ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | পরিবেশ | মাৎস্য জীববৈচিত্র্য | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা

সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি: নতুন এক বৈশ্বিক সমস্যা

সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধির রাসায়নিক বিক্রিয়া (সংক্ষেপিত)

সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধির রাসায়নিক বিক্রিয়া (সংক্ষেপিত)

সারা পৃথিবীব্যাপী বা পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলব্যাপী কোন সমস্যা বিস্তৃত হলে তাঁকে সাধারণত বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বর্তমানে অতি পরিচিত একটি পরিবেশগত বৈশ্বিক সমস্যা হল বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও এর ফল স্বরূপ আমাদের জলবায়ুর পরিবর্তন। বর্তমানে বেশ আলোচিত হতে থাকা এধরনেরই আরেকটি বৈশ্বিক সমস্যার কথা এখানে আলোচনা করবো যেটা ইংরেজিতে ওসান এসিডিফিকেসন (Ocean acidification) নামে পরিচিতি পাচ্ছে। গুগলে ‘‘Ocean acidification’’ কি ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ দিলে নজরে আসা ফলাফল দেখে অনেকটাই আন্দাজ করা যাবে বিজ্ঞানীদের কী পরিমাণ ভাবিয়ে তুলেছে সম্প্রতি নজরে আসা এ বৈশ্বিক সমস্যা। ‘‘Ocean acidification’’ এর সমার্থক ও সার্বজনীন বাংলা প্রতিশব্দ নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে তবে আমি এখানে ‘‘সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি’’ ব্যবহার করেছি, প্রত্যাশা করি তা পাঠক সমাদৃত হবে। ইউরোপে আমার স্নাতকোত্তর পর্যায়ে করা এ সংক্রান্ত গবেষণা ও পরবর্তীতে বেশ কিছু কনফারেন্স ও সেমিনারে উপস্থিত হওয়ার সুবাদে গত কয়েক বছরে নতুন এ বৈশ্বিক সমস্যা সম্পর্কে আমার কিছুটা জানা-শুনার সুযোগ হয়েছে। সেই জানা-শুনার আলোকেই আজকের এ রচনা। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, গত ০৭/০৫/২০১১ ইং তারিখে ইংরেজি দৈনিক দ্যা ডেইলি স্টারেআমার এ সংক্রান্ত একটি লেখা ছাপা হয় (তথ্যসূত্র দ্রষ্টব্য)। আজকের এ লেখার বিষয়বস্তু অনেকটা সে লেখার অনুরূপ হলেও নতুন নতুন তথ্যসহ এ লেখার উপস্থাপনেও রইল নতুনত্বের ছাপ।

শুরুর কথা:
সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি (Ocean acidification) জনিত এ বৈশ্বিক সমস্যা বিজ্ঞানীদের নিকট প্রথম নজরে আসার সমসাময়িক সময়ের বেশ চমৎকার একটি ঘটনা রয়েছে যা পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরছি। ঘটনাটি ১৯৮৫ সালের গ্রীষ্মকালীন সময়ের। ভিক্টোরিয়া ফ্যাব্রি যিনি বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, সেসময়ে গবেষণা সংক্রান্ত কাজে  উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে জাহাজে অবস্থান করছিলেন। তিনি গবেষণা করছিলেন টেরোপড (Pteropod) নামক অতি ক্ষুদ্র এক প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী (Mollusk পর্বের অন্তর্গত) নিয়ে যা সাধারণত লম্বায় এক সেন্টিমিটারেরও কম হয়ে থাকে। ফ্যাব্রি সে সময় জাহাজে সাগর থেকে টেরোপড এর নমুনা সংগ্রহ করছিলেন। কিন্তু সেবার তিনি তার প্রয়োজনেরও অধিক সংখ্যক টেরোপড সংগ্রহ করে ফেলেন। ফলে স্বভাবতই তাঁকে স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক সংখ্যক জীবন্ত টেরোপড প্রতিটি প্লাস্টিক পাত্রে গাদাগাদি করে রাখতে হয়। পরদিন তিনি তার সেসব আবদ্ধ প্লাস্টিক পাত্রে এক অদ্ভুত ঘটনা দেখতে পেলেন। তিনি বলেন, ‘‘সাধারণত টেরোপড হল অনেকটা স্বচ্ছ প্রকৃতির। খালি চোখে তারা দেখতে ক্ষুদ্র চকচকে মুক্তা বা পাথর সদৃশ, এক কথায় অত্যন্ত সুন্দর। কিন্তু আমি সেসময় লক্ষ্য করি যে টেরোপড গুলির দেহের কিনার দিয়ে তাঁদেরকে কিছুটা অস্বচ্ছ দেখাচ্ছে, অনেকটা চকের গুড়ার মত।’’ আর এভাবেই সেসময় প্রায় ২৫ বছর আগে ফ্যাব্রির চোখে আমাদের সাগরের ভবিষ্যৎ প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে সেই পানি ভর্তি প্লাস্টিক পাত্রের ভিতর। আসলে কি ঘটেছিল সেই আবদ্ধ পাত্রে? অন্যান্য প্রাণীর মতই শ্বাস-প্রশ্বাস এর সময় টেরোপড অক্সিজেন (O2) গ্রহণ করে আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) ত্যাগ করে। যখন তারা মুক্ত সাগরে অবস্থান করে তখন এ প্রক্রিয়া কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না সাগরের বিশাল আয়তন আর পানির প্রবাহ থাকার কারণে। কিন্তু সেসব আবদ্ধ পাত্রে অধিক সংখ্যক জীবন্ত টেরোপড রাখার কারণে পাত্রের ভিতর CO2এর পরিমাণ বাড়তে থাকে যা পানির রাসায়নিক গুনাগুণ পরিবর্তন করে ফেলে। ফলস্বরূপ টেরোপড এর দেহের ক্যালসিয়াম কার্বনেট (Ca2CO3) এর স্তর গলতে শুরু করে অর্থাৎ পাত্রের সে পরিবেশ টেরোপডের জন্য চরম প্রতিকূল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ ঘটনা সেসময় নতুন ধরনের এ বৈশ্বিক সমস্যার রহস্য উন্মোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো যা অনেক বছর পরে নিউ সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি সেসময় বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে যে, আমাদের বায়ুমণ্ডলের CO2 বৃদ্ধি একইভাবে সমুদ্রের পানির রাসায়নিক গুণাগুণে পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে তা সমুদ্রে বসবাসরত প্রাণী সমূহের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে কিনা?

 

সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি কী, কেন এবং কীভাবে?
সহজ ভাষায় বলা যায়, বায়ুমণ্ডলের CO2 বৃদ্ধি সমুদ্রের উপরের স্তরের পানির রাসায়নিক গুনাগুণ পরিবর্তন করে তা ধীরে ধীরে অম্লীয় (acidic) করে ফেলছে। একেই বর্তমানে ‘‘সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি (Ocean acidification)’’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। ‘‘Ocean acidification’’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় ২০০৩ ইং সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘‘নেচার’’ এ প্রকাশিত হওয়া একটি গবেষণা প্রবন্ধে। অবশ্য এটাকে ইংরেজিতে ‘‘দি আদার CO2 প্রবলেম (The other CO2 problem)’’ এবং ‘‘দি ইভল টোয়িন অফ গ্লোবাল ওয়ারমিং (The evil twin of global warming)’’ নামেও অবিহিত করা হচ্ছে কেননা মনুষ্য কার্যকলাপ দ্বারা সৃষ্ট যে CO2 বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন ঘটাচ্ছে সেই একই CO2 সমুদ্রে এ অম্লতা বৃদ্ধির জন্যেও দায়ী। অনেকেই একে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন (Climate change) ভেবে ভুল করতে পারেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে এ দুটিকে এক কাতারে ফেলা ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তন হল বায়ুমণ্ডলে CO2 সহ অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস সমূহ (যেমন, মিথেন, ওজন প্রভৃতি) বৃদ্ধি পাবার ফলে আমাদের আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব। অন্যদিকে সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি হচ্ছে সুনির্দিষ্টভাবে সমুদ্রের পানির উপরিভাগ দ্বারা বায়ুমণ্ডলের CO2 শোষণের ফলে সমুদ্রের উপরের স্তরের পানির অম্লতা (acidity) বৃদ্ধি অর্থাৎ পানির পি এইচ (pH) এর মান কমে যাওয়া। এর সাথে সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়াটা সহজেই বর্ণনা করা যেতে পারে। বায়ুমণ্ডলের CO2 যখন সমুদ্রের পানির উপরিভাগের সংস্পর্শে আসে তখন CO2 দ্রবীভূত হয়ে দুর্বল কার্বনিক এসিড (H2CO3) তৈরি করে। এ কার্বনিক এসিড খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং তা ভেঙ্গে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) এবং বাইকার্বনেট আয়ন (HCO3) উৎপন্ন হয় (চিত্র)।

CO2  +  H2↔  H2CO3

(Dissolved Carbon dioxide + Water Carbonic acid)

H2CO3  ↔  H+  +  HCO31-

(Carbonic acid Hydrogen ion + Bicarbonate ion)

এটা সাগরের উপরিভাগে ঘটে চলা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা প্রকৃতপক্ষে অনেক গুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। কিন্তু পৃথিবীতে শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই মনুষ্য সভ্যতা অত্যধিক হারে বায়ুমণ্ডলে CO2 নিঃসরণ করতে শুরু করে যা এ স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এর ফলে অধিক হারে বিপুল পরিমাণ CO2আমাদের সমুদ্রের পানি দ্বারা শোষিত হতে থাকে যা সমুদ্রের স্বাভাবিক রাসায়নিক সমন্বয় সাধন সক্ষমতার বাইরে চলে যেতে থাকে। হিসেব করে দেখা দেখা গেছে, মনুষ্য কার্যকলাপ দ্বারা সৃষ্ট মোট CO2 এর প্রায় একতৃতীয়াংশই ইতিমধ্যে আমাদের সমুদ্রের পানি দ্বারা শোষিত হয়েছে। ফলস্বরূপ সমুদ্রের পানির রাসায়নিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট করে বললে, পানিতে হাইড্রোজেন আয়নের (H+) পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে যা পানির অম্লতা বাড়িয়ে দিচ্ছে বা পানির pH এর মান কমিয়ে দিচ্ছে। আর এ প্রক্রিয়াটাকেই ‘‘সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি’’ বলা হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীদের যে বিষয়টা ভাবিয়ে তুলেছে তা হল, সমুদ্রে এ অম্লতা বৃদ্ধির বর্তমান হার (অর্থাৎ যে হারে pH এর মান কমে যাচ্ছে)। তারা বলছেন, বর্তমানে যে হারে সমুদের পানির pH এর মান কমছে তা পৃথিবীর বিগত বিশ হাজার বছরের ইতিহাসে যে হার দেখা গেছে তার তুলনায় প্রায় ১০০ গুন বেশি।

পুনশ্চ:
প্রিয় পাঠক, এ লেখায় সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি কী? কেন এবং কীভাবে ইত্যাদি আলোচিত হল। আগামী পর্বের থাকবে: সামুদ্রিক মাৎস্য সম্পদের বিশেষত বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত।

প্রধান কয়েকটি তথ্যসুত্র:

  • Raven, JA. 2005. Ocean acidification due to increasing atmospheric carbon dioxide.
  • The Royal Society, London. pp. 68.
  • Fabry VJ, Seibel BA, Feely RA, Orr JC. 2008. Impacts of ocean acidification on marine fauna and ecosystem processes. ICES Journal of Marine Science 65: 414-432.
  • Doney SC, Fabry VJ, Feely RA, Kleypas JA. 2009. Ocean Acidification: The Other CO2 Problem. Annual Review of Marine Science 1: 169-192.
  • UNEP. 2010. Environmental Consequences of Ocean Acidification: A Threat to Food Security. UNEP Emerging Issues. pp. 12.
  • Oceana. 2009. Major emitters among hardest hit by ocean acidification. An analysis of the impacts of acidification on the countries of the world. Washington, DC USA. pp. 12.
  • Sarker, MY. 07 May 2011. The other CO2 problem. The Daily Star. Dhaka. p. 8.

 

Visitors' Opinion

লেখক

প্রাক্তন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার্থে জার্মানিতে রয়েছেন। যোগাযোগ: সেল ফোন- +491756287149, ইমেইল: mysarker@gmail.com

Leave a Reply