ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ | স্বাদুপানি

রুই জাতীয় মাছের মিশ্রচাষ: মজুদ ব্যবস্থাপনা

পোনা অবমুক্তকরণ: প্রথম ধাপ

পোনা অবমুক্তকরণ: প্রথম ধাপ

রুই জাতীয় মাছের মিশ্রচাষ: মজুদ পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা” শিরোনামের লেখায় রুই জাতীয় মাছের মিশ্রচাষের ক্ষেত্রে মূলত পুকুর প্রস্তুতকরণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল এ লেখায় রুই জাতীয় মাছের মিশ্রচাষের ক্ষেত্রে মজুদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

পুকুর প্রস্তুতের সময় থেকেই পোনার মজুদ ঘনত্ব ও পুকুরের মাপ অনুসারে পোনার চাহিদা নিরূপণ করে পোনা বিক্রেতার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন। পোনা ক্রয়ের পূর্বে পুকুর পানি পোনা ছাড়ার উপযুক্তি কিনা তা নিম্নলিখিত দুটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা
পোনা মজুদের পূর্বে কিছু পরিমাণ পোনা পানিতে মজুদ করে পানির বিষাক্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এজন্য চাষের পুকুরে একটি হাপায় কিছু পরিমাণ পোনা (১০-২০ টি) ২৪ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। পোনা যদি মারা না যায় তবে বুঝতে হবে পানি বিষাক্ত নয়। আর পোনা যদি মারা যায় তবে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে পুনরায় বিষাক্ততা পরীক্ষা করে পোনা মজুদ করতে হবে।

পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা
বেশ কয়েকটি পদ্ধতিতে পানিতে উপস্থিত প্রাকৃতিক খাদ্য সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। এখানে সংক্ষেপে পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করা হল:

  • সেকি ডিস্ক পদ্ধতি: এটি একটি গোলাকার চাকতি যাতে সাদা ও কালো রং লাগানো বৃত্তাকারে লাগানো থাকে। চাকতিটি মাঝখান থেকে সূতা বা দণ্ডের সাহায্যে ঝুলানো থাকে। পর্যাপ্ত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সূর্যের দিক সামনে রেখে পানিতে এই ডিস্কটি ডুবাতে হবে এবং কত গভীরতায় চাকতিটি আর দৃষ্টিগোচর হয় না তা সূতা বা দণ্ড হতে জানা যায়। ৪৫-৬০ সেমি সেকি ডিস্ক রিডিং মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত যা পানিতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্যের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারনা দেয় (FAO, 1997)।
  • গ্লাস পদ্ধতি: একটি কাচের গ্লাসে পুকুর হতে পানি নিয়ে গ্লাসটি সূর্যালোকের দিকে মুখ করে ধরলে যদি গ্লাসের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদকণা বা প্রাণিকণা (৮-১০ টি) পরিলক্ষিত হয় তবে বুঝতে হবে পানিতে পর্যাপ্ত খাদ্য রয়েছে।
  • হাত পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে পানি ঘোলা না করে হাত ডুবাতে হবে এবং যদি কনুই পর্যন্ত ডুবানোর পরও হাতের তালু দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে পানিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রাকৃতিক খাবার নেই।

চাষের জন্য পোনা নির্বাচন
মাছচাষের ক্ষেত্রে সঠিক প্রজাতির নির্বাচন অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়াবলী বিবেচনা করে সঠিক প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে-

  • দ্রুত বর্ধনশীল, ভাল বাজারচাহিদা ও বাজারমূল্য রয়েছে এমন প্রজাতি
  • সহজলভ্য পোনা ও প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি সম্পূরক খাদ্যও গ্রহণ করে
  • পুকুরের পানির সকল স্তর যাতে ব্যবহৃত হয়
  • মজুদকৃত প্রজাতি যেন একে অপরের সাথে খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য প্রতিযোগিতা না করে।
চাষকৃত দেশী মাছ: রুই

চাষকৃত দেশী মাছ: রুই

চাষকৃত দেশী মাছ: কাতলা

চাষকৃত দেশী মাছ: কাতলা

চাষকৃত দেশী মাছ: মৃগেল

চাষকৃত দেশী মাছ: মৃগেল

চাষকৃত দেশী মাছ: বাটা

চাষকৃত দেশী মাছ: বাটা

পোনার মজুদ ঘনত্ব

কি পরিমাণ পোনা মজুদ করা হবে তা নির্ভর করে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর, যেমন, খাদ্য ব্যবহার ও খাদ্যের ধরন, পানির পরিবর্তন ইত্যাদি। নিম্নে পোনা মজুদের বেশ কয়েকটি মডেল তুলে ধরা হল:
মডেল ০১ (মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৪): (৭-১০ সেমি আকারের পোনা)

পানির স্তর প্রজাতি প্রতি শতকে সংখ্যা
উপরের স্তর কাতলা ৩-৪
সিলভার কার্প ৭-১২
মধ্যম স্তর রুই ৫-৮
তলদেশ/নিম্ন স্তর মৃগেল ৬-১০
কমন কার্প (মিরর/স্কেল কার্প) ১-২
সকল স্তর গ্রাস কার্প ২-৪
রাজপুটি/সরপুটি ১০-১৫
মোট ৩৪-৫৫
চাষকৃত বিদেশী মাছ: সিলভার কার্প

চাষকৃত বিদেশী মাছ: সিলভার কার্প

চাষকৃত বিদেশী মাছ: বিগহেড কার্প

চাষকৃত বিদেশী মাছ: বিগহেড কার্প

মডেল ০২ (সিদ্দিকী ও চৌধুরী, ১৯৯৬):

প্রজাতি সংখ্যা/শতাংশ
সিলভার কার্প ৭-১২
কাতলা ৩-৪
রুই ৫-৮
মৃগেল ৬-১০
কমন/মিরর কার্প ১-২
গ্রাস কার্প ২-৪
রাজপুটি ১০-১৫
চাষকৃত বিদেশী মাছ: কমন কার্প বা জাপানী রুই

চাষকৃত বিদেশী মাছ: কমন কার্প বা জাপানী রুই

চাষকৃত বিদেশী মাছ: মিরর কার্প

চাষকৃত বিদেশী মাছ: মিরর কার্প

মডেল ০৩ (সিদ্দিকী ও চৌধুরী, ১৯৯৬): সার ও খাদ্য ব্যবহার করলে

প্রজাতি সংখ্যা/শতাংশ
সিলভার কার্প ৫-৬
কাতলা ৪-৫
রুই ৫-৬
মৃগেল ৩-৪
কমন/মিরর কার্প ৩-৪
গ্রাস কার্প ১-২
রাজপুটি ০-২
চাষকৃত বিদেশী মাছ: গ্রাস কার্প

চাষকৃত বিদেশী মাছ: গ্রাস কার্প

মডেল ০৪ (সিদ্দিকী ও চৌধুরী, ১৯৯৬): শুধু সার ব্যবহার করলে

প্রজাতি সংখ্যা/শতাংশ
সিলভার কার্প ৪-৫
কাতলা ৩-৪
রুই ৪-৫
মৃগেল ৩-০
কমন/মিরর কার্প ২-৩
গ্রাস কার্প ০-২
রাজপুটি ১-০
চাষকৃত বিদেশী মাছ: ব্লাক কার্প

চাষকৃত বিদেশী মাছ: ব্লাক কার্প

মডেল ০৫ (সিদ্দিকী ও চৌধুরী, ১৯৯৬):

প্রজাতি সংখ্যা/শতাংশ শতকরা হার
কাতলা ১২ ৪০
রুই ৩০
মৃগেল ৩০
মোট ৩০ ১০০

 

বিভিন্ন বিষয়াবলী বিবেচনা করে যে কোন একটি মডেল অনুসরণ করে প্রথমে পোনার চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। এবং পোনা ক্রয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।

চাষকৃত বিদেশী মাছ: থাই স্বরপুটি বা থাই রাজপুটি

চাষকৃত বিদেশী মাছ: থাই স্বরপুটি বা থাই রাজপুটি

পোনা ক্রয় ও পরিবহণ:
দূরবর্তী স্থান থেকে পোনা ক্রয়ের সময় পোনার পেট খালি আছে কিনা তা অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে। এজন্য ভাল পোনা বিক্রেতারা পোনা বিক্রয়ের ২৪ ঘণ্টা পূর্বে জাল টেনে পোনা হাপায় আটকে খাবার প্রদান করে। অতঃপর হাপা থেকে পোনাগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং খাবার প্রদান বন্ধ রাখা হয়। এর ৬-৮ ঘণ্টা পরে পোনার পুকুরে কয়েকবার জাল টানা হয়। এতে করে পোনার খাদ্যনালীতে খাবারে উপস্থিতি থাকে না বললেই চলে ফলশ্রুতিতে পোনা পরিবহণে পোনার মৃত্যুর হার কমে।
এছাড়াও দূরবর্তী স্থান থেকে পোনা পরিবহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই নিম্নলিখিত বিষয়াবলী লক্ষ রাখতে হবে

  • সঠিক ঘনত্বে পোনা পরিবহণ
  • সকালে বা বিকালে অর্থাৎ সহনশীল তাপমাত্রায় পোনা পরিবহণ
  • যানবাহনের ছায়া যুক্ত স্থানে পোনা পরিবহণ
  • একটি পাত্রে একই আকার ও প্রজাতির পোনা পরিবহণ

পোনা শোধন:
রোগ প্রবণ এলাকায় পোনার সুস্থতা ও রোগ-বালাই মুক্তির লক্ষে পোনা শোধন করে নেয়া হয়ে থাকে। এক বালতি পানিতে ১০ লিটার পানি নিয়ে তাতে ২০০ গ্রাম লবণ মিশানোর পর সেই লবণ-পানিতে পোনাকে ৩০ সেকেন্ড গোসল করানোর মাধ্যমে পোনা শোধন করা যেতে পারে।

পোনা অবমুক্তকরণ: দ্বিতীয় ও শেষ ধাপ

পোনা অবমুক্তকরণ: দ্বিতীয় ও শেষ ধাপ

পোনা অবমুক্তকরণ
সকালে বা বিকালে অর্থাৎ সহনশীল তাপমাত্রায় পোনা অবমুক্ত করা ভাল। পোনা অবমুক্ত করার পূর্বে নিশ্চিত হতে হবে যে পোনা পরিবহণ পাত্রের পানির তাপমাত্রা ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা যেন কাছাকাছি (৩ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বা তার কম) থাকে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য নিচের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে-

  • পোনা ছাড়ার পূর্বে এর পাত্র ৩০ মিনিট পানিতে ভাসিয়ে রাখাতে হবে। এসময় হাত দিয়ে পোনার পাত্রের এবং পুকুরের পানির তাপমাত্রা অনুভব করে নিশ্চিত হতে হবে যে উভয় পানির তাপমাত্রা কাছাকাছি (৩ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বা তার কম) রয়েছে।
  • বিষয়টি নিশ্চিত হলে পাত্রটি কাত করে পুকুরে পানিতে হাত দিয়ে পাত্রের মুখের দিকে আস্তে আস্তে ঢেউ দিলে যে হালকা স্রোতের সৃষ্টি হয় তাতে পোনাগুলো পাত্র থেকে বেড় হয়ে আসতে থাকে। কারণ সুস্থ পোনার বৈশিষ্ট্যই হল স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা।

পুনশ্চ:
রুই জাতীয় মাছের মিশ্রচাষ: মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এখানে

কৃতজ্ঞতা:
লেখার ছবিগুলো দিয়ে সহায়তা করেছেন ড.এবিএম মহসিন, শামস মুহাঃ গালিব এবং মোঃ মেহেদী হাসান

তথ্যসূত্র:

বাংলা-

  • মৎস্য অধিদপ্তর. ২০০৪. কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র চাষ, সমন্বিত মৎস্য কার্যক্রমের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন প্রকল্প (২য় পর্যায়), মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা, পৃ. ১-২৪।
  • সিদ্দিকী কা এবং চৌধুরী স.না. (সম্পা.). ১৯৯৬. মৎস্য পুকুরে মাছ চাষ ম্যানুয়াল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব লোকাল গভর্নমেন্ট, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃ. ২৩৭-২৫৩।

ইংরেজি-

  • FAO (Food and Agricultural Organization). 1997. Simple methods for aquaculture: management for freshwater fish culture ponds and water practives. Oxford and IBH publishing Co. Pvt. Ltd. 233pp.

Visited 9,147 times, 2 visits today | Have any fisheries relevant question? Ask here

Visitors' Opinion

লেখক

শিক্ষার্থী, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত

Leave a Reply