ক্যাটাগরি: বিদেশী মাছ | মাছ | মাৎস্য সম্পদ

বাংলাদেশের বিদেশী মাছ: নীল ডলফিন সিচলিড, Blue Dolphin Cichlid, Cyrtocara moorii

নীল ডলফিন সিচলিড, Blue Dolphin Cichlid, Cyrtocara moorii

নীল ডলফিন সিচলিড, Blue Dolphin Cichlid, Cyrtocara moorii

পূর্ব আফ্রিকার মাছ নীল ডলফিন সিচলিড (Blue Dolphin Cichlid, Cyrtocara moorii) এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে থাইল্যান্ড থেকে সর্বপ্রথম আমাদের দেশের নিয়ে আসে বাহারি মাছের ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য বড় শহরের (যেমন চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ইত্যাদি) বাহারি মাছের দোকানে এই মাছের দেখা মেলে।

শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান (Systematic position)
পর্ব: Chordata (chordates)
শ্রেণী: Actinopterygii (Ray-finned fishes)
বর্গ: Perciformes (perch-like fishes)
পরিবার: Cichlidae (cichlids)
গণ: Cyrtocara
প্রজাতি: Cyrtocara moorii Boulenger, 1902

শব্দতত্ত্ব (Etymology)
Cyrtocara শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ থেকে। শব্দদুটি হচ্ছে kyrtos যার অর্থ বাঁকানো (bent) এবং গ্রিক শব্দ kara যার অর্থ মুখমণ্ডল (face)।

সমনাম (Synonyms)
Cyrtocara moorei Boulenger, 1902
Cyrtocara moori Boulenger, 1902
Haplochromis moorii (Boulenger, 1902)
Haplochromis moori (Boulenger, 1902)
Crytocara moorii

সাধারণ নাম (Common name)
বাংলা: নীল ডলফিন সিচলিড, হাম্পহেড সিচলিড, হাম্পহেড, মালাউই ডলফিন সিচলিড, মৌরি, নীল মৌরি
English: Blue Dolphin Cichlid, Hump-head Cichlid, Hump-head, Malawi Dolphin Cichlid, Moori, Blue moori

বিস্তৃতি (Distribution)
এই মাছের আদিবাস পূর্ব আফ্রিকার মোজাম্বিক (Mozambique), তানজানিয়া (Tanzania) ও মালাউই (Malawi) দেশস্থ মালাউই হ্রদ (Lake Malawi of East Africa)। প্রকৃতিতে কেবলমাত্র মালাউই হ্রদেই (Endemic to Lake Malawi) এদের দেখতে পাওয়া যায়। তবে বাহারি মাছ হিসেবে এই মাছ পৃথিবীর দেশে দেশে বিস্তার লাভ করেছে যেমনটা করেছে বাংলাদেশ।
Fishbase (2014) অনুসারে প্রকৃতিতে এদের বিস্তৃতি 9°S – 15°S ।

সংরক্ষণ অবস্থা (Conservation status)
IUCN 2013 অনুসারে আইইউসিএন এর হুমকিগ্রস্ত প্রজাতির লাল তালিকায় (The IUCN Red List of Threatened Species) এদের অবস্থান Least Concern (LC) অর্থাৎ প্রকৃতিতে এই মাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় তাই বর্তমানে এমন কি নিকট ভবিষ্যতেও এদের হুমকিগ্রস্ত প্রজাতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার সম্ভাবনা নেই।

দৈহিক গঠন (Morphology)
পার্চ আকৃতির (perch like) দেহ পার্শ্বীয়ভাবে বেশ চাপা। দেহের বর্ণ ফিরোজা (turquoise) থেকে রূপালী-নীল (silvery-blue) হয়ে থাকে। এদের মাথার সম্মুখভাগের উপরের দিকে একটি কুঁজ (hump) গঠিত হয় যা বয়সের সাথে সাথে বাড়তে থাকে। একটি পরিণত নীল ডলফিন সিচলিড এর মাথার গঠন দেখতে অনেকটাই ডলফিনের মাথার গঠনের মত। এখান থেকেই এদের নাম এসেছে নীল ডলফিন সিচলিড (Blue Dolphin Cichlid)।

সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য (Maximum length)
এদের পুরুষেরা ১০ ইঞ্চি বা ২৫ সেমি এবং স্ত্রীরা ৮ ইঞ্চি বা ২০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে (Seriouslyfish, 2014) তবে বাংলাদেশে এই মাছের নথিভুক্ত সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১৫ সেমি (Galib and Mohsin, 2011)।

আবাস্থল (Habitat)
এরা উষ্ণ জলের স্বাদুপানির মাছ এবং প্রকৃতিতে কেবলমাত্র মালাউই হ্রদেই (Endemic to Lake Malawi) এদের দেখতে পাওয়া যায়। জলাশয়ের অগভীর এলাকার বালুময় তলদেশে এরা থাকতে পছন্দ করে।

খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস (Food and feeding habit)
প্রকৃতিতে এরা মূলত শিকারি মাছ। এরা সাধারণত ছোট আকারে প্রাণী শিকার করে খায়।
বাহারি মাছের দোকানে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের প্যাকেটজাত বাণিজ্যিক মাছের খাবার যেমন- ফ্লেকস (flakes), পিলেট (pellets) ইত্যাদি এরা খেয়ে থাকে। এছাড়াও এরা জীবন্ত খাবার যেমন- ব্রাইন শ্রিম্প (brine shrimp), মাইসিস শ্রিম্প (mysis shrimp), ছোট ছোট ক্রিল (krill), রক্ত-কীট (bloodworms) ইত্যাদি খেয়ে থাকে। এমনটি এ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা ছোট আকারে জীবন্ত মাছও এরা শিকার করে খায়।
এদের দ্রুত বৃদ্ধি ও ভাল প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ আমিষযুক্ত খাবার সরবরাহ করতে হয়। দিনে এক থেকে দুই বার খাবার সরবরাহ করা প্রয়োজন।

জীবনকাল ও প্রজনন (Lifecycle and Breeding)
এদের জীবনকাল দশ বছর (Tropicalfishandaquariums 2014)। অন্যদিকে Aqua-fish (2014) অনুসারে এদের জীবনকাল ১২ বছর।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এরা ১৬ মাসে পরিপক্বতা লাভ করে এসময় এরা ৪-৫ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। এদের পুরুষ ও স্ত্রী মাছ আলাদা। একই বয়সের পুরুষেরা স্ত্রীদের চেয়ে সামান্য বড় হয়ে থাকে তবে এই পার্থক্য এতই কম যে তা বুঝতে পারার জন্য কয়েক বছর বয়স হতে হয়। তাই এ্যাকুয়ারিয়ামে বেড়ে ওঠা মাছের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ আলাদা করা সহজ কাজ নয়। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ ও স্ত্রী মাছের দেহের বর্ণেও এমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না যা থেকে এদের আলাদা করা যায়। তাই স্ত্রী ও পুরুষ মাছ আলাদা করার নির্ভরশীল কোন বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়না। তবে ডিমধারী পরিপক্ব স্ত্রী মাছদের উদর কিছুটা স্ফীত হওয়ায় অভিজ্ঞরা সহজেই এদের আলাদা করতে পারেন।
প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রজনন ঋতুতে পরিণত স্ত্রীরা প্রতি দুই মাস পরপর ২০-৯০টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো কোন পাথর বা গাছের গুড়ির (log) প্রশস্ত তলের সাথে একটি থোকায় (clutch) আবদ্ধ হয়ে আটকে থাকে। সেখানেই পুরুষের ডিমগুলো নিষিক্ত করে। মায়েরা তাদের মুখগহ্বরে নিষিক্ত ডিমগুলিকে আশ্রয় দেয়। মুখগহ্বরেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় এবং ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত বাচ্চারা মায়ের মুখগহ্বরে আশ্রিত থাকে। এরপর বাচ্চারা আণুবীক্ষণিক কীট (micro worms) ও সদ্যজাত ব্রাইন শ্রিম্প (newly hatched brine shrimp) খেতে শুরু করে।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের প্রজনন করানো বেশ কঠিন। তবে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে এ্যাকুয়ারিয়ামেও এদের প্রজনন করানো যায়। এজন্য প্রয়োজন হয় বড় আকারের এ্যাকুয়ারিয়াম যার পানি পরিবর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রজনন করানোর উদ্দেশ্যে লালন-পালন করা মাছকে উচ্চ আমিষ সমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ করা আবশ্যক। মায়েরা ডিম পাড়ার জন্য তৈরি হলে একটি পুরুষের বিপরীতে একাধিক স্ত্রী মাছ (সাধারণত একটি পুরুষের বিপরীতে তিন-ছয়টি স্ত্রী মাছ) প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা আবশ্যক। ডিমের থোকা যাতে আটকে থাকতে পারে সেজন্য এ্যাকুয়ারিয়ামে প্রশস্ত তল বিশিষ্ট পাথর, কাঠের টুকরা ইত্যাদি স্থাপন করতে হয়। এসময় মাছগুলিকে প্রতি নিয়ত পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা আবশ্যক। মা মাছ ডিম পাড়ার পর পুরুষ মাছটি ডিমগুলোকে নিষিক্ত করে। এর পরপরই মায়েরা নিষিক্ত ডিমের থোকা মুখে আশ্রয় দেয়। এ সময় ডিমসহ মা মাছকে একটা আলাদা এ্যাকুয়ারিয়ামে স্থানান্তর করতে হয় এবং পরবর্তী ৩-৪ সপ্তাহ সেখানে একাকী রাখার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তিন থেকে চার সপ্তাহ পর বাচ্চাদের ব্রাইন শ্রিম্পের (brine shrimp) বাচ্চা অথবা মিহি করা বাণিজ্যিক খাবার সরবরাহ করা যায়।

উপযোগী পরিবেশ (Suitable Environment)
স্বাদুপানির এই মাছ জলাশয়ের তলদেশের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। বালু ও পাথর বিশিষ্ট তলদেশ এদের প্রধান পছন্দ। প্রকৃতিতে এই মাছের অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে- পিএইচ (pH): ৭.২-৮.৮ হার্ডনেস (Hardness): ১০-১৮ dH, তাপমাত্রা: ২৪-২৬ ডিগ্রী সে এবং গভীরতা: ৩-১৫ মিটার (Fishbase, 2014)।
Fishlore (2014) অনুসারে এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের অনুকূল তাপমাত্রা ৭৫-৭৯° ফা. বা ২৪-২৬° সে., হার্ডনেস (Hardness): ১০-১৮ dH এবং পিএইচ ৭.২-৮.৮।
Seriouslyfish (2014) অনুসারে এ্যাকুয়ারিয়ামের আদর্শ আকার ৬০ x১৫x১৮ ইঞ্চি বা ১৫০x৩৭.৫x৪৫ সেমি যা ২৫০ লিটার পানি ধারণ করতে পারে এবং পানির অনুকূল তাপমাত্রা ৭৭-৮৪° ফা. বা ২৫-২৯° সে., হার্ডনেস (Hardness): ১০-২৫°H এবং পিএইচ ৭.৫-৮.৮।
এ্যাকুয়ারিয়ামের তলদেশ বালি ও পাথরে সজ্জিত করা এবং পর্যাপ্ত সাঁতরানোর স্থানের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
এরা অন্যান্য সিচলিড এর তুলনায় শান্ত। প্রজনন ঋতুতে এদের প্রজনন এলাকার মধ্যে অন্য মাছের উপস্থিতি এরা পছন্দ করে না এবং আক্রমণাত্মক আচরণ প্রকাশ করে। অন্যান্য সময়কালে এ্যাকুয়ারিয়ামে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে অন্যান্য বড় আকারের মাছের সাথে এই মাছ রাখা যায়। তবে খেয়ে ফেলতে পারে এমন আকারের অর্থাৎ ছোট আকারের মাছ যারা শান্ত প্রকৃতির তাদের সাথে একই এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের না রাখাই ভাল কারণ সহজেই শিকারে পরিণত হতে পারে।

রোগ (Diseases)
Animal-world (2014) অনুসারে উষ্ণ জলের মাছ হিসেবে এই মাছের রোগাক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম। তবে এ্যাকুয়ারিয়ামের পানির গুণগত মান কমে গেলে যেমন পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে এদের সাদা দাগ রোগ (White Spot Disease) দেখা যায়। পানির তাপমাত্রা ৮৬° ফা. বা ৩০° সে. তিন দিন বজায় রাখলে এটি ভাল হয়ে যায়। যদি এতে ভাল না হয় তবে কপার (Copper) ব্যবহার করে এই রোগের উপশম পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে এই মাছের রোগের উপস্থিতি বিষয়ক কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic importance)
এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী এর চাহিদা রয়েছে। শক্ত প্রকৃতির এই মাছের ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ায় যারা এ্যাকুয়ারিয়ামে বাহারি মাছ পালন শুরু করতে আগ্রহী তারা এই মাছ নির্বাচন করতে পারেন নিশ্চিতভাবেই।
এছাড়াও পোনা উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।

বাজার মূল্য:
বাংলাদেশে প্রতি জোড়া নীল ডলফিন সিচলিড পাওয়া যায় ১২০-২০০ টাকার মধ্যে (Galib and Mohsin, 2011)।

 

তথ্য সূত্র (References)

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply