ক্যাটাগরি: প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ | মাৎস্য প্রযুক্তি

বাংলাদেশের মৎস্যজাত পণ্য চ্যাপা শুঁটকি: সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদন ও গুণগতমান

চ্যাপা উৎপাদনের জন্য মাটির হাড়িতে সাজানো পুঁটি মাছের শুঁটকি

চ্যাপা উৎপাদনের জন্য মাটির হাড়িতে সাজানো পুঁটি মাছের শুঁটকি

বাঙালীর রসনা বিলাসে শুঁটকি মাছের জুড়ি নেই। আর তা যদি হয় দেশী জাতের ছোট মাছের শুঁটকি তাহলে তো কথাই নেই। সাধারণত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। দেশী জাতের মাছের শুঁটকি সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সনাতন পদ্ধতিতে মাছ প্রক্রিয়াকরণ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সাধারণত এসব শুঁটকি মাছ দিয়েই চ্যাপা শুঁটকি নামক বিশেষ একটি মৎস্যপণ্য উৎপাদন করা হয়। একে আবার আধা-গাঁজনকৃত মৎস্যপণ্যও বলা হয়ে থাকে কারণ এ পণ্য প্রস্তুত প্রণালীতে চূড়ান্তভাবে গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না এবং চূড়ান্ত পণ্যটি আধা-কঠিন কাঠামো প্রাপ্ত হয়। এর প্রস্তুতপ্রণালিটাও বৈচিত্র্যময়। সবার পক্ষে তা তৈরি করা সম্ভব হয়না। কেবলমাত্র জেলে সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার বংশ পরম্পরায় চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করে থাকেন। পুঁটি মাছের শুঁটকি এ পণ্য উৎপাদনের মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। এটি সনাতন পদ্ধতির গাঁজন প্রক্রিয়া দ্বারা প্রস্তুত করা হয় এবং এটি তৈরিতে তেমন কোন প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না এবং এর উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম লাগে। চ্যাপা শুঁটকি আমিষের একটি সহজলভ্য উৎস এবং আমাদের দেশের অনেকেই এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত স্বাদ এবং গন্ধের জন্য একে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। চেপা শুঁটকি আমাদের দেশের খাদ্য সংস্কৃতির একান্ত নিজস্ব অংশ। Alam (2007) অনুসারে অনেকে এর বিশেষ গন্ধের জন্য খেতে অনীহা প্রকাশ করে কিন্তু এই উৎকট গন্ধকে অতিক্রম করে একবার মুখে পুরতে পারলে পাগলপারা স্বাদের কারণে কট্টর শুঁটকি-বিমুখ নিরাসক্ত মানুষও চ্যাপার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। চ্যাপা শুঁটকির ভোক্তাকে আকৃষ্ট করার যাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশে অন্য কোন খাবারের প্রতি মানুষের এতটা আসক্তি চোখে পড়ে না। এছাড়াও বাংলাদেশের ছোট মাছ বিশেষ করে পুঁটি মাছ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আধা-গাজন পদ্ধতি যুগ যুগ ধরে ব্যাবহার হয়ে আসছে। মাছের মৌসুম নয় এমন সময়কালে ও অর্থনৈতিকভাবে আকালে বা মঙ্গার দিনে আমিষের অভাব পূরণে সুস্বাদু এ মৎস্য পণ্য বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে।

চ্যাপা শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন- চ্যাপা, চ্যাপা শুঁটকি, সিধল বা সিদঈল, হিদল (আঞ্চলিক নাম ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা অঞ্চল), ব্যারমা (পার্বত্য অঞ্চলে)। এটি ইংরেজি শব্দ Semi-fermented fish নামে বহির্বিশ্বে পরিচিত। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব, মধ্য ও পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এসব মৎস্য পণ্য (গাঁজন, আধা-গাঁজন) উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত। সাধারণত বৃহত্তর ময়মনসিংহ, বৃহত্তর সিলেট-কুমিল্লা, বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর ও পাহাড়ি জেলাসমূহের অধিবাসীদের কাছে চ্যাপা শুঁটকি অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রাচীনকাল থেকেই চ্যাপা উৎপাদনের প্রধান এলাকা যথা- বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা অঞ্চলের হাওর-বাঁওড় ও নিচু জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে পুঁটিমাছ ধরা পড়ে। এছাড়াও মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকা, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদন, মোহনগঞ্জ ও কলমাকান্দার বিস্তীর্ণ এলাকা মূলত হাওরাঞ্চল, কুলিয়ারচর ও মোহনগঞ্জের জলমহাল ও মৎস্য অবতরণ স্থান এবং কুমিল্লার নদী অববাহিকা এলাকায় সুপ্রাচীন কাল থেকে চ্যাপা শুঁটকি তৈরি হয়ে আসছে। Muzaddadi and Mahanta (2012) এর বর্ণনা অনুসারে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যসমূহে এ মৎস্য পণ্য ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করা যায় এমন মৎস্য প্রজাতি সমূহ:
চ্যাপা শুঁটকির জন্য উত্তম প্রজাতি হচ্ছে পুঁটি বা জাঁত পুঁটি। এটি মাঝারি আকারের মাংসল, পরিপুষ্ট ও লম্বাকৃতির মাছ যা দিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট মানের চ্যাপা শুঁটকি তৈরি হয়। এছাড়া তিঁত পুঁটিও চ্যাপা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় তবে তিঁত পুঁটি অপেক্ষাকৃত চ্যাপ্টা, পাতলা ও কম মাংসল বলে উৎপাদিত চ্যাপা শুঁটকির গুণগতমানে ব্যাপক পার্থক্য বুঝা যায়। আবার অনেকে ছোট আকারের থাই রাজপুঁটি দিয়ে চ্যাপা তৈরি করে কিন্তু এ মাছটি অপেক্ষাকৃত চওড়া, বক্ষদেশ প্রশস্ত এবং মাংস কাঁটাযুক্ত ফলে এর স্বাদ আমাদের দেশীয় জাঁত পুঁটির মত হয়না। এছাড়া আশুগঞ্জ এলাকায় সামুদ্রিক ফাইস্যা ও অন্যান্য কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ দিয়েও চ্যাপার মত গাঁজনকৃত শুঁটকি তৈরি করা হয় কিন্তু এর স্বাদ ও গন্ধ জাঁত পুঁটির চ্যাপা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

বাংলাদেশে বেশ কয়েক প্রজাতির পুঁটিমাছ রয়েছে যেগুলো চ্যাপা শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। যথা-

  • পুঁটি বা জাঁত পুঁটি (Puntius stigma)
  • তিত পুঁটি (Puntius ticto)
  • সরপুঁটি (Puntius sarana)

এছাড়াও অন্যান্য প্রজাতির মাছ দিয়েও এ পণ্য তৈরি করা যায়, যেমন-

  • জাল পুঁটি বা ভাদি পুঁটি, Spot-fin swamp barb, Puntuis sophora
  • ফাঁসা, Gangetic hairfin anchovy, Setipinna phasa
  • তেলি ফাঁসা, Scaly hairfin anchovy, Setipinna taty
  • চাপিলা বা খয়রা, Indian River shad, Gudusia chapra
  • কটি ইলিশ, Coromandel ilisha, Ilisha filigera

 

চ্যাপা শুঁটকি তৈরির প্রচলিত পদ্ধতি:
শীতকালে যখন জলাশয়ের পানি কমে এসে প্রচুর পুঁটি মাছ ধরা পড়ে তখন মাছ শুকিয়ে প্রথমে শুঁটকি করা হয় এবং পরে আংশিক গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করা হয়। তাই চ্যাপা শুঁটকি উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে মাছ শুঁটকিকরণ প্রক্রিয়া। নিচে চ্যাপা শুঁটকি উৎপাদনের প্রচলিত পদ্ধতির ধাপগুলো দেখানো হল:

  • মাছ শুঁটকিকরণ
    • ধাপ-১ পুঁটিমাছ সংগ্রহ
    • ধাপ-২ মাছ কাটাই-বাছাই
    • ধাপ-৩ মাছ পরিষ্কার করা
    • ধাপ-৪ রোদে মাছ শুকানো
    • ধাপ-৫ শুঁটকি মাছ বাছাই
    • ধাপ-৬ শুঁটকি মাছ সংরক্ষণ
  • আংশিক গাঁজন
    • ধাপ-৭ পুঁটি শুঁটকি সংগ্রহ:
    • ধাপ-৮ বাঁশের মাচা বা ঘরের চালায় শুঁটকি শুকানো
    • ধাপ-৯ মাটির হাড়ি বা মটকা তেল দিয়ে ভেজানো
    • ধাপ-১০ শুঁটকি ধৌতকরণ
    • ধাপ-১১ মাটির হাড়ি মাটিতে পোতা
    • ধাপ-১২ ভেজানো শুঁটকি হাড়িতে ভরা
    • ধাপ-১৩ হাড়ির মুখ বায়ুরোধীভাবে বন্ধ করা
    • ধাপ-১৪ গাuজন প্রক্রিয়ার জন্য হাড়ি সংরক্ষণ
    • ধাপ-১৫ চূড়ান্ত পণ্য
পুঁটিমাছ সংগ্রহ

পুঁটিমাছ সংগ্রহ

ধাপ-১ পুঁটিমাছ সংগ্রহ
জলমহাল, খাল-বিলে ধরা পড়া ছোট মাছ সমূহ থেকে পুঁটি মাছ আলাদা করা হয়। সেগুলো শুঁটকির চাতালে নিয়ে আশা হয় বাছাই ও কাটাই করার জন্য।

 

 

 

 

মাছ কাটাই-বাছাই

মাছ কাটাই-বাছাই

ধাপ-২ মাছ কাটাই-বাছাই
সাধারণত নারী শ্রমিকরা আকার ও ভৌত অবস্থার উপর ভিত্তিক করে কাটাই-বাছাই এর কাজটি করে থাকে। চাতালের মালিকরা মৌসুম-ভিত্তিক এসব নারী শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

 

 

 

 

মাছ পরিষ্কার করা

মাছ পরিষ্কার করা

ধাপ-৩ মাছ পরিষ্কার করা
কাটাই বাছাইয়ের পর মাছগুলোকে লবণ দিয়ে মাখিয়ে রাখা হয় তারপর পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। সাধারণত দুটি বিশেষ কারণে লবণ দিয়ে মাছ শুঁটকি করা হয়ে থাকে তা হল- এক. লবণ মাছের শরীরের বাড়তি জলীয় অংশ দুর করতে সহায়তা করে এবং দুই. মাছি ও অন্যান্য কীট-পতঙ্গের আক্রমণকে দমিত করে। আবার অনেকে লবণ ব্যাবহার না করেও শুঁটকি করে থাকে। সাধারণত চাতালের মালিকরা দুই ধরণের শুঁটকি তৈরি করে যথা- এক. লবণ দেয়া পুঁটি শুঁটকি ও দুই. লবণ ছাড়া পুঁটি শুঁটকি। এই দুই ধরণের শুঁটকির মধ্য দামেও ভিন্নতা থাকে। বিশেষ করে লবণ ছাড়া পুঁটি শুঁটকির দাম তুলনামূলক লবণ দেয়া শুঁটকির চেয়ে বেশী।

 

রোদে মাছ শুকানো

রোদে মাছ শুকানো

ধাপ-৪ রোদে মাছ শুকানো
প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত খোলা মাঠে বাঁশের তৈরি চাটাইয়ের উপর মাছ শুকিয়ে থাকে। আবার বাঁশের তৈরি মাচার উপরও মাছ শুঁটকি করার জন্য দেওয়া যায়। এভাবে মাছ শুঁকাতে ৩-৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।

 

 

 

 

শুঁটকি মাছ বাছাই

শুঁটকি মাছ বাছাই

ধাপ-৫ শুঁটকি মাছ বাছাই
চার থেকে পাঁচ দিন পর শুঁটকি মাছগুলোকে বাড়ির আঙ্গিনা বা ছায়া-যুক্ত স্থানে রেখে বাছাই করা হয়। বিশেষ করে তুলনামূলক ভাবে বড় আকারের শুঁটকিগুলো বাছাই করে রাখা হয় চ্যাপা শুঁটকি প্রস্তুত করার কাজে। চ্যাপা শুঁটকি উৎপাদনকারীরা চাতালের মালিকদের কাছ থেকে বড় মাপের শুঁটকিগুলো তুলনামূলক বেশী দাম দিয়ে কেনে।

 

 

 

শুঁটকি মাছ সংরক্ষণ

শুঁটকি মাছ সংরক্ষণ

ধাপ-৬ শুঁটকি মাছ সংরক্ষণ
শুঁটকিমাছ আকার অনুসারে বাছাই করার পরে একটি বাঁশের তৈরি মাচার উপর শুঁটকি মাছগুলো রেখে একটি চাটাই দিয়ে ঢেকে রেখে সংরক্ষণ করা হয় কিন্তু এভাবে সর্বোচ্চ সাত দিনের বেশী সংরক্ষণ করা যায় না। বেশী দিন সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বেড়-এ বা প্লাস্টিকের ড্রামে শুঁটকি রেখে শুষ্ক স্থানে রাখতে হয়।

 

 

 

পুঁটি শুঁটকি সংগ্রহ

পুঁটি শুঁটকি সংগ্রহ

ধাপ-৭ পুঁটি শুঁটকি সংগ্রহ
চ্যাপা শুঁটকি প্রস্তুতকারীরা শুঁটকির চাতাল মালিকদের কাছ থেকে শুঁটকি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। সাধারণত চাতাল মালিকরা শুকনো পুঁটি চটের বস্তায় সংরক্ষণ করে।

 

 

 

 

বাঁশের চাটাই বা ঘরের চালায় শুঁটকি শুকানো

বাঁশের চাটাই (নীচের চিত্র) বা ঘরের চালায় (উপরের চিত্র) শুঁটকি শুকানো

ধাপ-৮ বাঁশের চাটাই বা ঘরের চালায় শুঁটকি শুকানো
পুনরায় তারা এ শুঁটকি বাছাই করে বাঁশের মাচা বা ঘরের চালে চাঁটাই বিছিয়ে রোদে ফেলে রাখে। এই সময়ে শীতের কুয়াশায় শুঁটকিগুলো শিশিরে সারা রাত ধরে ভিজে আর দিনে সূর্যের আলোতে সেগুলো শুকায়। এভাবে ১৫-২০ দিন ধরে এ প্রক্রিয়া চলে। চ্যাপা শুঁটকি প্রস্তুতকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে শীতকালের কুয়াশা শুকনো পুঁটি মাছগুলোকে গাঁজনের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।

 

 

মাটির হাড়ি বা মটকা তেল দিয়ে ভেজানো

মাটির হাড়ি বা মটকা তেল দিয়ে ভেজানো

ধাপ-৯ মাটির হাড়ি বা মটকা তেল দিয়ে ভেজানো
এই সময়ের মধ্যে চ্যাপা শুঁটকি প্রস্তুতকারীরা পুঁটি মাছ থেকে সংগৃহীত তেল দিয়ে মাটির হাড়িগুলোর ভিতরের দিকটা একটি সুতির কাপড় দিয়ে বার বার ভিজিয়ে দেয় এবং রোদে ফেলে রাখে। মাটির হাড়িগুলো এমনভাবে ভিজাতে হয় যেন ভেতর থেকে তেল চুষতে চুষতে মাটির হাড়ির বাইরে থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

 

 

 

শুঁটকি ধৌতকরণ

শুঁটকি ধৌতকরণ

ধাপ-১০ শুঁটকি ধৌতকরণ
মাটির হাড়ি প্রস্তুত হয়ে গেলে পুঁটি শুঁটকিগুলো পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে একটি পরিষ্কার পাটির উপর ১০-১২ ঘণ্টা রেখে দিতে হয়। এসময় শুঁটকিগুলো পানির আর্দ্রতা শোষণ করে নরম হয়ে উঠে। হাতের আঙ্গুলের মাধ্যমে চাপ দিয়ে এটি পরীক্ষা করা হয় এবং আঙ্গুলে চট-চটে ভাব অনুভূত হয়। গাজন প্রক্রিয়া এই অবস্থার উপর বহুলাংশে নির্ভর করে।

 

 

মাটির হাড়ি মাটিতে পোতা

মাটির হাড়ি মাটিতে পোতা

ধাপ-১১ মাটির হাড়ি মাটিতে পোতা
এরপর তেলে ভেজানো মাটির হাড়িগুলোকে মাটিতে গর্ত করে এমনভাবে পোতা হয় যেন হাড়ির মুখটা মাটির সমান্তরাল থাকে এবং নড়াচড়া না করে। এভাবে মাটিতে পোতার উদ্দেশ্য হল ভেজানো শুঁটকিগুলো যেন ভালভাবে হাড়ির মধ্যে উপযুক্ত চাপ দিয়ে ভরা যায় আর হাড়ি যেন একেবারেই নড়াচড়া না করে।

 

 

 

ভেজানো শুঁটকি হাড়িতে ভরা

ভেজানো শুঁটকি হাড়িতে ভরা

ধাপ-১২ ভেজানো শুঁটকি হাড়িতে ভরা
এ ধাপে শুঁটকিগুলো হাড়িতে চাপ দিয়ে ভরা হয়। সাধারণত চ্যাপা শুঁটকি প্রস্তুতকারীরা এসময় পা দিয়ে শুঁটকিগুলোকে মাটির হাড়ির ভেতর ধাপে ধাপে চাপ দিয়ে পূর্ণ করে এবং এভাবে চাপ দেওয়ার ফলে শুঁটকিগুলো এক অপরের সাথে লেগে থাকে।

 

 

 

হাড়ির মুখ বায়ুরোধীভাবে বন্ধ করা

হাড়ির মুখ বায়ুরোধীভাবে বন্ধ করা

ধাপ-১৩ হাড়ির মুখ বায়ুরোধীভাবে বন্ধ করা
মাটির হাড়ি শুঁটকি মাছ দিয়ে সম্পূর্ণ ভর্তি করার পর হাড়িগুলো মাটির ভেতর থেকে তুলে আনা হয় এবং কিছু শুঁটকি চূর্ণ করে পুঁটি মাছের তেল দিয়ে পেস্ট তৈরি করে হাড়ির মুখের বাকি অংশে দিয়ে দেয়া হয়। এরপর শুকনো মাটি গুড়ো করে পানি দিয়ে কাই তেরি করে হাড়ির মুখ এমনভাবে আটকে দেয়া হয় যাতে ভেতরের বাতাস বাইরে এবং বাইরের বাতাস ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

 

 

গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্য হাড়ি সংরক্ষণ

গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্য হাড়ি সংরক্ষণ

ধাপ-১৪ গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্য হাড়ি সংরক্ষণ
হাড়ির মুখ ভালভাবে আটকে দেয়ার পর শুঁটকি-পূর্ণ হাড়িগুলো একটি শুষ্ক ছায়া যুক্ত ঘরে ৩-৬ মাস রেখে দিতে হয়। এ ধরণের গাuজন প্রক্রিয়াকে বায়ু-বিহীন গাঁজন বা এনএ্যারোবিক ফার্মেন্টেশন (anaerobic fermentation) বলা হয়।

 

 

 

বাংলাদেশের মৎস্যজাত পণ্য চ্যাপা শুঁটকি

বাংলাদেশের মৎস্যজাত পণ্য চ্যাপা শুঁটকি

ধাপ-১৫ চূড়ান্ত পণ্য
তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং চ্যাপা শুঁটকি বাজারজাত করার উপযোগী হয়।

 

 

 

 

সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদিত চ্যাপা শুঁটকির পুষ্টিমান:
চ্যাপা শুঁটকি প্রোটিন ও খনিজ-লবণ এর একটি সমৃদ্ধ উৎস এবং এটি সুষম এ্যামাইনো এসিড বহন করে যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে কম-বেশী স্থিতিশীল লিপিড রয়েছে যার কোন মিউটাজেনিক ক্রিয়া নেই এবং গুণগত মান মানব স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে নানাবিধ রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। নিম্নের সারণীতে Nayeem et al. (2010) অনুসারে বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ভ্যালুচেইন থেকে সংগৃহীত চ্যাপা শুঁটকির নমুনার রাসায়নিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হল।

ভ্যালুচেইন আর্দ্রতা (%) আমিষ (%) চর্বি (%) খনিজ-লবণ (%) টিভিবি-এন (মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম
উৎপাদনকারী ৩৯.৬২ ৩৩.৮৩ (৬৫.৭৫) ২৪.৯৭ (৪১.৮৮) ০.৮১ (১.৩৮) ১.১২
পাইকার বিক্রেতা ৪২.৭৯ ৩২.৭৮ (৫৮.২৬) ২২.৪৭ (৩৯.৯৩) ১.০১ (১.৭৯) ২.১৮
খুচরা বিক্রেতা ৪৬.৮৫ ৩২.৪৬ (৬১.৭১) ১৯.২৫ (৩৬.৫৯) ০.৮৯ (১.৬৯) ৩.১২

উপরস্থ সারণীতে প্রথম বন্ধনী মধ্যে উপস্থাপন-কৃত মানসমূহ শুষ্ক ওজনের শতকরা হার নির্দেশ করে। অন্যান্য মানসমূহ মোট ওজনের শতকরা হার নির্দেশ করে।

সারণী থেকে লক্ষ্য করা যায় যে, চ্যাপা শুঁটকি উৎপাদনকারী হতে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এর পুষ্টিমান ধীরে ধীরে কমে যায়। সাধারণত এটি নির্ভর করে এর সংরক্ষণকালের উপর। সংরক্ষণের সময় যত বাড়বে পণ্যের পুষ্টিমান তত কমবে। সাধারণত সব ধরণের খাদ্য পণ্যেই এটি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও পণ্যে গুণগতমান এর কাঁচামাল ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর বহুলাংশে নির্ভর করে। Ahmed (1979) অনুসারে চ্যাপা শুঁটকি স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রায় সংরক্ষণের উনচল্লিশ দিন পর পণ্যের গুণগত মান কমে যায় ফলে বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতা হারাতে থাকে। আমাদের দেশে কালের পরিক্রমায় চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটেনি। এখনও সনাতন পদ্ধতিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এর কাঁচামাল পুঁটি শুঁটকি ও চ্যাপা শুঁটকি তৈরি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সাধারণত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এ পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকে এবং তারা বেশির ভাগই অশিক্ষিত হওয়ায় মৎস্য পণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকে না ফলে পণ্যে মান অত্যন্ত নিম্নমানের হয়।

নানা সংস্কৃতির বিলাসী খাদ্যের জনপ্রিয়তায় বাঙ্গালীর নিজস্ব খাদ্য-বৈচিত্র্য যখন হারিয়ে যেতে বসেছে তখনও চ্যাপা শুঁটকি আমাদের একান্ত নিজস্ব, আদি ও অকৃত্রিম রসনা-তুষ্ট খাবার হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে। কিন্তু নানা কারণে এ পণ্যের সঠিক বিকাশ ভালভাবে ঘটেনি । এছাড়াও এসব পণ্যের উৎপাদনকারীরা এর মাণ নিয়ন্ত্রণে সচেতন নয় ফলে এখনও তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসব মৎস্য পণ্য উৎপাদন করে থাকে। এছাড়া এ মৎস্য পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপের সাথে জড়িত অধিকাংশ মানুষই অক্ষর-জ্ঞানহীন ফলে মাণ-নিয়ন্ত্রণ করে পণ্য উৎপাদনের গুরুত্বের বিষয়টিতে তারা এখনও সচেতন হয়ে উঠতে পারিনা। বহুমাত্রিক গবেষণা, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য টেকসই ও লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়ন, সম্প্রসারণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের দেশের এসব ঐতিহ্যবাহী মৎস্য-পণ্যকে আরও উন্নত ও যুগোপযোগী করে তোলা সম্ভব।

 

তথ্যসূত্র (References)

  • Ahmed ATA, Mustafa G and Rahman HN (1979) Solar drying of silver jewfish, Johnius argentatus (Houttuyn) in polythene tent dryer. Bangladesh Journal of Boilogical Science 8 (1): 23-30
  • Alam AKMN (20007) Raptani samvabanamoy chapa shutki (In Bengali). Daily Itefaq. Dhaka, Bangladesh.
  • Muzaddadi AU and Mahanta P (2012) Effects of salt, sugar and starter culture on fermentation and sensory properties in Shidal (a fermented fish product). African Journal of Microbiology Research 7(13):1086-1097
  • Nayeem MA, Pervin K, Reza MS, Khan MNA, Islam MN and Kamal M (2010) Quality assessment of traditional semi-fermented fishery product (Chepa Shutki) of Bangladesh collected from the value chain. Bangladesh Research Publication Journal 4(1): 41 – 46.

 

আগামী পর্বে থাকবে উন্নত পদ্ধতিতে চ্যাপা শুঁটকির উৎপাদন: গুণগতমান বিশ্লেষণসহ। তারপরের পর্বে থাকবে বাংলাদেশের মৎস্যজাত পণ্য চ্যাপা শুঁটকি: বাজারজাতকরণ

 

Visitors' Opinion

লেখক

M.S In Fisheries Technology and B.Sc. Fisheries (Honours) from BAU. Now working as Research Assistant, WorldFish-Bangladesh and South Asia, Dhaka, Bangladesh. Contact: 01717063142, nayeem_officexp@yahoo.com

Leave a Reply