ক্যাটাগরি: অঙ্গসংস্থানবিদ্যা | মাৎস্য জীববিজ্ঞান | শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা

প্রোন (Prawn) ও শ্রিম্প (Shrimp) এর মধ্যে পার্থক্য

গলদা চিংড়ি

গলদা চিংড়ি Freshwater Giant Prawn, Macrobrachium rosenbergii

তাত্ত্বিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তুলনামূলক বড় আকারের চিংড়িকে প্রোন (Prawn) এবং ছোট আকারের চিংড়িকে শ্রিম্প (Shrimp) বলা হয়ে থাকে। প্রোনের প্রথম দুই জোড়া বক্ষ উপাঙ্গ চিমটা (Pincer) যুক্ত যার মধ্যে দ্বিতীয় জোড়া চিমটা সবচেয়ে বড়, ফুলকা ল্যামিলার (lamellar) তথা প্লেট সদৃশ (plate-like) এবং উপবর্গ প্লিওকাইমাটা (Pleocyemata) এর অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে শ্রিম্পের প্রথম তিন জোড়া বক্ষ উপাঙ্গ চিমটা যুক্ত যার মধ্যে প্রথম জোড়া চিমটা তুলনামূলক বড়, ফুলকা শাখান্বিত (branching) এবং উপবর্গ ডেন্ড্রোব্রাঙ্কিয়াটা (Dendrobranchiata) এর অন্তর্ভুক্ত। প্রোনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গলদা চিংড়ি (Freshwater Giant Prawn, Macrobrachium rosenbergii) এবং শ্রিম্পের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাগদা চিংড়ি (Asian Tiger Shrimp, Penaeus monodon)।

বাগদা চিংড়ি

বাগদা চিংড়ি Asian Tiger Shrimp, Penaeus monodon

উভয় ধরণের চিংড়ির মধ্যে অর্থাৎ প্রোন ও শ্রিম্পের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও অনেক মিলও রয়েছে। যেমন উভয়েই আর্থোপোডা (Arthropoda) পর্বের ক্রাশটেশিয়া (Crustacea) শ্রেণীর ডেকাপোডা (Decapoda) বর্গের অন্তর্ভুক্ত অমেরুদণ্ডী প্রাণী।  অর্থাৎ এদের উভয়েই দশ জোড়া পা (সন্ধিযুক্ত, jointed) বর্তমান।  মস্তক ও বক্ষ একীভূত হয়ে শিরোবক্ষ (Cephalothorax) তৈরি করেছে যা ক্যারাপেজ (Carapace) নামক খোলসে  আবৃত, দেহ ২০টি খণ্ডকে গঠিত যার মধ্যে প্রথম খণ্ডটি কেবলমাত্র লার্ভা দশায় দৃষ্টিগোচর হয়। উভয়েরই উনিশ জোড়া উপাঙ্গ বর্তমান। উভয়েই জীবন দশায় খোলস বদলের (Ecdysis) মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। প্রোন ও শ্রিম্প সারা পৃথিবীব্যাপীই দেখতে পাওয়া যায় এবং স্বাদু ও সামুদ্রিক উভয় ধরণের জলাশয়ের তলদেশেই এদেরকে বিচরণ করতে দেখা যায়। উভয়েই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড (omega-3 fatty acids) সমৃদ্ধ।

 

তাত্ত্বিকভাবে প্রোন ও শ্রিম্পের মধ্যে উপরোক্ত সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য থাকলেও পৃথিবীর দেশে দেশে প্রোন ও শ্রিম্প শব্দটির এলোমেলো ব্যবহারের কারণে কখন প্রোন আর শ্রিম্প ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রোন ও শ্রিম্প শব্দদুটির প্রয়োগের ভিন্নতাই এ বিতর্কের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। যেমন-

যুক্তরাজ্যে বড় আকারের চিংড়ি যাদের রোস্ট্রাম তুলনামূলক লম্বা এবং দেহ পাশাপাশি চাপা (laterally compressed) তাদের প্রোন এবং ছোট আকারের চিংড়ি (Crangonidae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত) যাদের রোস্ট্রাম (rostrum) তুলনামূলক খাটো এবং দেহ উপর-নীচে চাপা (dorso-ventrally depressed) তাদের শ্রিম্প বলা হয়ে থাকে।  তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি পরিষ্কার হলেও ব্যবহারিক দিক থেকে জটিলতা সৃষ্টি হয় যখন দেখা যায় Pandalus montagui প্রজাতিকে কোথাও Aesop prawn আবার কোথাও Aesop shrimp হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।  আবার Opossum shrimp এবং Skeleton shrimp নামে পরিচিত চিংড়িদ্বয়কে শ্রিম্প নামে ডাকা হলেও উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এগুলো আসলে প্রোন।

অতীতের ব্রিটিশ শাসিত দেশ সমূহে (বিশেষিত এশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়) ব্রিটিশ ধারা অনুসরণ করেই সাধারণত বড় আকারের চিংড়ি প্রোন এবং ছোট আকারের চিংড়ি শ্রিম্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে ব্রিটেনের মত আমাদের দেশেও প্রোন ও শ্রিম্প শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- বাগদা চিংড়ি (Penaeus monodon) সাধারণত Giant Tiger Prawn নামে আমাদের দেশে প্রচলিত হলেও বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এটি শ্রিম্পের অন্তর্ভুক্ত এবং অনেকেই একে Asian Tiger Shrimp নামে অভিহিত করে থাকেন।

অন্যদিকে অতীতের ব্রিটিশ শাসিত দেশ হবার পরও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে শব্দদুটির ব্যতিক্রম ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- অস্ট্রেলিয়ার অনেক লেখক একদিকে যেমন ছোট আকারের চিংড়িকে (যেমন- Hippolytidae, Alpheidae, Pandalidae এবং Campylonotoidea গোত্রের চিংড়ি) প্রোন নামে অভিহিত করেছেন আবার বড় আকারের চিংড়িকে (যেমন- Banded coral shrimp এবং Processidae ও Atyidae গোত্রের চিংড়ি) শ্রিম্প নামে অভিহিত করেছেন।  কিন্তু নিউজিল্যান্ডে তিন ইঞ্চি বা এর চেয়ে ছোট আকারের চিংড়ি যারা অগভীর জলে বাস করে এবং সাধারণ জালে ধরা পড়ে তাদেরকে শ্রিম্প এবং তিন ইঞ্চির চেয়ে বড় (প্রায় বার ইঞ্চি) আকারের চিংড়ি যারা বিভিন্ন ধরনের ফাঁদে এবং ট্রলিং (trawling) এর সময় ধরা পড়ে তাদেরকে প্রোন নামে অভিহিত করা হয়।

আমেরিকাসহ সারা উত্তর আমেরিকায় প্রোন শব্দটির প্রচলন নেই বললেই চলে।  ছোট বড় সকল চিংড়িই এখানে শ্রিম্প নামে পরিচিত। যদি কোথাও প্রোন শব্দটি ব্যবহার হয়েই থাকে তবে দেখা যায় তা ছোট আকারের চিংড়ির ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে যেমন Atyidae গোত্রের চিংড়িকে প্রোন বলা হয়ে থাকে যা মূলত ছোট আকারের চিংড়ি। এর ফলশ্রুতিতে সাধারণভাবে দেখা যায় ব্রিটেনে যা প্রোন আমেরিকায় তা শ্রিম্প এবং কখনো কখনো ব্রিটেনে যা শ্রিম্প আমেরিকায় তা প্রোন হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও মজা বিষয় হচ্ছে আমেরিকায় স্বাদুপানির অমেরুদণ্ডী প্রাণীকে সাধারণভাবে “Fresh water prawn” নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

ফ্রান্সে প্রোন ও শ্রিম্প এর পরিবর্তে  “Cravetle” নামটি ব্যবহৃত হয় আবার  স্পেনে প্রোন ও শ্রিম্প এর পরিবর্তে “Carmaron” নামটি ব্যবহৃত হয় যা প্রোন ও শ্রিম্প নামের জটিলতা থেকে তাদের রক্ষা করেছে।

যাই হোক আমাদের দেশেও প্রোন ও শ্রিম্প উভয় শব্দই ব্যবহৃত হয়ে থাকে যদিও তা সবসময় সুনির্দিষ্টভাবে মেনে চলতে দেখা যায় না। কোন কোন গ্রন্থে প্রোন ও শ্রিম্প এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে যথাক্রমে ইচা ও চিংড়ি উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসেবে Freshwater Giant Prawn (Macrobrachium rosenbergii) কে গলদা ইচা নামে উল্লেখ করা হলেও গলদা ইচার পরিবর্তে গলদা চিংড়িই অধিক পরিচিত বা ব্যবহৃত একটি নাম। আবার Penaeus monodon কে বাংলায় বাগদা চিংড়ি বলা হলেও এটি Asian Tiger Shrimp এর পরিবর্তে  Giant Tiger Prawn নামেই অধিক পরিচিত ও ব্যবহৃত।

 

উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে প্রোন ও শ্রিম্প শব্দ দুটির মধ্যে তাত্ত্বিকভাবে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য থাকলেও শব্দ দুটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে/অঞ্চলে বিভিন্নভাবে (কখনো কখনো বিপরীতভাবে) ব্যবহৃত হবার কারণেই নানান জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রোন ও শ্রিম্পকে পরস্পরের প্রতিশব্দ বা প্রতিনাম (synonyme) হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করলেও পৃথিবীর দেশে দেশে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

 

তাত্ত্বিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক প্রোন ও শ্রিম্পের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যসমূহ ছক আকারে নিচে দেয়া হল –

পার্থক্যের বিষয় প্রোন (Prawn) বা ইচা
শ্রিম্প (Shrimp) বা চিংড়ি
শ্রেণীবিন্যাসে অবস্থান Decapoda বর্গের অন্তর্গত Pleocyemata উপবর্গের অন্তর্ভুক্ত প্রজাতি Decapoda বর্গের অন্তর্গত Dendrobranchiata উপবর্গের অন্তর্ভুক্ত প্রজাতি
তুলনামূলক আকার প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তুলনামূলকভাবে আকারে বড় প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তুলনামূলকভাবে আকারে ছোট
দেহের গঠন তুলনামূলক উপর-নিচে চাপা (dorso-ventrally depressed) তুলনামূলক পাশাপাশি চাপা (laterally compressed)
ফুলকার গঠন প্লেটের ন্যায় (plate-like) ল্যামিলার (lamellar) ফুলকা বর্তমান শাখান্বিত (branching) ফুলকা বর্তমান
উপাঙ্গের আকার তুলনামূলকভাবে এদের উপাঙ্গ বড় তুলনামূলকভাবে এদের উপাঙ্গ ছোট
চিমটার (Pincer) সংখ্যা প্রথম দুই জোড়া বক্ষ উপাঙ্গে চিমটা (Pincer) বর্তমান প্রথম তিন জোড়া বক্ষ উপাঙ্গে চিমটা (Pincer) বর্তমান
চিমটার (Pincer) আকার দ্বিতীয় বক্ষ উপাঙ্গের চিমটা সবচেয়ে বড় প্রথম বক্ষ উপাঙ্গের চিমটা তুলনামূলকভাবে বড়
দ্বিতীয় উদর খণ্ডের খোলস উদরের দ্বিতীয় খণ্ডের খোলসের অগ্র ও পশ্চাৎ প্রান্ত যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় উদর খণ্ডের খোলসে সামান্য উপরিলেপন করে (overlapping) অবস্থান করে উদরের দ্বিতীয় খণ্ডের খোলসের কেবলমাত্র পশ্চাৎ প্রান্ত তৃতীয় উদর খণ্ডের খোলসে উপরিলেপন করে (overlapping) অবস্থান করে
উদাহরণ গলদা চিংড়ি, Freshwater Giant Prawn, Macrobrachium rosenbergii বাগদা চিংড়ি, Asian Tiger Shrimp, Penaeus monodon

 

গলদা ও বাগদা চিংড়ির চিমটা (Pincer) বিশিষ্ট বক্ষ উপাঙ্গ

গলদা ও বাগদা চিংড়ির চিমটা (Pincer) বিশিষ্ট বক্ষ উপাঙ্গ

 

গলদা ও বাগদা চিংড়ির দ্বিতীয় উদর খণ্ডের খোলসের উপরিলেপনের (overlapping) ধরণের মধ্যে পার্থক্য

গলদা ও বাগদা চিংড়ির দ্বিতীয় উদর খণ্ডের খোলসের উপরিলেপনের (overlapping) ধরণের মধ্যে পার্থক্য

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply