ক্যাটাগরি: বিদেশী মাছ | মাছ | মাৎস্য সম্পদ

বাংলাদেশের বিদেশী মাছ: নীল একারা, Blue Acara, Aequidens pulcher

নীল একারা, Blue Acara, Aequidens pulcher

নীল একারা, Blue Acara, Aequidens pulcher

দক্ষিণ আমেরিকার মাছ একারা (Blue Acara, Aequidens pulcher) এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে থাইল্যান্ড থেকে প্রথম আমাদের দেশের নিয়ে আসা হয়। Galib and Mohsin (2011) কর্তৃক পরিচালিত জরিপ চলাকালে এই মাছের দেখা মেলে কেবলমাত্র ঢাকা চিড়িয়াখানায় (বাংলাদেশের জাতীয় চিড়িয়াখানা যা ঢাকার মিরপুর-১ এ অবস্থিত)।

শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান (Systematic position)
পর্ব: Chordata (chordates)
শ্রেণী: Actinopterygii (Ray-finned fishes)
বর্গ: Perciformes (perch-like fishes)
পরিবার: Cichlidae (cichlids)
গণ: Aequidens
প্রজাতি: Aequidens pulcher (Gill, 1858)

সমনাম (Synonyms)
Cychlasoma pulchrum Gill, 1858.

সাধারণ নাম (Common name)
বাংলা: নীল একারা, নীল একারা চিকলিড
English: Blue Acara, Blue Acara Cichlid

বিস্তৃতি (Distribution)
Fishbase (2014) অনুসারে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া (Colombia), ভেনেজুয়েলা (Venezuela), বলিভিয়া (Bolivia), ত্রিনিদাদ ও টোবাগো (Trinidad and Tobago)। এই মাছের আদিবাস (Native) ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং ভেনেজুয়েলা Seriouslyfish (2014) ।
Fishbase (2014) অনুসারে প্রকৃতিতে এদের বিস্তৃতি 11°N – 5°N, 73°W – 60°W ।
বাহারি মাছ হিসেবে এই মাছ অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর দেশে দেশে বিস্তার লাভ করেছে যেমনটা করেছে বাংলাদেশ।

সংরক্ষণ অবস্থা (Conservation status)
IUCN 2013 অনুসারে আইইউসিএন এর হুমকিগ্রস্ত প্রজাতির লাল তালিকায় (The IUCN Red List of Threatened Species) এদের অবস্থান Not Evaluated অর্থাৎ এই মাছের সংরক্ষণ অবস্থা এখনও মূল্যায়ন করা হয়নি।

দৈহিক গঠন (Morphology)
লম্বা ও প্রশস্ত দেহ পার্শ্বীয়ভাবে চাপা। দেহের বর্ণ জলপাই-সবুজ। দেহের উভয় পাশে আটটি উলম্ব ডোরা (band) দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও অসংখ্য উজ্জ্বল নীল-সবুজ রেখা দেখতে পাওয়া যায় গণ্ডদেশে (cheek)। এদের পায়ু পাখনার প্রথম তিনটি পাখনা রশ্মি কাঁটায় (spine) পরিণত হয়েছে।

সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য (Maximum length)
Fishbase (2014) অনুসারে এদের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১৬ সেমি।
নথিবদ্ধ সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৮ সেমি (Galib and Mohsin, 2011)

আবাস্থল (Habitat)
এরা উষ্ণ জলের স্থির জল ও স্বচ্ছ ও স্রোত বিশিষ্ট ঝর্ণার মাছ। এরা জলজ উদ্ভিদ বিশেষত ভাসমান জলজ উদ্ভিদের উপস্থিতি পছন্দ করে।

খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস (Food and feeding habit)
প্রধানত মাংসাশী (carnivorous)। প্রকৃতিতে এরা বিভিন্ন ধরণের কীট (worms), ক্রাস্টেশিয়ানস (crustaceans) ও পতঙ্গ (insects) খেয়ে (Mills and Vevers, 1989)।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এরা রক্ত-কীট (bloodworm), ব্রাইন শ্রিম্প (brine shrimp), ঝিনুক বা চিংড়ির মাংসল টুকরা, কেঁচো এবং অন্যান্য প্যাকেটজাত শুকনো খাবার (Seriouslyfish, 2014)। দিনে একবার খাবার দেয়াই যথেষ্ট।

জীবনকাল ও প্রজনন (Lifecycle and Breeding)
Aquaticcommunity (2014) অনুসারে প্রকৃতিতে এদের জীবনকাল ১০ বছর।
এদের পুরুষ ও স্ত্রী মাছ আলাদা তবে এদের মধ্যে পার্থক্য করা খুবই কঠিন। এই বয়সের পুরুষেরা স্ত্রীদের চেয়ে সামান্য বড় হয়ে থাকে। অন্যদিকে পুরুষদের পৃষ্ঠ ও পায়ু পাখনা স্ত্রীদের পৃষ্ঠ ও পায়ু পাখনা থেকে লম্বা হয়ে থাকে। এছাড়াও পুরুষদের পৃষ্ঠ ও পায়ু পাখনার শেষ প্রান্ত সামান্য তীক্ষ্ণ (pointed) হয়ে থাকে এবং স্ত্রীদের পৃষ্ঠ ও পায়ু পাখনার শেষ প্রান্ত তুলনামূলক গোলাকার হয়ে থাকে (Seriouslyfish, 2014)।
Aquaticcommunity (2014) অনুসারে এরা লম্বায় ১০ সেমি হলেই প্রজননে অংশ গ্রহণের উপযোগী হয়ে থাকে। প্রকৃতিতে প্রজননগত দিক থেকে এরা একগামী (monogamous) প্রকৃতির অর্থাৎ এক প্রজনন ঋতুতে এদের স্ত্রী ও পুরুষেরা কেবলমাত্র একজন সঙ্গীর সাথেই প্রজননে অংশ নিয়ে থাকে। স্ত্রীরা আঠালো ডিম খুব সাবধানতার সাথে একটি পাথরের পরিস্কার ও সমতল তলে আটকে রাখে। এদের মধ্য প্রত্যক্ষ মাতৃ-পিতৃ যত্ন (parental care) দেখতে পাওয়া যায়। মা ও বাবা উভয়ে মিলে ডিম ও বাচ্চার যত্ন নেয়। সাধারণত বাবারা প্রজননক্ষেত্র পাহারা দেয় এবং মায়েরা ডিমের দেখাশোনা করে (Mills and Vevers (1989)।
Seriouslyfish (2014) অনুসারে প্রজননের সময় এরা পরিস্কার পানি ও পরিবেশ পছন্দ করে। আড়ালের জন্য বড় আকারের পাতা বিশিষ্ট ভাসমান জলজ উদ্ভিদ দেয়া প্রয়োজন। এদের আঠালো ডিম যাতে সহজে আটকে থাকতে পারে সেজন্য কিছু পাথর (যার উপরিতল সমতল) স্থাপন করা আবশ্যক। প্রজননের উদ্দেশ্যে প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামে প্রজনন উপযোগী তিন জোড়া (কমপক্ষে) মাছ ছাড়তে হবে। এর মধ্যে একজোড়া জুটি বাঁধলে অন্যদের দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। স্ত্রীরা ডিম পাড়ার পর স্ত্রীদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে যাতে পুরুষেরা ডিমগুলিকে সহজেই নিষিক্ত করতে পারে। নিষেকের পর পুরুষকেও অন্য এ্যাকুয়ারিয়ামে স্থানান্তর করতে হবে যাতে সে ডিমের কোন ক্ষতি করতে না পারে।
এই পদ্ধতিতে একটি স্ত্রী মাছ থেকে ২০০টি পর্যন্ত ডিম পাওয়া যেতে পারে। যাই হোক ডিম ফুটে বাচ্চা রের হতে ৪৮-৭২ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। বাচ্চাদের আণুবীক্ষণিক কীট (microworm) যেমন ব্রাইন শ্রিম্পের লার্ভা নিওপ্লি (brine shrimp nauplii) ইত্যাদি সরবরাহ করতে হয়। প্রজননে অংশ নেয়া মা-বাবাকে বিশেষ যত্নে (উন্নত খাবার ও পরিবেশে) রাখলে পরবর্তী দুই সপ্তার মধ্যেই আবারো প্রজননে অংশ নেয়ার উপযোগী হয়।

উপযোগী পরিবেশ (Suitable Environment)
স্বাদুপানির এই মাছ জলাশয়ের তলদেশের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে।
প্রকৃতিতে এই মাছের অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে- পিএইচ (pH): ৬.৫-৮, হার্ডনেস (Hardness): সর্বোচ্চ ২৫ dH, এবং তাপমাত্রা: ১৮-২৩ ডি.সে. (Fishbase, 2014)।
Brough and Roche (2014) অনুসারে এদের জন্য আদর্শ এ্যাকুয়ারিয়ামের পানি ধারণ ক্ষমতা সর্বনিম্ন ১১৪ লিটার, তলদেশ বালুময়, আলোর মাত্রা স্বাভাবিক, তাপমাত্রা ২২.২-২৯ ডিগ্রি সে. (প্রজননের সময় ২৪-২৫ ডিগ্রি সে.), হার্ডনেস (Hardness): ৩-২০ dGH, পিএইচ ৬.৫-৮, পানির ধরণ স্বাদুপানি (তবে সামান্য লবণাক্ত জলও সহ্য করতে পারে) ও পানি প্রবাহের ব্যবস্থা থাকা ভাল।
Seriouslyfish (2014) অনুসারে এক জোড়া মাছের জন্য এ্যাকুয়ারিয়ামের আকার ১২০x৩০ সেমি। পিএইচ (pH): ৬.৫-৮, হার্ডনেস (Hardness): ৯০-৪৪৭ পিপিএম (ppm) এবং তাপমাত্রা: ২২-২৮ ডি.সে.। জলজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে ছায়ার ব্যবস্থা করা ভাল।
Aquaticcommunity (2014) অনুসারে এদের উপযোগী এ্যাকুয়ারিয়ামের পানি ধরণ ক্ষমতা কমপক্ষে ১২০ লিটার, তাপমাত্রা ২২-৩০ ডি.সে., হার্ডনেস ২৫° dGH, এবং পিএইচ ৬.৫-৮। এ্যাকুয়ারিয়ামের তলদেশ বালি ও নুড়ি পাথর সমৃদ্ধ হলে ভাল। এরা জলজ উদ্ভিদ বিশেষত ভাসমান জলজ উদ্ভিদ পছন্দ করে।
প্রজনন ঋতু ছাড়া অন্যান্য সময় এরা ততটা আক্রমণাত্মক নয়। তবে একই এ্যাকুয়ারিয়ামে ছোট আকারের মাছের সাথে না রাখাই ভাল।

রোগ (Diseases)
বাংলাদেশে এই মাছে র রোগের উপস্থিতি বিষয়ক কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic importance)
শক্ত প্রকৃতির এই মাছের ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ায় যারা এ্যাকুয়ারিয়ামে বাহারি মাছ পালন শুরু করতে আগ্রহী তারা এই মাছ নির্বাচন করতে পারেন নিশ্চিতভাবেই।
সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে এই মাছের কৃত্রিম প্রজনন হয়ে থাকে এবং উৎপাদিত মাছ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারা রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশেও এই মাছের প্রজনন করানো সম্ভব হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত পোনা বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে এই মাছ ব্যবহার করার সুযোগ ও সম্ভাবনা উভয়ই রয়েছে।

 

তথ্য সূত্র (References)

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply