ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ | স্বাদুপানি | হ্যাচারি

মাছচাষের পুকুরের শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ নিয়ন্ত্রণ: পর্ব-২

প্রিয় পাঠক, মাছচাষের পুকুরের শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ নিয়ন্ত্রণ: পর্ব-১ এ আঁতুড় ও অন্যান্য পুকুরের শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছের তালিকা এবং তা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম পদ্ধতি পানি অপসারণ সম্পর্কে লিখেছিলাম। শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হল এ পর্বে।

 

বারবার জাল টানা:

পদ্ধতি:

  • জলাশয়ের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘন ফাঁসের বেড় জাল পুকুরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বারবার টেনে অধিকাংশ মাছ ধরে ফেলা যায় যদিও সব মাছ ধরার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

সাবধানতা:

  • জাল টানার সময় লক্ষ রাখতে হবে যাতে করে জালের উভয় প্রান্ত দিয়ে মাছ বের হয়ে যেতে না পারে।
  • জাল যাতে জলাশয়ের তলদেশের কাঁদা পর্যন্ত পৌঁছে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। প্রয়োজনে পর্যাপ্ত ডুবক (Sinks) ব্যবহার করতে হবে এবং জাল টানার সময় এক বা একাধিক ব্যক্তিকে জালের নীচ প্রান্ত যে কাঁদা পর্যন্ত পৌঁছেছে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
  • জাল যাতে ঠিকমত পানির উপরিতল পর্যন্ত ভেসে থাকে সে জন্য পর্যাপ্ত ভাসক (Floats) ব্যবহার করতে হবে এবং জাল টানার সময় বিষয়টি নজরে রাখতে হবে।

সুবিধা ও অসুবিধা:

  • পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়।
  • এই পদ্ধতিতে পুকুরের তলদেশে বসবাসকারী শিকারি মাছ (যেমন- শিং, মাগুর, টাকি, সোল, চ্যাং, কই, বোয়াল, গুচি, বাইম ইত্যাদি) ছাড়া অন্যান্য শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ এই পদ্ধতিতে দূর করা সম্ভব। অর্থাৎ সকল মাছ এই পদ্ধতিতে দূর করা যায় না। তাই মজুদ পুকুরের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হলেও আঁতুড় পুকুরের জন্য কেবলমাত্র এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না।
  • এটি শিকারি মাছ নির্মূলে সক্ষম না হলেও সংখ্যা কমানোর মাধ্যমে শিকারি মাছ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
  • অন্যান্য পদ্ধতির সহযোগী পদ্ধতি হিসেবে বেশ কার্যকর।

 

বড়শি/টোপ/ফাঁদ ব্যবহার:

পদ্ধতি:

  • প্রথমেই শিকারি মাছ পছন্দ করে এমন টোপ বাজার/প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
  • সংগৃহীত টোপ ব্যবহার করে একসাথে বেশকিছু বড়শি পুকুরে ফেলে বড় আকারের শিকারি মাছ ধরা সম্ভব হয়।
  • বিভিন্ন ধরণের মুক্ত বা বদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করে শিকারি মাছ ধরা যায়। এসব ফাঁদে টোপ ব্যবহার করলে আরও ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।

সাবধানতা:

  • ভাল মানের টোপ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
  • একাধিক বড়শি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা বড়শির সূতা অন্যটার সাথে প্যাঁচ লেগে জট পাকিয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

সুবিধা ও অসুবিধা:

  • পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়।
  • সময় ও শ্রম সাপেক্ষ পদ্ধতি।
  • মাছ সম্পূর্ণ রূপে দূর করা সম্ভব হয় না কেবলমাত্র সংখ্যা কমানোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
  • একক পদ্ধতি হিসেবে যথেষ্ট কার্যকর না হলেও অন্যান্য পদ্ধতির সাথে যৌথভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • আঁতুড় পুকুরের জন্য এটি এককভাবে কার্যকর না হলেও মজুদ পুকুরের জন্য বেশ কাজে আসে।

 

রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ:

রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ দূর করার পদ্ধতিটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলেও সময়, শ্রম ও অর্থ কম লাগে, যে কোন আকার ও আকৃতির পুকুরেই প্রয়োগ করা সম্ভব হয় এবং চাক্ষুষ ফল পাওয়া যায় বিধায় এটি আমাদের দেশের মৎস্য চাষিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে এক বা একাধিক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে যে রাসায়নিক পদার্থই ব্যবহার করা হোক না কেন তা প্রয়োগের আগে সেই রাসায়নিক পদার্থের গুণাবলী সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। যথা-

রাসায়নিক পদার্থে গুণাবলী:

  • স্বল্পমাত্রায় অধিক কার্যকর হতে হবে।
  • বিষ প্রয়োগ করার জলাশয়ের মাছ মানুষের খাবারের উপযোগী হতে হবে।
  • দ্রুততম সময়ের মধ্যে পানিতে সম্পূর্ণভাবে দ্রবণীয় হবে এবং বিষক্রিয়ার সময় কাল সংক্ষিপ্ত হতে হবে।
  • পুকুরে বসবাসকারী অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের উপর কম ক্ষতিকর হতে হবে।
  • বিষ প্রয়োগকৃত পুকুরের পানি যাতে গবাদি পশু পাখি ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে না।
  • প্রয়োগ পদ্ধতি সহজ হতে হবে।
  • দামে সস্তা হতে হবে।
  • সহজ প্রাপ্য হতে হবে।

 

পদ্ধতি:

  • বেশিরভাগ রাসায়নিক পদার্থ পানিতে গুলিয়ে সারা পুকুরে সমভাবে ছিটিয়ে বা স্প্রে করে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। নিচে বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক পদার্থের নাম, প্রয়োগ মাত্রা, পদ্ধতি ইত্যাদি বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা হল। এসব পদ্ধতির যে কোন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে পুকুরের ক্ষতিকর শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ নির্মূল করা সম্ভব। আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রচলিত রাসায়নিক পদার্থ হচ্ছে ফসটক্সিন ট্যাবলেট এবং রোটেনন পাউডার।
  • রাসায়নিক পদার্থ: ফসটক্সিন ট্যাবলেট বা গ্যাস টেবলেট
    কার্যকর উপাদান: এলুমিনিয়াম ফসফাইড (Aluminium phophide) ন্যুনতম ৫৭%
    প্রয়োগের পরিমাণ (Dose): ১-২ টি ট্যাবলেট/শতাংশ/ফুট পানি
    প্রয়োগ পদ্ধতি ও কার্যকারিতার সময়কাল: পানিতে সরাসরি ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হয়।

 

  • বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তর (২০০৪) এর পরামর্শ অনুসারে নিম্নোক্ত টেবিলে উপস্থাপিত রাসায়নিক উপাদানের যে কোন একটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপাদান মাত্রা/শতাংশ পানির গভীরতা প্রয়োগ পদ্ধতি অবশিষ্ট বিষক্রিয়ার মেয়াদকাল
রোটেনন ১৮-২৫ গ্রাম ৩০ সেমি ৩ ভাগের বিভক্ত করে ২ ভাগ পানিতে গুলে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে ও ১ ভাগ কাঁই করে ছোট ছোট বল তৈরি করে ছিটিয়ে দিতে হবে। ৭ দিন
তামাকের গুড়া ০.৮-১.৫ গ্রাম ৩০ সেমি পাত্রে ১২-১৫ ঘণ্টা ভিজানোর পর সূর্যালোকিত দিনে ছিটিয়ে দিতে হবে। ৭-১০ দিন
চা বীজের খৈল ১ কেজি ৩০ সেমি বালতিতে ৩-৪ গুন পানির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে সূর্যালোকিত দিনে পানিতে ছিটাতে হবে। ৩-৪ দিন

 

  • সিদ্দিকী ও চৌধুরীর (১৯৯৬) অনুসারে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রয়োজনীয় মাছ ও ক্ষতিকর জলজ প্রাণী নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নোক্ত টেবিলে উপস্থাপিত রাসায়নিক উপাদান (একক সময়ে যে কোন একটি) ব্যবহার করা যেতে পারে।
রাসায়নিক দ্রব্য মাত্রা (গ্রাম/শতক/ফুট গভীরতা) অবশিষ্ট বিষক্রিয়ার মেয়াদকাল (দিন)
রোটেনন ৩৫-৫০ ৭-১০
চা-বীজের খৈল ৩০০-৩৫০ ৫-১০
মহুয়ার খৈল ৩০০০ ১৪-১৫
তেঁতুল বীজের গুড়া ১২৫-১৭৫ ২০-২৫
ব্লিচিং পাউডার ৩৭০ ৭-৮
শুকনো এমোনিয়া ৩০০ ২৮-৪২

 

  • Kumar (1992) অনুসারে নিম্নলিখিত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ দূর করা সম্ভব-
উপাদান মাত্রা (কেজি/হেক্টর/মিটার গভীরতা)
ব্লিচিং পাউডার ৩৫০-৫০০
এনহাইড্রোস এমোনিয়া ২০-৩০
মহুয়ার (Madhuca longifolia) খৈল ২৫০০
জয়পাল (Croton tiqlium) বীজের গুঁড়া ৩০-৫০
বিষলতি (Millettia pachycarpa) এর মূলের গুঁড়া ৪০-৫০
হিজল (Barrinqtonia acutanqula) বীজের গুঁড়া ১৫০
তেঁতুল (Tamarindus indica) বীজের চূর্ণ ১৭৫০-২০০০
চায়ের (Camellia sinensis) খৈল* ৭৫০

* চায়ের খৈল ব্যবহার করলে সাথে ১৫০ কেজি/হেক্টর হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে।


সাবধানতা:

  • যে রাসায়নিক পদার্থই ব্যবহার করা হোক না কেন তা প্রয়োগের সময় বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। যথা-
  • বৃষ্টির সময় বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ না করা।
  • বাতাস প্রবাহের গতিবেগ বেশী হলে বিষ প্রয়োগ না করাই ভাল (তবে যদি একান্ত প্রয়োজনে করতেই হয় তবে সর্বদা বাতাসের বিপরীতে অবস্থান করে বাতাসের গতিবেগের দিকে বিষ স্প্রে বা ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে যেন প্রয়োগকারীর চোখে, মুখে বা শরীরে বিষ এসে না পড়ে)।
  • রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগকারী ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব কাপড় দিয়ে হাত-পা-মুখমণ্ডল ঢেকে বিষ প্রয়োগ করতে হবে।
  • রাসায়নিক পদার্থ পানিতে ভালভাবে দ্রবীভূত করে সম্পূর্ণ জলাশয়ের পানির উপরিতলে সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

সুবিধা ও অসুবিধা:

  • বিষ পুকুরের জলজ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন কি প্রয়োগকৃত পুকুরের পানি মানুষসহ গৃহপালিত প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর।
  • অনেক সময় বিষ প্রয়োগ করে ধরা মাছ মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে।
  • অনেক রাসায়নিক পদার্থের বিষক্রিয়ার সময়কাল বেশী হওয়ায় পোনা ছাড়ার জন্য বেশ কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হয়।
  • তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল।
  • কম সময় ও শ্রম শক্তির প্রয়োজন হয়।
  • তাৎক্ষণিক ফলাফল পাওয়া যায়।
  • নিশ্চিতভাবে সকল শিকারি ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ অপসারণ করা সম্ভব হয়।

 

আমাদের অনেক সময় পিপিএম ডোজকে কেজিতে পরিবর্তন করে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এখানে আয়তাকার ও গোলাকার পুকুরে ক্ষেত্রে পিপিএম ডোজকে কেজিতে পরিবর্তন করার দুটি সূত্র দেয়া হল।

.

আয়তাকার/বর্গাকার জলাশয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ  (কেজি/জলাশয়) =

জলাশয়ের দৈর্ঘ্য (মিটার) x প্রস্থ (মিটার) x গড় গভীরতা (মিটার) x ডোজ (পিপিএম) / ১০০০

.

গোলাকার জলাশয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ (কেজি/জলাশয়) =

৩.১৪৩ x জলাশয়ের ব্যাসার্ধের (মিটার) বর্গ x গড় গভীরতা (মিটার) x ডোজ (পিপিএম) / ১০০০

 

তথ্যসূত্র:

  • মৎস্য অধিদপ্তর. ২০০৪. কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র চাষ, সমন্বিত মৎস্য কার্যক্রমের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন প্রকল্প (২য় পর্যায়), মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা, পৃ. ১-২৪।
  • সিদ্দিকী কা এবং চৌধুরী স.না. (সম্পা.). ১৯৯৬. মৎস্য পুকুরে মাছ চাষ ম্যানুয়াল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব লোকাল গভর্নমেন্ট, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃ. ২৩৭-২৫৩।
  • Kumar, D. 1992. Fish culture in undrainable ponds. A manual for extension. FAO Fisheries Technical Paper No. 325. Rome, FAO, 239 p.

 

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply