একটি ফসল পাওয়া যায়। এর জন্য কৃষকরা দীর্ঘদিন চরম কষ্ট ও বেকারত্বে ভুগছিল। এই জমি গুলো আবার হাওর অঞ্চলের মত বিশাল এলাকা জুড়েও নয়। কৃষকদের টুকরো টুকরো জমিগুলোর চতুর্দিকে উঁচু আইল, বাঁধ বা গ্রামীণ রাস্তা হওয়ার ফলে পানি বদ্ধ হয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েকটি জমি মিলে ছোট খাট বিলের মত হয়ে গেছে, তার চতুর্দিকেই গ্রাম। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘হাতর’ বা ‘ডগি’। একসময় এগুলোতে প্রচুর স্থানীয় জাতের প্রচুর ছোট মাছ প্রাকৃতিক ভাবেই পাওয়া যেতো। রাসায়নিক কৃষির ফলে এগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ডগি গুলোতে আগের মত আর দেশীয় ছোট মাছ পাওয়া যায়না। এই বদ্ধ ‘ডগি’ বা জলাশয়গুলোর চতুর্দিকের আইল, রাস্তা বা বাঁধ উঁচু ও মেরামত করে যে ক’ মাস পানি থাকে সে সময় গলদা চিংড়ি চাষ করার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এতে কোন প্রকার রাসায়নিক সার কিংবা কীটনাশক ব্যবহার করা হয়না। সম্পূর্ণ পরিবেশ সম্মত ভাবে এর চাষ হয়। গলদা চিংড়ি মিঠা পানিতে চাষ হয়। এখন চিংড়ি রফতানি থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার ফলে যে সময়গুলোতে জমিতে কোন চাষ হতো না সেই সময়টুকুতেই চিংড়ি চাষ করে রফতানি যোগ্য আকারে উৎপাদন করা যায়। এতে গরিব কৃষকরা কাজ ও আয়ের ক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছে। এই জমিগুলোতে সীমিত আকারে অনেকে রুই জাতীয় মাছ চাষ করে আসছিল। কিন্তু ওগুলোর স্থানীয় বাজার মূল্য অনেক কম। অথচ এই জমিতে একই সময়ে সমান পুঁজি ও শ্রম বিনিয়োগ করে চিংড়ি থেকে প্রচুর লাভ পাওয়া যায়। যেখানে রুই কাতলা ও এ জতীয় অন্যান্য মাছের বর্তমান বাজার মূল্য মন প্রতি দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। সেখানে চিংড়ির বাজার মূল্য পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা। তাই জলাবদ্ধতাকে যে কৃষকরা এতদিন অভিশাপ বলে আখ্যায়িত করে আসছিল তারাই আবার বলছে জলাবদ্ধতা আমাদের জন্য এখন আশীর্বাদ। এই উৎপাদনে উৎসাহ যুগিয়েছে, ‘গ্রেটার নোয়াখালী একোয়াকালচার এক্সটেনশন প্রজেক্ট’ সংক্ষেপে জি.এন.এ.ই.পি। বর্তমানে এর নাম হয়েছে আর.এফ.এল.ডি.সি. বা রিজিওনাল ফিসারিজ এন্ড লাইভ-স্টক ডেভেলপমেন্ট কম্পোনেন্ট। নোয়াখালী মৎস্য অধিদপ্তর, ডেনিশ সরকারের উন্নয়ন সংস্থা ডানিডার আর্থিক আনুকূল্যে মিঠা পানির চিংড়ি চাষের এই স্বপ্নময় প্রকল্পের এক ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। নোয়াখালীর সোনাপুরে স্থাপন করা হয়েছে উপমহাদেশের বৃহত্তর গলদা চিংড়ি হ্যাচারি। ছোট আকারের আরও দুটি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে ব্যক্তি উদ্যোগে। উক্ত প্রকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার রেশাদ আলম জানালেন এই তিনটি প্রকল্প থেকে বছরে দুই কোটি চিংড়ি পোনা উৎপাদন হচ্ছে। তিনি জানান তৈরি পোশাকের পরেই চিংড়ি আমাদের অন্যতম রফতানি খাত। বাগদা চিংড়ির থেকে গলদা চিংড়ি চাষ খরচ অনেক কম এবং এ চিংড়ি চাষ অনেক বেশী পরিবেশসম্মত। এ চাষে বাগদার মত কোন লবণ পানির ব্যবহার হয়না এবং বনায়নেরও কোন ক্ষতি হয়না।

মধ্য চরবাগ্গার হনুফা বেগম:
হনুফা বেগমের স্বামী সৈয়দ আহাম্মদ ২০০০ সালে টিউমার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। চার ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তিনি খুব অসহায় হয়ে পড়েন। গত শতকের নব্বই সনে সরকার থেকে তারা দেড় একর কৃষি জমি বন্দোবস্ত পায়। সেই জমিতে বিশ ডেসিমেল (এক ডেসিমেল সমান প্রায় এক শতাংশ) আয়তনের একটি পুকুর কেটে ঘরের ভিটা ও কিছু জায়গা উঁচু করেছে। উঁচু যায়গায় নারকেল, আম, সুপারি সহ নানান গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর হনুফা বেগম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। স্বামীর চিকিৎসার খরচ ও সংসারের খরচ মিটানোর জন্য ভিটে ছাড়া বাকী জমি স্থানীয় এক মহাজনের কাছে নয় হাজার টাকায় বন্ধক রাখেন। এরপর হনুফা বেগম ৪/৫ বছর বহু চেষ্টা করেও জমিটি বন্ধক থেকে আর ছাড়াতে পারেনি। পুরো জমিটি যখন হাতছাড়া হয়ে সার উপক্রম হল, তখন তিনি যোগাযোগ করলেন উল্লেখিত প্রকল্প সমন্বয়কের সঙ্গে। তার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি তার ছোট পুকুরে পরিকল্পিত ভাবে তিন হাজারটি গলদা চিংড়ির পোনা ছাড়েন। প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ানো ও যত্নআত্তির পর ৫ মাসে তিনি তা প্রকল্পে ছাড়ার উপযোগী করে বিক্রির জন্য ধরে নেন। ধরার সময় গুণে দেখেন ২,৪৮২ টি মাছ টিকে গেছে। প্রতিটি চিংড়ি পাঁচ টাকায় তিনি বিক্রি করেন। সমস্ত খরচ পাতি বাদে তার লাভ হয় ১২ হাজার টাকা। এই টাকা থেকে নয় হাজার টাকা দিয়ে তিনি তার বন্ধকী জমি ছাড়িয়ে নেন। বাকী টাকায় একটি ছাগল হাঁস ও মুরগী কিনেন। এ বছর তিনি আবার তৈরি হচ্ছেন গলদা চিংড়ি চাষ করার জন্য। লক্ষ্মীপুরের মতির হাট থেকে নদী ভাঙ্গনের ফলে কপর্দকশূন্য হয়ে হনুফারা এক টুকরো জমির আশায় এ অঞ্চলে ছুটে আসে। তার পৈত্রিক ও স্বামীর জমি জমা ঘর বাড়ি মেঘনায় গ্রাস করে ফেলেছে। সেখানে আর যাওয়ার উপায় নেই। বড় ছেলে জাফর উল্যাহ চট্টগ্রামে রিক্সা চালায়। বৌ-সংসার নিয়ে সেখানেই থাকে। হনুফার এক মাত্র মেয়ে তসলিমা বেগম ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। হনুফা বেগমের আশা মেয়েকে অনেক দূর পড়াবে। ভাল ঘর দেখে বিয়ে দেবে। নিজের উপরও তার এখন অনেক আস্থা। পুকুরে অন্যান্য মাছের সাথে গলদা চিংড়ি চাষে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে দেখে এখন এলাকায় অনেকেই উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। হনুফা বলেন, ‘ইছা মাছের চাষ কেমনে কইত্তে অইবো, অন্ আঁরতুন বেকে জাইনতে চায়’। অর্থাৎ ‘ চিংড়ি চাষ কেমন করে করতে হবে, এখন আমার থেকে সবাই জানতে চায়’। এলাকায় হনুফা এখন মধ্যমণি। নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলে পাইলট প্রোগ্রামের অধীনে প্রায় ৫০০ টি বন্দোবস্ত প্রাপ্ত ভূমিহীন পরিবারকে জি.এন.এ.ইপির আওতায় কারিগরি সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। এই ভূমিহীন পরিবারগুলো সরকারী খাসজমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ায় জমির মালিক হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে ৪০টি পুকুর। এই চাষের জন্য প্রথমে কেউ উৎসাহী হয় নি। কারণ কৃষকরা মনে করতো গলদা চিংড়ি বাগদা চিংড়ির মত পরিবেশ বান্ধব হবে না। কিন্তু গলদা চিংড়ি মিঠা পানির মাছ হওয়াতে সে দূষণের সম্ভাবনা একেবারেই নেই। অধিকন্তু গলদা চিংড়ি স্বাভাবিক সব মাছের সঙ্গে সমন্বিত ভাবে চাষ করা অনেক লাভজনক। নোয়াখালীর চরাঞ্চলের অনেক দরিদ্র কৃষক বর্তমানে সমন্বিত চিংড়ি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

জলাবদ্ধতার আশীর্বাদ:
মৎস্য চাষের এই প্রকল্প শুধুমাত্র নোয়াখালীর চরাঞ্চল কিংবা উপকূলেই নয়। বৃহত্তর নোয়াখালীর জলাবদ্ধ এলাকায় এই কর্মসূচীর ব্যাপক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, চাটখিল ও লক্ষ্মীপুর জেলার কয়টি এলাকা বছরে ছয় সাত মাস জলাবদ্ধতায় কোন ফসল উৎপন্ন হয় না। অথচ এই সব জলাভূমিকে সামান্য সংস্কার করে সমন্বিত মৎস্য চাষ করলে কৃষকরা অধিক লাভবান হবেন বলে মৎস্য সম্প্রসারণ বিভাগ জানিয়েছেন। নোয়াখালীর ব্যাপক এলাকার জলাবদ্ধ জমিতে মিঠাপানির চিংড়ি চাষ সহ সমন্বিত মৎস্য চাষ করলে বিপুল পরিমাণ মাছের উৎপাদন হবে। এ থেকে দেশের পানি সম্পদকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। পরীক্ষামূলক ভাবে বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়নের ওলি আহম্মদ মানিক তার ৫ একর জলাবদ্ধ জমিতে সমন্বিত চিংড়ি চাষ করে বিপুল পরিমাণে লাভবান হয়েছেন। তিনি জানান, ৫ একর জমিতে তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ করে রুই কাতলা জাতীয় মাছের সাথে চিংড়ি চাষ করেন বর্ষা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই। মাত্র ৭ মাসে তিনি সে জমিতে দেড় লক্ষ টাকা আয় করেন শুধু মাত্র গলদা চিংড়ি থেকে। এলাকার অন্যান্য চাষিরা বলেন দীর্ঘ দিন এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তরের গৃহীত প্রকল্প এখন সে অভিশাপ আশীর্বাদে রূপ নিয়েছে।

ম্যাপে বৃহত্তর নোয়াখালী এলাকা:

View Larger Map

পুনশ্চ: লেখাটি এর আগে http://wikieducator.org তে প্রকাশিত হয়েছে।

Visitors' Opinion

লেখক

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, পুরাতন হাস্পাতাল সড়ক, মাইজদি কোর্ট, নোয়াখালী-৩৮০০ । যোগাযোগ: ফোন: ০৩২১৬১৪৭০ (বাসা), সেল: ০১৭১১২২৩৩৯৯, ইমেইল: mhfoez@gmail.com। বিস্তারিত

Leave a Reply