ক্যাটাগরি: মাৎস্য জীববিজ্ঞান | শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ও এর নামকরণ

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ

ক. Tenualosa ilisha (Sri Lankan hilsa), খ. Hilsa ilisha (পরিণত), গ. Hilsa ilisha (জাটকা)

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। এটি অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ। যার ফলে এর কদরও অত্যন্ত বেশি। ইলিশ নোনা পানির মাছ। তবে আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ (Hilsa ilisha) বংশবিস্তারকালে নদীর উজানের দিকে অভিপ্রয়াণ করে থাকে। তাই বাংলাদেশের বৃহৎ নদীসমূহ যথা পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ইত্যাদিতে এরা প্রচুর পরিমাণে জেলেদের জালে ধরা পড়ে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার পূর্বে এরা এককালে রাজশাহীসহ গোয়ালন্দ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়তো। এমন কি তখন এই ইলিশ ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ এলাকাতেও ধরা পড়তো। বর্তমানে ফারাক্কার প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানির গভীরতা, স্রোত ও ঘোলাত্ব না থাকায় ইলিশ আর এ পথে বংশ বিস্তারের জন্য আসেনা। যার ফলে এদের বিচরণ ও বংশবিস্তার ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান ইলিশ অবতরণ ও বিক্রয় কেন্দ্র হচ্ছে চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও বরিশাল। এসব মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছ আসে উত্তর বঙ্গোপসাগর থেকে বা মেঘনা ও পশুর নদীর মোহনাঞ্চল থেকে। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ রুপালী ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Hilsa ilisha (Hamilton-Buchanan, 1822)। Hilsa– র রয়েছে তিনটি প্রজাতি, যথা Hilsa ilisha, Hilsa keele এবং Hilsa toli । তন্মধ্যে কেবলমাত্র রূপালী ইলিশই (Hilsa ilisha) বংশ বিস্তারের জন্য অভিপ্রয়াণ করে স্বাদুপানিতে আসে। Hilsa keele এবং Hilsa toli হচ্ছে পুরোপুরি সামুদ্রিক। বংশ বিস্তারের জন্য এদের স্বাদুপানিতে আসার প্রয়োজন হয় না।

Tenualosa ilisha নামেও একটি ইলিশ মাছ আছে যা শ্রীলংকার নদীর মোহনা ও সমুদ্রে (মধ্য পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরে) পাওয়া যায় । Tenualosa ilishaHilsa ilisha মাছ দুটো দেখতে প্রায় একই রকম শুধু তফাৎ হচ্ছে Hilsa ilisha-র দেহ মসৃণ ও দাগবিহীন (spotless) আর Tenualosa ilisha-র দেহে পৃষ্ঠ-পার্শ্বীয় অংশে উভয় দিকে কালো কোণাকৃতির কয়েকটি দাগ (black spot) থাকে। বাংলা-ভারত-পাকিস্তান তথা উপমহাদেশের স্বাদুপানির (freshwater shad, Ganges/Padma shad, river shad) ইলিশ মাছের নামকরণে ১৯৭০ দশক পর্যন্ত কোন মতভেদ ছিলনা। সবাই এই রুপালী ইলিশকে Hilsa ilisha বলেই জানতেন। কিন্তু আশির দশকের দিকে শফি ও কুদ্দুস তাদের ‘বাংলাদেশের মাৎস্য সম্পদ (২০০১)’ পুস্তকে যখন এই ইলিশকে Hilsa ilisha না বলে Tenualosa ilisha বলে উল্লেখ করেন তখনই শুরু হয় এই বিভ্রান্তি। শফি ও কুদ্দুস তাদের বইয়ে এই মাছটিকে Tenualosa ilisha উল্লেখ করে এর বর্ণনা দিয়েছেন তবে ট্যাক্সোনমিক কি (Taxonomic key) ব্যবহার করে এর শনাক্তকরণের কোন পদ্ধতি বর্ণনা করেননি। মাছটির নামকরণে আরও বিভ্রান্তি ঘটে যখন হোয়াইটহেইড (Whitehead, 1985, FAO Fish Synop. (125) 7(1) 268) এই মাছটিকে Hilsa ilisha-র পরিবর্তে Tenualosa ilisha বলে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ পদ্মা ইলিশের প্রজাতির নাম ilisha ঠিকই আছে কিন্তু গণ (genus) নাম এর পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। এখন আমরা HilsaTenualosa এই দুটি গণ (genus) এর কোনটি গ্রহণযোগ্য তাই পর্যালোচনা করবো। এই স্বাদুপানির তথা নদীর ইলিশকে (freshwater/river shad) Cuvier ১৮২৯ সালে Clupea ilisha নামকরণ করেছিলেন (Regine animale, 2nd ed. 2, 320)। Day 1878 সালে এর নামকরণ করেছিলেন Clupea ilisha (Fishes of India, 640, PL 172 Fig 3, Fauna of British India, 1889, Fishes-1, 377)। ইতোপূর্বে Lacepede এর নামকরণ করেছিলেন Clupanodon ilisha (Hamilton-Buchanan, 1822, Fishes of the Ganges, 243, PL. 19, Fig. 73)।

Regan 1917 সালে এই ইলিশের গণ (genus) এর নামকরণ করেছেন Hilsa (Ann, mag nat, hist. (8), 303)। Fowler 1934 সালে এই ইলিশের গণ এর নামকরণ করেছেন Tenualosa (Proc, Acad, Nat. Sci. Philad, (85) 246)। পরবর্তীতে Munro 1955 সালে তার ‘Marine and freshwater fishes of Ceylone’ শিরোনামের গ্রন্থে Fowler এর দেয়া নাম Tenualosa বলেই এর বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান-উপ মহাদেশের প্রায় সব মৎস্য বিশেষজ্ঞ যথা Hora, Alikunhi, Jhingran, Talwar, Srivastava, Bhuiyan, Rahman সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞগণ তাদের প্রকাশনায় স্বাদুপানির এই ইলিশকে Hilsa ilisha বলেই বর্ণনা করেছেন। আতাউর রহমান তার Freshwater fishes of Bangladeesh বইয়ের প্রথমদিকের সংস্করণে Hilsa ilisha বলেই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সর্বশেষ সংস্করণে তিনি মাছটিকে Hilsa ilisha না বলে Tenualosa ilisha বলে বর্ণনা করেছেন।

এখন আমার বক্তব্য বাংলাদেশের তথা স্বাদুপানির ইলিশের (river shad, freshwater shad) নাম Hilsa ilisha নাকি Tenualosa ilisha তা নির্ধারণ করা। আমি মনে করি স্বাদুপানির এই ইলিশের নাম Hilsa ilisha-ই Tenualosa ilisha নয়। মৎস্য শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যার তথ্যানুসারে  Hilsa নামটি Regan 1917 সালে প্রস্তাব করেছেন আর একই মাছের নাম Fowler 1934 সালে Tenualosa প্রস্তাব করেছেন। তাই অগ্রাধিকার আইন (Law of Priority) অনুযায়ী আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের নাম Tenualosa গ্রহণযোগ্য নয়। বরং Hilsa নামটিই গ্রহণযোগ্য ও সঠিক।

এই মাছটির নাম পূর্বে দেয়া Clupea ilisha, Clupanodon ilisha যে পরবর্তীতে টিকে থাকেনি তার কারণ এই যে, ClupeaClupanodon অন্য মাছের ক্ষেত্রে নামটি এখনও বহাল আছে। যেমন করে এককালে আমাদের রুই মাছের নাম ছিল Cyprinus rohita পরবর্তীতে এই রুই মাছ ও ইউরোপিয়ান রুই মাছ (common carp) এক না হওয়ায় এর নাম Labeo rohita করা হয়েছে যা এখনো টিকে আছে। কিন্তু Cyprinus নামটি বাদ পড়েনি, এখনও তা বহাল আছে। Flower যে ইলিশের নাম Tenualosa ilisha প্রস্তাব করেছেন তা হচ্ছে শ্রীলংকার ইলিশ। Munro 1955 সালে শ্রীলংকার ইলিশের নাম Tenualosa ilisha গ্রহণ করে তা বর্ণনা করেছেন। তিনি শ্রীলংকায় কোন Hilsa জাতির পাননি বা বর্ণনা করেননি।

এখন আমরা দেখবো HilsaTenualosa মাছের মধ্যে পার্থক্য কি? Hilsa ilisha মাছে কোন কালো দাগ থাকে না এবং জীবনচক্রের কোন দশাতেই এই দাগ পরিলক্ষিত হয় না। পক্ষান্তরে Tenualosa ilisha-র উভয় পাশের পৃষ্ঠ-পার্শ্বীয় দিকে ৬-৭টি খাড়া কোণাকৃতির দাগ (black spot) থাকে। Tenualosa ilisha শ্রীলংকার নদীসমূহ এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে ও ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের কোথাও এই দাগযুক্ত ইলিশ পাওয়া যায় না। সুতরাং HilsaTenualosa দুইটি ভিন্ন গণ। Hilsa-কে বাদ দিয়ে Tenualosa প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যদি এটি করা হয় তবে Hilsa নামটি থাকবে কোন মাছের? আর কী কারণেই বা Hilsa নাম বর্জন করতে হবে? Tenualosa নামটি গ্রহণ করার কারণই বা কী? অথচ Regun এই মাছটির নাম Hilsa দিয়েছেন ১৯১৭ সালে। অন্যদিকে Fowler মাছটির নাম Tenualosa দিয়েছেন ১৯৩৪ সালে। Whitehead ১৯৮৫ সালে পুনঃসংস্করণের নামে কেন Hilsa-র পরিবর্তে Tenualosa গ্রহণ করলেন? অথচ মাছ দুইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য দাগমুক্ত (Hilsa)ও দাগযুক্ত (Tenualosa) এদেরকে স্পষ্টই আলাদা করেছে।

এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, আমি ১৯৭৪ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রায় ৩৯ বছর যাবত রাজশাহীতে ইলিশ দেখেছি এবং দেশের অন্যান্য স্থানেও দেখেছি তাতে জাটকাসহ পরিপক্ব দশায় সব ইলিশ-ই রূপালী সাদা এবং দাগমুক্ত দেখেছি। কোন ইলিশেই এই দাগ দেখিনি। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে করটিয়া সাদাত কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মিউজিয়ামে একটি সংরক্ষিত ইলিশের গায়ে স্পষ্ট কাল দাগ দেখেছি। ২০০৭ সালের অক্টোবরে রাজশাহীর সাহেব বাজারে একদিন কাল দাগ বিশিষ্ট কয়েকটি ইলিশ অন্যান্য ইলিশের সাথে দেখেছি। এদের কয়েকটি আমি গবেষণার জন্য রাবি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মৎস্য ল্যাবে সংরক্ষণ করেছি। সম্ভবত এই দাগ বিশিষ্ট ইলিশগুলো (Tenualosa ilisha) উত্তর বঙ্গোপসাগরের দিকে অভিপ্রয়াণ করে এসেছিল যা জেলেদের জালে অন্যান্য ইলিশের সাথে ধরা পরে এবং ইলিশ মার্কেটিং চ্যানেলের মাধ্যমে রাজশাহীতে আসে। তাই বলতে চাই বাংলাদেশের স্বাদুপানির ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম Hilsa ilisha-ই Tenualosa ilisha নয়। Tenualosa ilisha হচ্ছে শ্রীলংকার ইলিশের নাম। হোয়াইটহেইড তার গ্রন্থের পুনঃসংস্করণে আমাদের বাংলাদেশের ইলিশকে ভুল করে Hilsa ilisha-র পরিবর্তে Tenualosa ilisha করেছেন। শফি ও কুদ্দুস ব্যতীত ভারতীয় উপমহাদেশের কোন মৎস্য বিশেষজ্ঞই এই মাছটির নাম Tenualosa গ্রহণ করেননি। আতাউর রহমান খানের বইয়ের নতুন সংস্করণে Hilsa-র পরিবর্তে Tenualosa করা হয়েছে তাও নিতান্তই ভুল। অতএব উপসংহারে বলবো আমাদের জাতীয় মাছ রূপালী ইলিশের নাম Hilsa ilisha-ই, Tenualosa ilisha নয়। Tenualosa ilisha হচ্ছে শ্রীলংকার ইলিশের নাম এবং এটি একটি ভিন্ন প্রজাতির ইলিশ।

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ।

Leave a Reply