ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ | স্বাদুপানি | হ্যাচারি

হ্যাচারিতে দেশী শিং-মাগুর মাছের কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থাপনা

মাছ চাষিরা পর্যাপ্ত পোনা না পাওয়ার কারণে দেশী শিং-মাগুর চাষে আগ্রহ হারাতে বসেছে অথচ পর্যাপ্ত পোনা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকলে মাছ দুটি চাষ করে চাষিরা অধিক লাভবান হতে পারতো। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের মৎস্য বিজ্ঞানীরা দেশী শিং-মাগুরের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ পদ্ধতির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন এবং এর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে সীমিত আকারে সফলভাবে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শিং-মাগুরের পোনা উৎপাদিত হচ্ছে।

 

ব্রুড শিং-মাগুর মাছ সংগ্রহ ও প্রজনন পূর্ববর্তী পরিচর্যা

  • ব্রুড মাছের মজুদ পুকুরটি শুকিয়ে শতাংশে ১ কেজি চুন, ১০ কেজি গোবর এবং পানি দেয়ার পর শতাংশে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২৫ গ্রাম এমপি প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি করতে হবে।
  • পানির গভীরতা ১.২৫-১.৫ মিটার বা ৪-৫ ফুট রাখা প্রয়োজন।
  • পুকুরের পানির উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আলোর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
  • ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুস্থ, সবল ও পরিপক্ব ব্রুড মাছ সংগ্রহ করতে হবে।
  • পুকুরের প্রতি শতাংশে ৪০-৬০টি থেকে ১০০-১৫০ টি ব্রুড শিং বা মাগুর মাছ রাখা যায়।
  • পুরুষ ও স্ত্রী শিং বা মাগুর মাছ ১:১ অনুপাতে রাখতে হবে। শিং ও মাগুর উভয় প্রজাতির ব্রুডকে একই পুকুরে একত্রে না রাখাই উত্তম।
  • মাছের মোট ওজনের ৫-৭% সম্পূরক খাবারের এক চতুর্থাংশ প্রতিদিন সকালে বাকী তিন ভাগ সন্ধ্যার পর পুকুরের চার কোণায় স্তূপাকারে ফিডিং ট্রেতে দিতে হবে।
  • খাবারের সাথে অনুমোদিত এন্টিঅক্সিডেন্ট নির্ধারিত মাত্রায় এবং ভিটামিন-ই ২ গ্রাম/কেজি হিসাবে দিলে দ্রুত গোনাডের বৃদ্ধি ঘটে।
  • কাঁচা গোবর মাসে ১০ দিন অর্থাৎ তিন দিন পর পর শতাংশে ১ থেকে ১.২৫ কেজি হারে প্রয়োগ করলে ডিম দ্রুত পরিপক্ব হয়। ১০০ কেজি গোবর ১০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডারের সাথে একত্রে মিশিয়ে ২৪ ঘণ্টা রাখলে গোবর ক্ষতিকারক জীবাণু মুক্ত হয়।
  • ভাল ফলের জন্য মাছের ওজনের ৩% হারে টিউবিফেক্স প্রয়োগ করা উত্তম।
  • মাছের শরীরে যেন চর্বি বেশি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
  • মাছকে বিরক্ত না করে শানি-তে থাকতে দেয়া উচিত।
  • পুকুরে সীমিত পরিমাণে ভাসমান আগাছা (কলমিলতা বা হেলেঞ্চা) বেষ্টনী দিয়ে রাখা যেতে পারে।
  • পুকুরের চারপাশ বানা বা জাল দ্বারা ঘেরাও করে নেয়া উত্তম।

 

শিং-মাগুরের কৃত্রিম প্রজনন

  • পুকুর খেকে পরিপক্ব স্ত্রী ও পুরুষ মাছ ১:১ হারে উঠিয়ে হ্যাচারিতে রেখে ৮-১০ ঘণ্টা খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশ্রাম দিতে হয়। এ সময় পানির উচ্চতা ২-৩ ফুট রাখা হয় ও ঝর্ণার মাধ্যমে হালকা স্রোত সৃষ্টি করতে হয়।
  • স্ত্রী মাছকে ১০০-১৩০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে একটি ইনজেকশন প্রয়োগ করা যায়। আবার স্ত্রী মাছকে প্রথম ইনজেকশন পিজি ৬০-৭০ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা ওভাপ্রিম বা সুপ্রিম ২ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা এইচসিজি ৫০০০ আইইউ (১০ মিলি দ্রবণ)/২.৫ কেজি অথবা প্রতি ভায়েল ওভুপিন এর ১০ মি.লি. দ্রবণ/ ৫কেজি মাছ হিসাবে এক ডোজে মাছের লেজের অংশে ৩০-৪৫ ডিগ্রি কোণে ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়।
  • একই সাথে পুরুষ মাছকেও পিজি ২০-৩০ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা ওভাপ্রিম বা সুপ্রিম ১ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা এইচসিজি ৫০০০ আইইউ (১০ মিলি দ্রবণ)/৫ কেজি অথবা প্রতি ভায়েল ওভুপিন এর ১০ মি.লি. দ্রবণ/ ১০ কেজি মাছ হিসাবে একইভাবে ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়।
  • তবে আমার পরিচিত একজন এ বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের অভিমত হল, স্ত্রী মাছকে প্রথম ইনজেকশন ৫০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে প্রয়োগ করে ৬-৮ ঘণ্টা পর ১০০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে দ্বিতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। স্ত্রী মাছের দ্বিতীয় ইনজেকশনের সময় পুরুষ মাছকে ৫০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে প্রয়োগ করলে অধিক পরিমাণ মিল্ট পাওয়া যায়।
  • ইনজেকশন প্রয়োগ সন্ধ্যায় করা ভাল। ইনজেকশন দেয়ার পর হালকা ঝর্ণায় মৃদু স্রোত সৃষ্টি করে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ ১:১ অনুপাতে গোলাকার ট্যাংকে বা সিস্টার্নে রেখে দিতে হয়। এ সময় অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি ও পানির উচ্চতা ২-৩ ফুট রাখতে হয়। মাছকে বিরক্ত না রে শান্তিতে থাকতে দিতে হয়।
  • স্ত্রী মাছকে দ্বিতীয় ইনজেকশন দেওয়ার ৯-১২ ঘণ্টার মধ্যে মতান্তরে ১০-১৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম দিয়ে থাকে।
  • স্ত্রী মাছের ডিম দেওয়ার সময় তাৎক্ষনিকভাবে পুরুষ মাছের পেট কেটে শুক্রাশয় বা টেস্টিস বের করে কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে ০.২৫ লবণ দ্রবণে মতান্তরে ০.৮৫% লবণ দ্রবণে মিশিয়ে শুক্রাণুর দ্রবণ তৈরি করতে হবে।
  • ডিম সংগ্রহ ও টেস্টিস দ্রবণ তৈরির কাজ দুটি একসাথে দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ ৩-৪ মিনিটে করা ভাল, তবে তা সম্ভব না হলে আগে মাছের টেস্টিস কেটে দ্রবণ তৈরি করে নিয়ে পরে ডিম সংগ্রহ করতে হবে। অন্যথায় ডিম দ্রুত জমাট বেঁধে যাবে।
  • স্ত্রী মাছে পেটে চাপ দিয়ে ডিম বের করে একটি শুকনা খালি পাত্রে সংগ্রহ করে তার উপর শুক্রাণু সংবলিত টেস্টিস দ্রবণ মিশিয়ে ঐ ডিম নিষিক্ত করা হয়।

 

ডিমের পরিচর্যা

  • শিং-মাগুর মাছের ডিম আঠালো হওয়ার কারণে ট্রে অথবা সিষ্টার্নে ৪-৬ ইঞ্চি পানির গভীরতায় ডিমগুলো ট্রে/সিষ্টার্নের তলদেশে ঘন মেস সাইজের মশারী কাপড়ের ফ্রেমে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং ঝর্ণা অথবা ০.৫ ইঞ্চি প্লাস্টিক পাইপ সূক্ষ্ম ছিদ্র করে ঝর্ণার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • লক্ষ্য রাখতে হবে ডিমগুলি যেন একস্থানে জড়ো না হয়। স্যালাইন প্রদানের পাইপ ব্যবহার করে ফু দিয়ে বা অক্সিজেন গ্যাস দিয়ে সাবধানে ডিমগুলি বারবার সরিয়ে ও ছড়িয়ে দিতে হয়। এ সময়, পানি পরিবর্তনের কাজটিও সাবধানে করতে হয়।
  • ট্রে /শীর্ষস্থানে পানি নির্গমন মুখে গ্লাস নাইলন কাপড় দিয়ে দিতে হবে যাতে ডিম ফুটে রেণু বের হলে চলে যেতে না পারে।
  • রেণু পোনা বের হলে ট্রে অথবা সিষ্টার্নের তলার ডিমের খোসা সহ অন্যান্য ময়লা সাইফোনিং করে পরিষ্কার করে দিতে হবে।
  • ট্রে অথবা সিষ্টার্নের রেণু পোনা যাতে ফাঙ্গাসে আক্রান্ত না হয় সেজন্য মিথিলিন ব্লু বা ম্যালাকাইট গ্রিন অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ১৮-২৪ ঘণ্টা, মতান্তরে ২২-২৮ ঘণ্টা পর নিষিক্ত ডিম ফুটে রেণু পোনা বের হয়। তবে এবিষয়ে অভিজ্ঞজনেরা এসময়কাল ২৮-৩২ ঘণ্টা বলে মনে করেন।

 

রেণু পোনার পরিচর্যা

  • ডিম থেকে রেণু বের হওয়ার ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে আর্টিমিয়া বা সিদ্ধ হাঁসের ডিমের কুসুম রেণু পোনাকে খাওয়াতে হয়।
  • প্রতি লক্ষ রেণুর জন্য দৈনিক ৪টি সিদ্ধ হাঁসের ডিমের কুসুম ৪ বারে প্রয়োগ করতে হয়। ১-২ দিন পর রেণু পোনা নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করা যায়।
  • ডিম ফোটার ৩-৪ দিন পর রেণু পোনাকে ডিমের কুসুম, টিউবিফেক্স, জুপ্লাঙ্কটন বা আর্টিমিয়া খাবার হিসাবে দিতে হবে।
  • ট্রে/সিষ্টার্নের কোনার দিকের কিছু অংশ কাল পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কারণ রেণু পোনা অন্ধকার জায়গা পছন্দ করে এবং দিনের বেলায় অন্ধকার জায়গায় জড় হয়ে অবস্থান করে। রাত্রে সমস্ত ট্রে /শীর্ষস্থানে বিচরণ করে এবং রাত্রে খাবার খেতে বেশী পছন্দ করে।
  • হ্যাচারিতে ৮/১০ দিন যত্ন সহকারে প্রতিপালনের পর ডিম পোনা থেকে ধানী পোনায় পরিণত হয়

 

আঁতুড় পুকুরে ধানী পোনার যত্ন

  • আগে থেকেই ধানী পোনা রাখার একটি আঁতুড় পুকুর তৈরি করে রাখতে হবে।
  • ৮-১০ দিনের ধানী শিং মাছের পোনা প্রতি শতাংশে ১০-১২ হাজার মজুদ করা যেতে পারে।
  • ৮-১০ দিনের ধানী মাগুর মাছের পোনার মজুদ ঘনত্ব প্রতি শতাংশে ৮-১০ হাজার হওয়া শ্রেয়।
  • প্রতি দিন পোনার মোট ওজনের দ্বিগুণ ওজনের খাবার খাবার (যে কোন ভাল মানের ব্রান্ডের নার্সারি ফিড বা চিংড়ি নার্সারি ফিড) ২-৩ বারে দিতে হবে।
  • ধানী পোনা ছাড়ার ৩০-৪০ দিনের মধ্যে ৫-৭ সেমি (২-৩ ইঞ্চি) লম্বা হয়ে চারা পোনায় পরিণত হয় যা মজুদ পুকুরে স্থানান্তরিত করার উপযুক্ত হয়ে থাকে।

 

 

পূর্বের পর্ব: দেশী শিং-মাগুর মাছের পরিচিতি ও প্রাকৃতিক প্রজনন
পরের পর্ব: পুকুরে দেশী শিং-মাগুরের চাষ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

 

তথ্যসূত্র:

  • ইনামুল হক, ২০০৬; বাংলাদেশের ছোট মাছ: জীববৈচিত্র্য, চাষ ব্যবস্থাপনা, পুষ্টিমান ও প্রক্রিয়াজাতকরণ; ময়মনসিংহ।
  • কাজী ইকবাল আজম গং, ২০১২; দেশীয় শিং ও মাগুর মাছের প্রজনন ও রেণু উৎপাদন, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১২ সংকলন; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ; পৃষ্ঠা ১০৯-১১১।
  • বিএফআরআই, ১৯৯৭; উন্নত জাতের হাইব্রিড মাগুর উৎপাদন প্রযুক্তি (লিফলেট); বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইনষ্টিট্যুট, স্বাদু পানি কেন্দ্র, ময়মনসিংহ।
  • বিএফআরআই, ১৯৯৯; উন্নত জাতের হাইব্রিড মাগুর চাষের কলাকৌশল (লিফলেট); বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইনষ্টিট্যুট, স্বাদু পানি কেন্দ্র, ময়মনসিংহ।
  • মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০২; দেশী মাগুর ও শিং মাছ এর চাষ, মাছ চাষ ম্যানুয়াল; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।
  • মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৫; মাছের কৌলিতাত্ত্বিক উন্নয়ন ও ব্রুড স্টক ব্যবস্থাপনা (প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল); মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।
  • মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৯; কৈ, শিং ও মাগুর মাছচাষ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ মডিউল; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।
  • মৎস্য অধিদপ্তর, ২০১১; পুকুরে শিং ও মাগুর মাছ চাষ, বার্ষিক মৎস্য সংকলন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; পৃষ্ঠা ১২০-১২৫।
  • মোঃ জাহাঙ্গীর আলম গং, ২০১০; বাণিজ্যিকভিত্তিতে পুকুরে শিং মাছের চাষ, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১০ সংকলন; মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ; পৃষ্ঠা ৩২।

Visitors' Opinion

লেখক

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার, মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৎস্যবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করছেন। যোগাযোগ: akazad_dof@yahoo.com । বিস্তারিত

Leave a Reply