ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ | স্বাদুপানি

আমুর কার্প: মাছচাষের সম্ভাবনাময় এক নতুন জাত

Amur, Cyprinus carpio haematopterus

Amur, Cyprinus carpio haematopterus

বিদেশী মাছ হিসেবে কমন কার্প (আমেরিকান রুই) এর বিভিন্ন জাত (স্কেল কার্প, লেদার কার্প, মিরর কার্প, হাঙ্গেরি কার্প) মৎস্য-প্রেমীদের কাছে আজ সুপরিচিত। সুস্বাদু হওয়ায় এর জনপ্রিয়তাও কম নয়। তবে এর অসুবিধে হল- এরা দ্রুত যৌন পরিপক্বতা পায় (ছয় মাসের কম সময়েই ডিম ধারণ করে), বাজার-যোগ্য আকার অর্জন করার আগেই মজুদ পুকুরে ডিম ছেড়ে ফেলার ফলে এর মজুদ ঘনত্ব বেড়ে যায় ফলে খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব হয়। যার ফলশ্রুতিতে সার্বিকভাবে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না পেয়ে চাষিরা এ মাছ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। অন্যদিকে এ মাছের দেহের খাবার-যোগ্য অংশের তুলনায় ডিম্বাশয় বা শুক্রাশয়ের অংশ তুলনামূলক বেশী (২০ শতাংশের অধিক) হওয়ায় মৎস্য ক্রেতাদের নিকট এর গ্রহণযোগ্যতা নিম্নমুখী হতে চলেছে। এসব সমস্যা সমাধান-কল্পে অবশেষে মাছচাষে সংযোজিত হল কমন কার্পের নতুন জাত – আমুর কমন কার্প (Amur, Cyprinus carpio haematopterus) । আমুর কমন কার্প সংক্ষেপে আমুর কার্পের সুবিধা হল এর দ্রুত বৃদ্ধি হার, বিলম্বিত পরিপক্বতা প্রাপ্তি আর চর্বিহীন সরু উদর। এসব বৈশিষ্ট্যের সুবিধা বিবেচনা করে মৎস্যচাষি ও মৎস্য ক্রেতার নিকট এর গ্রহণযোগ্যতা কমন কার্পের অন্যান্য জাতের চেয়ে বেশী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মাছটির ব্রুড হাঙ্গেরির মৎস্য চাষ গবেষণা ইনস্টিটিউট (Fish Culture Research Institute (FCRI), Hungary) থেকে সংগ্রহ করে এর উন্নয়ন করেন রুশ জাতীয় মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (Russian National Fisheries Research Institute) মৎস্য বিজ্ঞানীরা।
পরবর্তীতে ভারতের কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর মৎস্য গবেষণা ও তথ্য কেন্দ্রের (Fisheries Research & Information Centre, Bangalore) মৎস্য বিজ্ঞানীরা ভারতে মাছটির উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বৈশিষ্ট্যের উন্নয়ন করেন। অতঃপর এবছর তাদের হাত ধরেই দক্ষিণ বঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদিয়ায় ব্লক পর্যায়ে প্রথম বারের মত চাষ হচ্ছে এই মাছ। মৎস্য দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে, হলদিয়া পঞ্চায়েত সমিতির সহযোগিতায় এটিএমএ (ATMA) প্রকল্প (সাল-২০১৭) এর আর্থিক সহায়তায় আমুর মাছ চাষের প্রদর্শনী ক্ষেত্র স্থাপন করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদিয়া ব্লকে। প্রগতিশীল মাছ চাষির মাধ্যমে এর চাষের পরিধি বাড়াতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রী ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল , নারায়ণ বর্মণ, সুদীপ বিকাশ খাটুয়া ও মৃন্ময় সামন্ত এই চারজন প্রগতিশীল মাছ চাষিদের ফিশারীতে বিনামূল্যে আমুর মাছ ছাড়া হয়। পুকুর প্রস্তুতিসহ চাষের পদ্ধতিগত ধারণাও তাদের দেওয়া হয়। মৎস্য দপ্তরের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রেখে সার্থকভাবে প্রকল্প রূপায়ন করছে মাছ চাষিরা। এই অভিনব উদ্যোগে মৎস্যচাষিরা অত্যন্ত উৎসাহিত হয়েছেন এবং প্রত্যাশা করা যায় অন্যান্য মৎস্যচাষিরাও আমুর চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে এবং মৎস্য ক্রেতাদের নিকট এর গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যাবে।

আমুরের প্রদর্শণী ক্ষেত্র (পোনা ছাড়ার পূর্বে)

আমুরের প্রদর্শণী ক্ষেত্র (পোনা ছাড়ার পূর্বে)

আমুর কার্পের বিশেষ গুণাগুণ:

  • দ্রুত বর্ধনশীল (কমন কার্পের চেয়ে অন্যান্য জাতের চেয়ে ২৭ ভাগ বেশী)।
  • দেরিতে যৌন পরিপক্বতা অর্জন করে (প্রায় এক বছর)।
  • সরবরাহকৃত খাবার গ্রহণ করে।
  • খাদ্যাভ্যাস কমন কার্পের অন্যান্য জাতের অনুরূপ।
  • কম চর্বিযুক্ত ফলে উদর সিলিন্ডার আকৃতির এবং কমন কার্পের অন্যান্য জাতের চেয়ে সরু প্রকৃতির।
  • এ মাছের পুষ্টিমানও উন্নত।
  • ঠাণ্ডা, গরম যে কোনও পরিবেশেই সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
  • রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বেশি, সহজে রোগে আক্রান্ত হয়না।

 

আমুর মাছের চাষ ব্যবস্থাপনা

নার্সারি পুকুর ব্যবস্থাপনা (রেণু পোনা থেকে ধানী পোনা উৎপাদন)

মজুদ পূর্ব ব্যবস্থাপনা

  • আঁতুড় পুকুর (নার্সারি পুকুর) হিসেব কনক্রিটের (সিমেন্টের) ট্যাঙ্ক ব্যাবহার করলে তলদেশে মাটি থাকা প্রয়োজন।
  • হেক্টর প্রতি ২৫০ কেজি হিসেবে প্রয়োজনমত চুন প্রয়োগ করতে হবে।
  • হেক্টর প্রতি ১০,০০০ কেজি হিসেবে জৈব সার দিতে হবে।
  • সার দেওয়ার ৫-৬ দিন পর রেণু পোনা ছাড়তে হবে।
  • পোনা ছাড়ার সময় প্ল্যাঙ্কটন (মাছের খাদ্যকণা) প্রয়োজনমত তৈরি না হলে একবার হেক্টর প্রতি যথাক্রমে বাদাম খোল এবং গোবর ৫০০ ও ১,০০০ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। বাদাম খোল ২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তার সাথে গোবর মিশিয়ে পুকুরে দিতে হবে।
  • জলপোকা মারার জন্য মাছ ছাড়ার ২৪ ঘণ্টা আগে সাবান-তেলের মিশ্রণ প্রয়োগ করতে হবে। সাবান তেল প্রস্তুতি: সাবান পাউডার ও ডিজেল তেল হেক্টর প্রতি যথাক্রমে ১৮ কেজি ও ৫৬ লিটার হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের পূর্বে পাউডার ও তেল গরম করে ভাল করে মেশাতে হবে।
  • পোনা ছাড়ার আগে জাল টেনে জলপোকা অপসারণ করতে হবে।
  • মাছ ছাড়ার আগে পি এইচ, তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের মাত্রা দেখে নেওয়া দরকার। অনুকূল মাত্রা – তাপমাত্রা: ২২-৩০ ডিগ্রি সে., দ্রবীভূত অক্সিজেন: ৫.০-৫.৫ মিগ্রা/লি এবং পিএইচ: ৭.০-৮.৫।
আমুর কার্পের পোনা

আমুর কার্পের পোনা

মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা

  • মজুদ পরবর্তী প্রথম ৩ দিন রেণু পোনাকে দুধ বা তৈল খৈলের নির্যাস খাওয়ার হিসেবে দিতে হবে।
  • পরবর্তী ৮-১০ দিন দেহের ওজনের ১০% হারে চালের গুড়ো ও তৈল খৈল ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
  • ১৩ থেকে ১৪ তম দিনে আহরণ করতে হবে।
  • বিবেচ্য বিষয়াদি:
    • রেণু পোনা থেকে ধানী পোনা উৎপাদন (বয়স ৪ দিন থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত) নার্সারি পুকুরে করা হয়।
    • সকাল অথবা বিকেলে রেণু পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়।
    • রেণু পোনার মজুদ হার হেক্টর প্রতি ৫-১০ মিলিয়ন।
    • প্রতিদিন সকালে একবার পরিমাণমত (উপরে বর্ণিত) খাবার দিতে হবে।
    • এসময় রেণু পোনার বেঁচে থাকার হার ৬০-৭০ শতাংশ পাওয়া যায়।

 

পালন পুকুর ব্যবস্থাপনা (ধানী পোনা থেকে আঙ্গুলীপোনা উৎপাদন)

  • পালন পুকুরে ধানী পোনা থেকে আঙ্গুলীপোনা উৎপাদন করা হয়।
  • পালন পুকুর ব্যবস্থাপনার সময়কাল তথা মেয়াদ ৪৫ দিন।
  • পোনার বয়স শুরুতে ১৬ দিন এবং শেষে ৬০ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • পুকুর প্রস্তুত নার্সারি পুকুর প্রস্তুতের অনুরূপ।
  • সকালে বা বিকালে ধানী পোনা সংগ্রহ করে নির্ধারিত পুকুরে স্থানান্তর করতে হবে।
  • ধানী পোনা মজুদ হার হেক্টর প্রতি ২-৩ লাখ।
  • খাবার হিসেবে চালের গুড়ো ও বাদাম খোল গুঁড়ো ভালভাবে একত্রে মিশিয়ে সরবরাহ হবে।
  • প্রতিদিন সকালে একবার মজুদকৃত পোনার দেহের ওজনের ৫ % হারে খাবার দিতে হবে।
আমুরের পোনা ছাড়ার পূর্বপ্রস্তুতি

আমুরের পোনা ছাড়ার পূর্বপ্রস্তুতি

মজুদ পুকুর ব্যবস্থাপনা (আঙ্গুলীপোনা থেকে বড় মাছ উৎপাদন)

  • মজুদ পুকুরে আঙ্গুলী পোনা থেকে বড় মাছ উৎপাদন করা হয়।
  • এ পুকুর ব্যবস্থাপনার সময়কাল তথা মেয়াম ৯-১০ মাস।
  • আঙ্গুলী পোনার বয়স শুরুতে ২-৩ মাস এবং শেষে ১ বছর।
  • মজুদপূর্ব ব্যবস্থাপনা:
    • মজুদপূর্ব ব্যবস্থাপনার শুরুতে সম্ভব হলে পুকুর সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হবে।
    • শুকনো পুকুরে হেক্টর প্রতি ৩০০ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। সমান ভাবে পুকুরের তলদেশে চুন ছড়িয়ে দিতে হবে। (পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে সমহারে ও সমভাবে পানিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে।)
    • চুন প্রয়োগের পর পুকুরের অর্ধেকটা (০.৫-০.৭৫ মিটার গভীরতা) জলে পূর্ণ করতে হবে।
    • হেক্টর প্রতি ১০ হাজার কেজি হিসেবে জৈব সার দুই কিস্তিতে সমহারে প্রয়োগ করতে হবে যার আর্ধেকটা পুকুরে প্রথম জল প্রবেশের পর এবং বাকী অর্ধেকটা দ্বিতীয়বার জল প্রবেশ করানোর পর।
    • পোনা ছাড়ার অন্তত সাত দিন পূর্বে পুকুরে দ্বিতীয় দফায় জল প্রবেশ করিয়ে পুকুরের গভীরতা ১-১.৫ মিটারের মধ্যে রাখাতে হবে।
    • জল প্রবেশ করানোর ৭ দিন পর আঙ্গুলী পোনা মজুদ করতে হবে।
    • মজুতের আগে জলের গুণাগুণ দেখে নেয়া ভাল। তাপমাত্রা: ২২-৩০ ডিগ্রি সে., দ্রবীভূত অক্সিজেন: ৫.০-৫.৫ মিগ্রা/লি এবং পিএইচ: ৭.০-৮.৫।
    • মজুদ ঘনত্ব একক চাষে হেক্টর প্রতি ৭ হাজার এবং মিশ্র চাষে হেক্টর প্রতি ৫-৬ হাজার।
    • মিশ্র চাষে তলদেশে বাস করে বা তলদেশ হতে খাবার গ্রহণ করে এমন মাছ (মৃগেল, চিংড়ি, অন্য জাতের কমন কার্প, শোল/টাকী ইত্যাদি) ছাড়া যাবে না।
  • মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা:
    • মজুদের প্রথম দুই মাস খাবার হিসেবে মজুদকৃত পোনার দেহের ওজনের ১০ শতাংশ হারে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাদাম তেলের খৈল ও চালের গুড়ো ১:১ অনুপাতে ভালভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
    • ৩য় ও ৪র্থ মাসে মাছের দেহের ওজনের ৫ % হারে খাবার দিতে হবে।
    • ৫ম মাস থেকে মাছের দেহের ওজনের ২ % হারে খাবার দিতে হবে।
    • প্রতিটি মাসে অন্তত একবার মাছের নমুনা ও জল গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
আহরণকৃত আমুর মাছ

আহরণকৃত আমুর মাছ

সঠিকভাবে চাষ করা সম্ভব হলে এই মাছ এক বছরেই গড়ে ৭০০ গ্রাম ওজন অর্জন করে যেখানে কমন কার্পের অন্যান্য জাত অর্জন করে গড়ে ৫০০ গ্রাম। আমুরসহ মিশ্রচাষে বাৎসরিক মৎস্য উৎপাদন হেক্টর প্রতি প্রায় সোয়া চার হাজার কেজি। অন্যদিকে কমন কার্পের অন্যান্য জাতসহ মিশ্রচাষে বাৎসরিক মৎস্য উৎপাদন হেক্টর প্রতি আড়াই হাজার কেজি। এই সাফল্য মৎস্য চাষিদের নিকট এই মাছের জনপ্রিয়তা বাড়াবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

 

মৎস্য চাষির হাতে আহরণকৃত আমুর মাছ

মৎস্য চাষির হাতে আহরণকৃত আমুর মাছ


Visited 182 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

মৎস্য সম্প্রসারণ আধিকারিক, মৎস্য দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। বিস্তারিত

Leave a Reply