ক্যাটাগরি: বিদেশী মাছ | মাছ

বাংলাদেশের বিদেশী মাছ: টাইগার বার্ব, Tiger Barb, Puntigrus tetrazona

টাইগার বার্ব, Tiger Barb, Puntigrus tetrazona

টাইগার বার্ব, Tiger Barb, Puntigrus tetrazona

ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা ও বোর্নিওর স্থানীয় মাছ টাইগার বার্ব ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে আমাদের দেশে নিয়ে আসা হয়। দৈহিক সৌন্দর্য্য ও তুলনামূলক কম বাজারদরের কারণে আমাদের দেশে এই মাছের কদর দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিদেশী পুঁটি জাতীয় অন্যান্য বাহারি মাছের মধ্যে এরাই সবচেয়ে বেশী বর্ণিল ও আকর্ষণীয় (Thomas et al., 2003)।

শ্রেণী তাত্ত্বিক অবস্থান (Systematic position)
পর্ব: Chordata (chordates)
শ্রেণী: Actinopterygii (Ray-finned fishes)
বর্গ: Cypriniformes (Carps)
পরিবার: Cyprinidae (Minnows or carps)
গণ: Puntigrus
প্রজাতি: Puntigrus tetrazona

নামের শব্দতত্ত্ব (Etymology)
Puntigrus শব্দটি দুটি শব্দ যথা Puntius এবং tigrus এর সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে tigrus শব্দটি ল্যাটিন শব্দ tigris থেকে এসেছে যার অর্থ বাঘ (tiger)। দেহে সোনালীর মাঝে কালো বর্ণের ডোরার উপস্থিতির জন্যই এমন নামকরণ করা হয়েছে (Froese and Pauly, 2015)।
গ্রিক শব্দ tettares অর্থ চার (four) এবং ল্যাটিন শব্দ zona অর্থ বলয় (zone) থেকে tetrazona শব্দটি এসেছে (Seriouslyfish, 2015)।
সোনালী দেহের উপর কালো ডোরার উপস্থিতির জন্য এর নাম হয়েছে টাইগার বার্ব (Tiger Barbs) যার বাংলা অর্থ বাঘ পুঁটি (James, 1981)।

সমনাম (Synonyms)
Barbus tetrazona (Bleeker, 1855)
Barbus tetrazona tetrazona (Bleeker, 1855)
Capoeta tetrazona Bleeker, 1855
Puntius tetrazona (Bleeker, 1855)
Systomus tetrazona (Bleeker, 1855)
Systomus sumatrensis Bleeker, 1860
Systomus sumatranus Bleeker, 1860

সাধারণ নাম (Common name)
বাংলা: টাইগার বার্ব, সুমাত্রা বার্ব
English: Tiger Barb, Sumatra barb, Partbelt barb

সংরক্ষণ অবস্থা (Conservation Status)
এই মাছের বৈশ্বিক সংরক্ষণ অবস্থা Not Evaluated অর্থাৎ এই মাছের সংরক্ষণ অবস্থা এখনও অমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে (IUCNRedList, 2015)।

বিস্তৃতি (Distribution)
এই মাছের ভৌগলিক বিস্তৃতি 6°N – 3°S, 95°E – 118°E। এরা ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা ও বোর্নিওর স্থানীয় মাছ হলেও এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে (Froese and Pauly, 2015)।

দৈহিক গঠন (Morphology)
আয়তকার দেহ পার্শ্বীয়ভাবে চাপা। কমলা বা সোনালী বর্ণের দেহের মাঝে উলম্বভাবে অবস্থিত কালো ডোরা (সাধারণত চারটি) উপস্থিত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোরার মাঝে গোলাকার কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়। বক্ষ ও শ্রোণী পাখনা উজ্জ্বল লাল, পৃষ্ঠ পাখনা লাল যার উপরের কালো দণ্ডকার দাগ উপস্থিত। পুচ্ছ পাখনা দ্বিবিভক্ত এবং লাল বর্ণের।
আদর্শ দৈর্ঘ্য, পুচ্ছ-খাঁজ দৈর্ঘ্য (Fork length), দেহ উচ্চতা, মাথার দৈর্ঘ্য এবং পুচ্ছ-দণ্ডের দৈর্ঘ্যে মোট দৈর্ঘ্যের যথাক্রমে ৭৭-৮০, ৮৪-৮৬, ৪৯-৫২, ২৫-২৬ ও ৭-৯ শতাংশ। অন্যদিকে চোখের ব্যস মাথার দৈর্ঘ্যের ৩০-৩১ শতাংশ (Galib and Mohsin, 2011)।

পাখনা সূত্র (Fin formula)
D. 10; P1. 7; P2. 6; A. 6; C. 16 (Galib and Mohsin, 2011)।

সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য (Maximum length)
সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য মোট দৈর্ঘ্যে ৭ সেমি (Froese and Pauly, 2015)।

স্বভাব ও আবাস্থল (Habit and Habitat)
এরা স্বাদুপানির মাছ এবং এরা তলদেশের নিকটবর্তী স্থানে থাকতে পছন্দ করে (Froese and Pauly, 2015)। এরা জলজ উদ্ভিদ বিশিষ্ট পরিস্কার জলের জলাশয়ে বালু ও বিভিন্ন আকারের নুড়ি সমৃদ্ধ তলদেশে থাকতে পছন্দ করে (Seriouslyfish, 2015)।

খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস (Food and feeding habit)
প্রকৃতিতে এরা সর্বভুক অর্থাৎ উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় ধরণের খাবারই খেয়ে থাকে (Fishlore, 2015)। কীট (worms), ছোট আকারের ক্রাশটেশিয়ানস (crustaceans) এবং উদ্ভিদের পচা গলা অংশ (plant matter) ইত্যাদি খেয়ে থাকে (Mills and Vevers, 1989)।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এরা ফ্লেকস (Flakes), ট্যাবলেট পিলেট (Tablet Pellet), জীবন্ত খাবার যেমন মাছ, চিংড়ি ও কীট ইত্যাদি খাবার হিসেবে দেয়া যায়। এছাড়াও সতেজ সবজি (Fresh vegetable) ও মাংস জাতীয় খাদ্য (Meaty Food) টুকরা করে সরবরাহ করলেও খেয়ে থাকে । দিনে একাধিক বার খাবার সরবরাহ করা যেতে পারে তবে সরবরাহকৃত খাবার যদি তিন মিনিটের মধ্যে খেয়ে শেষ না করে থাকে তবে নতুন করে খাবার সরবরাহ করার প্রয়োজন নেই (Brough and Brough, 2015) ।
প্রকৃতিতে এরা সর্বভুক তবে প্রধানত কীট, পতঙ্গ, প্রাণিকণা (zooplankton), উদ্ভিদাংশ ও গলা ও পচা জৈব উপাদান খেয়ে থাকে। এ্যাকুয়ারিয়ামে এরা জীবন্ত ও হিমায়িত উভয় প্রকারের খাবারই খেয়ে থাকে যার মধ্যে রয়েছে ব্লাডওয়ার্ম (bloodworm), ডাফনিয়া (Daphnia) ও আর্টেমিয়া (Artemia) অন্যতম (Seriouslyfish, 2015)।

জীবনকাল ও প্রজনন (Lifecycle and Breeding)
এদের জীবনকাল ৫ বছর। একই বয়সের স্ত্রীরা পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক বড় হয়ে থাকে অন্যদিকে পুরুষেরা স্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশী বর্ণিল হয়ে থাকে। পুরুষদের তুণ্ড লাল হয়ে থাকে যেখানে স্ত্রীদের এমনটি দেখতে পাওয়া যায় না (Thomas et al., 2003)। প্রজননের সময় এরা পূর্বরাগ (courtship) আচরণ প্রদর্শন করে (Bailey and Stanford, 1999)। এরা ডিমপাড়া মাছ এবং নিজেদের ডিম নিজেরাই খেয়ে থাকে। প্রকৃতিতে মায়েরা জলজ উদ্ভিদের পাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডিম পাড়ে।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের প্রজনন করানো সহজ নয় তবে সম্ভব। এরা মাত্র সাত সপ্তাহেই পরিণত হয়ে থাকে। এসময় এরা দৈর্ঘ্যে ৩-৪ ইঞ্চি হয়ে থাকে। পালনকৃত ঝাঁক থেকে উজ্জ্বল লাল তুণ্ড বিশিষ্ট পুরুষ এবং স্থূল দেহের স্ত্রী বাছাই করে প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামে স্থানান্তর করতে হবে। প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামের তাপমাত্রা ৭৪-৭৯° F বা ২৪-২৬° C, পিএইচ ৬.৫ এর উপরে ও হার্ডনেস ১০ dGH এর নীচে থাকা দরকার। এছাড়াও জলজ উদ্ভিদ ও নুড়ি পাথর স্থাপন করা প্রয়োজন। এদের মায়েরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডিম পাড়ে। মায়েরা সাধারণত ১-৩ দফায় ডিম দিয়ে থাকে। পরিণত মায়েরা ৭০০ বা ততোধিক ডিম ধারণ করলেও সর্বোচ্চ ৩০০ পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। মা ও বাবারা ডিম খেয়ে ফেলে বিধায় ডিম পাড়া ও নিষেকের পরপরই মা ও বাবা মাছগুলো আলাদা এ্যাকুয়ারিয়ামে সরিয়ে ফেলা আবশ্যক। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে এবং পাঁচ দিনের মধ্যে মুক্তভাবে সাঁতার কাটতে ও খাবার গ্রহণ করতে পারে (Brough and Brough, 2015)।
প্রকৃতিতে পনের মাসের কম সময়েই এদের জনতা দ্বিগুণ হয়ে থাকে (Froese and Pauly, 2015)।

টাইগার বার্ব এর ঝাঁক (School of Tiger Barbs)

টাইগার বার্ব, Tiger Barb, Puntigrus tetrazona

প্রকৃতির উপযুক্ত পরিবেশ (Suitable environment in nature)
প্রকৃতিতে এদের অনুকূল তাপমাত্রা ২০-২৬°C, হার্ডনেস ৫-১৯ dH, পিএইচ ৬-৮ (Froese and Pauly, 2015)।

এ্যাকুয়ারিয়ামের উপযুক্ত পরিবেশ (Suitable environment in aquarium)
এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের অনুকূল তাপমাত্রা ৬৮-৭৯° F বা ২০-২৬° C, হার্ডনেস ২-৩০ dGH, পিএইচ ৬.৫-৭.৫ (Brough and Brough, 2015) ।
এ্যাকুয়ারিয়ামের আকার কমপক্ষে ৮০x৩০ সেমি এবং এ্যাকুয়ারিয়ামের পানির অনুকূল তাপমাত্রা ২২-২৬°C, পিএইচ ৬-৮, হার্ডনেস ৩৬-৩৫৭ পিপিএম (Seriouslyfish, 2015)। এ্যাকুয়ারিয়ামে দলবদ্ধভাবে (৫ বা এর বেশি) লালন-পালন করা যায়। লম্বা পাখনার মাছের সাথে না রাখাই ভাল (Froese and Pauly, 2015)।

রোগ (Diseases)
বাংলাদেশে এই মাছের রোগ সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। প্রোটোজোয়া (protozoa), কীট (worms) ইত্যাদি সৃষ্ট সাদা দাগ রোগ (White spot Disease), ভেলভেট রোগ (Velvet Disease), ইকথাইওবোডো সংক্রমণ (Ichthyobodo Infection); ব্যাকটেরিয়া ঘটিত ফুলকা পচা রোগ (Fin-rot Disease) ইত্যাদি হতে পারে (EOL, 2015))।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic importance)
বাহারি মাছ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। বাহারি মৎস্য প্রেমীদের এই চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে এই মাছের প্রজনন করানো সম্ভব হলে দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উৎপাদিত পোনা বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

বাজার মূল্য:
বাংলাদেশে ৪০-৮০ টাকায় এক জোড়া টাইগার বার্ব পাওয়া যায় (Galib and Mohsin, 2011)।

 

তথ্য সূত্র (References)

  • Bailey M and Stanford G (1999) Practical Fishkeeping, published by Sebastian Kelly, 2 Rectory Road, Oxford OX4 IBW, 128 p.
  • Brough D and Brough C (2015) Tiger Barb. Downloaded on 07 May 2015 and from http://animal-world.com/encyclo/fresh/cyprinids/tigerbarb.php
  • EOL (2015) Puntius tetrazona, Tiger Barb. Downloaded on 10 May 2015 and from http://eol.org/pages/203992/details
  • Fishlore (2015) Tiger Barb – Puntius tetrazona. FishLore.com (Tropical Fish Information). Downloaded on 09 May 2015 and from http://www.fishlore.com/Profiles-TigerBarb.htm.
  • Froese R and Pauly D (Eds.) (2015) Puntigrus tetrazona (Bleeker, 1855), Sumatra barb. FishBase. World Wide Web electronic publication. Downloaded on 09 May 2015 and from http://www.fishbase.org/summary/4766
  • IUCNRedList (2015) The IUCN Red List of Threatened Species. Version 2014.3. Downloaded on 09 May 2015 and from http//www.iucnredlist.org.
  • Galib SM and Mohsin ABM (2011) Cultured and Ornamental Exotic Fishes of Bangladesh: Past and Present. LAP LAMBERT Academic Publishing. 176pp.
  • James DE (1981) Carolina’s Freshwater Aquarium Handbook, Carolina Biological Supply Company, Burlington, NC/Gladstone, OR, USA, pp. 10-20.
  • Mills D and Vevers G (1989) The Tetra encyclopedia of freshwater tropical aquarium fishes. Tetra Press, New Jersey, 208 p.
  • Seriouslyfish (2015) Species Profile: Puntius tetrazona (BLEEKER, 1855), Tiger Barb. Downloaded on 07 May 2015 and form http://www.seriouslyfish.com/species/puntius-tetrazona/
  • Thomas PC, Rath SC and Mohapatra KD (2003) Breeding and Seed Production of Fin Fish & Shell Fish (Foreword by Dr. T.V.R. Pillay), Daya Publishing House, Delhi 110035, India, 377 p.

 

English Feature:
Tiger Barb, Barbus tetrazona (Bleeker, 1855)

 

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply