ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | মাৎস্য চাষ | স্বাদুপানি

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে গলদা চাষের সম্ভাবনা

সহলেখক: মুহাম্মদ জাকির হোসেন, এ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম এন্ড নিউট্রিশন প্রকল্প, ওয়ার্ল্ডফিস-বাংলাদেশ, বরিশাল

মিঠা পানির গলদা (Macrobrachium rosenbergii)

মিঠা পানির গলদা (Macrobrachium rosenbergii)

ভূমিকা:
বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদে মিঠা পানির গলদা (Macrobrachium rosenbergii) গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বাগদার পাশাপাশি গলদাও রফতানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এর মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দরিদ্রতা দূরীকরণে গলদা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রচুর সম্ভাবনা থাকার পরেও কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বড় একটি অংশ এখনো গলদা চাষের বাইরে। সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে এসব অঞ্চল খুব সহজেই গলদা চাষের আওতায় আসবে। এতে দেশে মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও বড় মাধ্যম হতে পারে গলদা।

বাংলাদেশে গলদা চাষের ইতিহাস:
আমাদের দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ১৯৮৬ সালে সর্বপ্রথম কক্সবাজার জেলায় গলদা চিংড়ি হ্যাচারি স্থাপন করা হয়। তারপর ১৯৯৫ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক (Brac Bangladesh) এর উদ্যোগে যশোরে গলদা চিংড়ির হ্যাচারি স্থাপন করা হয়। এছাড়াও অনেক স্থানীয় উদ্যোক্তার মাধ্যমে গলদা চিংড়ির হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা পায়। মূলত: কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরে এর ব্যাপ্তি লাভ করতে থাকে। কিন্তু ২০০০ সালে সরকারীভাবে গলদা চিংড়ির প্রাকৃতিক উৎসের পোনা আহরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর হ্যাচারিগুলোর উপর পোনার চাহিদার চাপ বাড়তে থাকে। এর ফলে নতুন নতুন এলাকায় যেমন নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী পাবনা অঞ্চলে বেশ কিছু গলদা হ্যাচারির বিস্তার লাভ করে। ২০০৪ সালে ড্যানিডার (Danida Bangladesh) কারিগরি সহায়তায় বরিশাল অঞ্চলে বিশেষ করে পটুয়াখালীতে ৩টি গলদা চিংড়ি হ্যাচারি তার কার্যক্রম শুরু করে। আস্তে আস্তে গলদা পিএল এর চাহিদা বাড়তে থাকলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে আরও ৯ টি গলদা হ্যাচারি প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০০৯ সালে গলদা চিংড়ি উৎপাদনে সারা দেশে বিপর্যয় নেমে আসলে অধিকাংশ হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বরিশাল অঞ্চলে ১২ টি গলদা চিংড়ি হ্যাচারি আছে যার মধ্যে ৭ টি চলমান এবং ৫ টি বন্ধ আছে। বর্তমানে সারা দেশে ৮২ টি গলদা চিংড়ির হ্যাচারি আছে যার মধ্যে ২০১৩ সালে ২৫ টি ও ২০১৪ সালে ২৩ টি হ্যাচারির উৎপাদন অব্যাহত ছিল।

ওয়ার্ল্ডফিসের (WorldFish Bangladesh) উদ্যোগ:
এরই ধারাবাহিকতায় ওয়ার্ল্ডফিস-বাংলাদেশের গবেষণা দল এই বিপর্যয়ের কারণ ও সমস্যা চিহ্নিত করণে কাজ শুরু করেন। গবেষণা লব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের শুরুর দিকে পরীক্ষামূলক ভাবে ২ টি হ্যাচারি নিয়ে কাজ শুরু করে ও নতুন কিছু কারিগরি পরামর্শ অনুসরণ করে উৎপাদনে সফলতা অর্জন করে।
২০১৪ সালে ওয়ার্ল্ডফিস তার গলদা হ্যাচারি কার্যক্রম শুরু করার আগে হ্যাচারি মালিক ও টেকনিশিয়ানদের নিয়ে খুলনাতে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে এবং এখানে নতুন নতুন কারিগরি বিষয় ও বিশেষ করে জৈব-নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ওয়ার্ল্ডফিস ২০১৪ সালে খুলনা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীতে মোট ৫ টি হ্যাচারিকে এই সহযোগিতার আওতায় নিয়ে আসে, যার মধ্যে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় অবস্থিত আলীপুর গলদা হ্যাচারি লি: নামের একটি হ্যাচারিকেও সংযুক্ত করা হয়। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ও ওয়ার্ল্ডফিস এর নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের ফলে এই হ্যাচারিতে পিএল উৎপাদন ভাল হয়।

বরিশাল অঞ্চলে গলদা হ্যাচারি ও চাষ সম্ভাবনা:
বৃহত্তর খুলনা বাগেরহাট অঞ্চলে যেভাবে গলদা চিংড়ির হ্যাচারি প্রসার লাভ করেছিল ১৯৯০ সাল থেকে বরিশাল অঞ্চলে সেভাবে প্রসার লাভ করেনি। কিছু হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা হলেও অবকাঠামো দিক দিয়ে সেগুলো অত্যন্ত নাজুক ছিল এর পেছনে মূল কারণ ছিল হ্যাচারি মালিকদের পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানের অভাব, ভাল টেকনিশিয়ানের স্বল্পতা ইত্যাদি যা গলদা পিএল উৎপাদনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে আছে। যে কারণে বড় কোন উৎপাদন বিপর্যয় ঘটলে তা সামলে নেয়ার ক্ষমতা অনেক হ্যাচারি অর্জন করতে পারেনি।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হ্যাচারিতে উৎপাদন যখন বিপর্যয়ের মুখে, ঠিক তখন বরিশাল অঞ্চলের ৪-৫ টি হ্যাচারি তাদের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে বিশেষ সফলতা দেখিয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল এ অঞ্চলের আবহাওয়া, ভাল পানির উৎস, ভাল ব্রুড মাছের প্রাপ্যতা, হ্যাচারি টেকনিশিয়ানদের দক্ষতা ও সর্বোপরি ওয়ার্ল্ডফিস এর কারিগরি পরামর্শ ও হ্যাচারি মালিকদের আন্তরিকতা। শুধুমাত্র কয়েকটি বিষয়ের উপর বিশেষ নজর দিলেই যেমন জৈব-নিরাপত্তা, পানি, ব্রুড, রাসায়নিক এর সুষ্ঠু ব্যাবহার ও সর্বোপরি আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এ অঞ্চলের গলদা উৎপাদন অনেক বাড়িয়ে দেবে।

বরিশাল অঞ্চল শুধু হ্যাচারি নয় বরং গলদা চাষেরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলের আবহাওয়া, পানি, তাপমাত্রা, খাবার গলদা চাষে বিশেষ উপযোগী। এ অঞ্চলের পটুয়াখালী, ভোলা, কুয়াকাটার উপকূলীয় এলাকায় গলদা চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। গলদা মিঠা পানির হলেও ১২ পিপিটি লবণাক্ত পানিতে এর ফলন ভাল হয় উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার ভাটার প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকার কারণে এ অঞ্চলের পানি গলদা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। গলদা চাষের আদর্শ তাপমাত্রা ২৮-২৩০ সে.। এ অঞ্চলে অধিকাংশ সময়ে এই তাপমাত্রা থাকে যা গলদা চাষের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার নদী-সাগরে অনেক অবাঞ্ছিত মাছ পাওয়া যায় যা দামে খুব সস্তা ফলে চাষিরা খুব সহজেই খাদ্য তৈরি করতে পারে। এর ফলে কম খাবার খরচে অধিক উৎপাদন সম্ভব হবে।

অপরিকল্পিত চাষ পদ্ধতি ও চাষিদের কারিগরি জ্ঞানের অভাবে এ অঞ্চলে গলদার কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে চাষিরা না বুঝেই চাষ শুরু করে। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে চাষে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। কিন্তু গলদা চাষ সম্পর্কে তাদের একটু সচেতন, কারিগরি পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে এ অঞ্চলের গলদা উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। বৃহত্তর বরিশাল এলাকা হতে পারে বাংলাদেশের চিংড়ির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন অঞ্চল।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
লেখাটিতে প্রয়োজনীয় সম্পাদনার কাজটি নিখুঁতভাবে করে দিয়েছেন মি. সুকুমার ও মোঃ আবু নাঈম। তাদের প্রতি লেখক ও সহলেখক বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

 

Visitors' Opinion

লেখক

এ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম এন্ড নিউট্রিশন প্রকল্প, ওয়ার্ল্ডফিস-বাংলাদেশ, বরিশালে কর্মরত এই লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিজ্ঞান (মৎস্য) বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। এছাড়াও তার ব্রাক ও আরএফএলডিসি এর মৎস্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। More Info

Leave a Reply