ক্যাটাগরি: জীববিজ্ঞান | পূর্বপাঠ | প্রাণিবিজ্ঞান

জিনতত্ত্ব

ফিশারীজ কোন মৌলিক বিজ্ঞান নয় বরং এটি জীববিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের একটি সমন্বিত বিজ্ঞান যা মাছ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশিষ্ট জলজ প্রাণীদের জীবতত্ত্ব, চাষ, আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা, আহরণ, প্রক্রিয়াজনকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করে। তাই ফিশারীজকে বুঝতে হলে অবশ্যই জীববিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। সে উদ্দেশ্য পূরণকল্পে শুরু হল বিডিফিশ বাংলার পূর্বপাঠ অধ্যায়। এলেখার বিষয় জিনতত্ত্ব। সাথে রইল কুইজে অংশ নেয়ার সুযোগ

 

জিনতত্ত্ব (Genetics)

  • জীববিজ্ঞানের এই শাখায় বংশগতি সম্পর্কিত নানাবিধ বিষয়াদির বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা করা হয়। বিজ্ঞানী উইলিয়াম বেটসন (William Bateson) ১৯০৬ সালে প্রথম Genetics শব্দটি ব্যবহার করেন যা গ্রিক শব্দ Gen থেকে উদ্ভূত যার ইংরেজি অর্থ to become বা to grow into।
  • পিতামাতার বৈশিষ্ট্যাবলি বংশানুক্রমে সন্তান-সন্ততির মাঝে সঞ্চারিত হওয়ার বিষয়টিই হচ্ছে বংশগতি বা হেরিডিটি (Heredity)।
  • একই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্ট সন্তানদের মাঝে আকৃতি ও গঠনগত এবং শারীরবৃত্তীয় মিল থাকলেও অনেক পার্থক্যও দেখতে পাওয়া যায় যাকে পরিবৃত্তি বা ভেরিয়েশন (Variation) বলে। পরিবৃত্তি জিনের পরিবর্তনের কারণে হতে পারে আবার পরিবেশের পরিবর্তনের কারণেও হতে পারে। পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে এমনটি হলে তাকে পরিবেশগত পরিবৃত্তি বলে।

 

বিজ্ঞানী গ্রেগর জোহান মেন্ডেল:

  • স্যার গ্রেগর জোহান মেন্ডেল কে জিনতত্ত্বের জনক বলা হয়।
  • পেশায় ধর্মযাজক এই বিজ্ঞানী ১৮২২ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
  • ১৮৫৭ সালে তিনি বংশগতির রহস্য উদঘাটনে গবেষণা শুরু করেন। ১৮৬৫ সালে উক্ত গবেষণার ফলাফল দুটি সূত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন যা মেন্ডেলের সূত্র বা মেন্ডেলের মতবাদ বা মেন্ডেলিজম বা মেন্ডেলের বংশগতির সূত্র নামে পরিচিত।
  • তিনি তাঁর গবেষণার ফলাফল ব্রুনই ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে প্রেরণ করেন যা পরের বছর অর্থাৎ ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়।
  • সে সময়ে তার প্রকাশিত সূত্র দুটি প্রতিষ্ঠা পেতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ১৯০০ সালে বিজ্ঞানী হুগো দি ভ্রিস (Hugo de Vries), কার্ল করেন্স (Karl Correns) এবং এরিখ চেরমাখ (E. Tschermark) আলাদা আলাদাভাবে মেন্ডেলের গবেষণার ফলাফল পুনঃআবিষ্কার করেন যার ফলশ্রুতিতে মেন্ডেলের সূত্র দুটি প্রতিষ্ঠা পায়। তাঁর সূত্র দুটি প্রতিষ্ঠা পাবার ১৬ বছর আগেই অর্থাৎ ১৮৮৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

মেন্ডেলের মতবাদ বা মেন্ডেলিজম:
বংশগতি বিষয়ক মেন্ডেলের সূত্র দুটিকে একসাথে মেন্ডেলের মতবাদ বা মেন্ডেলিজম বলে।

প্রথম সূত্র বা Law of Monohybrid Cross বা Law of Purity of Gametes বা Law of Segregation:
সংকর জীবে বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ফ্যাকটর (Factor) তথা জিনগুলি (Gene) মিশ্রিত বা পরিবর্তিত না হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে এবং জননকোষ সৃষ্টির সময় পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়।
এই সূত্রানুসারে দ্বিতীয় সংকর পুরুষের (F2) এক জোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের (লম্বা, TT x খাটো, tt) ফেনোটাইপের অনুপাত পাওয়া যায় লম্বা: খাটো = ৩:১ এবং জেনোটাইপের অনুপাত পাওয়া যায় TT:Tt:tt = ১:২:১। এই সূত্রটি মনোহাইব্রিড (Monohybrid) ক্রসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কারণ এখানে এক জোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে সংকরায়ন বা ক্রস ঘটানো হয়।

দ্বিতীয় সূত্র বা Law of Independent Assortment:
দুই বা ততোধিক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ক্রসের ফলে প্রথম সংকর পুরুষে (F1) কেবলমাত্র প্রকট বৈশিষ্ট্যগুলিই প্রকাশিত হয় কিন্তু জননকোষ সৃষ্টির সময় বৈশিষ্ট্যগুলির জোড়া ভেঙ্গে একে অপর থেকে স্বাধীন বা স্বতন্ত্রভাবে বিন্যস্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন জনন কোষে প্রবেশ করে।
এই সূত্রানুসারে দ্বিতীয় সংকর পুরুষের (F2) দুই জোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের (লম্বা, TT ও বাদামী, BB x খাটো, tt ও কালো, bb) ফেনোটাইপের অনুপাত পাওয়া যায় লম্বা ও বাদামী : লম্বা ও কালো : খাটো ও বাদামী : খাটো ও কালো = ৯:৩:৩:১। দুই জোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে সংকরায়ন বা ক্রস ঘটানো হলে তাকে ডাইহাইব্রিড (Dihybrid) ক্রস বলে।

 

মেন্ডেলের মতবাদ বা মেন্ডেলিজম এর ব্যতিক্রম:
সাধারণত জীবদেহে একটি বৈশিষ্ট্য এক জোড়া জিন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দুই বা ততোধিক জোড়া জিন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয় যা জিনগুলির পারস্পরিক ক্রিয়াশীলতার উপর নির্ভরশীল। এসব ক্ষেত্রে মেন্ডেলের সূত্রানুসারে এক ও দ্বিসংকর ক্রসে মেন্ডেলিয়ান অনুপাত (৩:১ ও ৯:৩:৩:১) পাওয়া যায় না। এজাতীয় বংশগতি বা ইনহেরিট্যান্সকে নন-মেন্ডেলিয়ান বা কমপ্লেক্স বা ব্লেন্ডিং ইনহেরিট্যান্স (Non-Mendelian বা Complex বা Blending Inheritance) বলে।

 

প্রথম সূত্রের ব্যতিক্রম:

অসম্পূর্ণ প্রকটতা (Incomplete Dominance):
এক্ষেত্রে ১ম সংকর পুরুষে (F1) প্রকটতা অসম্পূর্ণ থাকায়  বা প্রকাশিত না হওয়ায় একজোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের (লাল, RR ও সাদা, rr) বাইরে তৃতীয় একটি বৈশিষ্ট্য (গোলাপি, Rr) প্রকাশ পায় এবং ২য় সংকর পুরুষে (F2) উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের ফেনোটাইপের অনুপাত হয় লাল:গোলাপি:সাদা = ১:২:১।
তাই অসম্পূর্ণ প্রকটতায় ফেনোটাইপ ও জেনোটাইপের অনুপাত একই হয়ে থাকে।

মারণ প্রভাব (Lethality):
যখন একজোড়া জিনের উপস্থিতি জীবের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দেয় তখন সেই জিনকে মারণ জিন (Lethal gene) বলে। এই মারণ জিনের হোমোজাইগাস উপস্থিতির প্রভাবে প্রাণীর মৃত্যু ঘটাকে মারণ প্রভাব (Lethality) বলে। যেমন- হলুদ বর্ণের লোম বিশিষ্ট ইঁদুরের মধ্যে ক্রস ঘটালে হলুদ ও অ্যাগাউটি বর্ণের ইঁদুরের অনুপাত পাওয়া যায় ২:১। কারণ হলুদ বর্ণের জন্য দায়ী জিনের প্রকট হোমোজাইগাস উপস্থিতির ফলে ২৫% ইঁদুরের মৃত্যু ঘটে।

অন্যদিকে মারণ জিনের হেটারোজাইগাস উপস্থিতির প্রভাবে প্রাণীর মৃত্যু ঘটাকে চরম মারণ প্রভাব আর জিনকে চরম মারণ জিন বলে। যেমন মানুষের ক্ষেত্রে এপিলইয়া (Epiloia) বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিন হেটারোজাইগাস অবস্থায় থাকলে তার ত্বকের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে ও মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয় ফলে অল্প বয়সেই মারা যায়।

 

দ্বিতীয় সূত্রের ব্যতিক্রম:

এপিস্ট্যাসিস (Epistasis):
সাধারণত একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য একজোড়া জিন ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য দুইজোড়া জিন ক্রিয়াশীল। সেক্ষেত্রে যদি একটি জিন কর্তৃক অপর জিনের কার্যকারিতাকে বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটে  তবে তাকে এপিস্ট্যাসিস বলে।
যে জিন অপর জিনের কার্যকারিতাকে বাধা দেয় তাকে এপিস্ট্যাটিক জিন (Epistatic gene) এবং যে জিন বাধা প্রাপ্ত হয় তাকে হাইপোস্ট্যাটিক (Hypostatic gene) জিন বলে।
মেন্ডেলের ২য় সূত্রানুসারে দ্বিসংকর ক্রসের ফলে ২য় সংকর পুরুষে (F2) ফিনোটাইপের অনুপাত পাওয়া যায় ৯:৩:৩:১। কিন্তু এপিস্ট্যাসিসের ফলে পরিবর্তিত অনুপাত দেখা যায়। যেমন- সাদা ও ধুসর কুকুরের মধ্যে ক্রসের ফলে ১য় সংকর পুরুষে (F1) কেবলমাত্র সাদা কুকুরই পাওয়া যায় এবং ২য় সংকর পুরুষে (F2) সাদা, কালো ও ধুসর কুকুরের অনুপাত পাওয়া যায় ১২:৩:১। অন্যদিকে সাদা বর্ণের লেগহর্ন ও ওয়াইনডট মোরগ-মুরগীর মধ্যে ক্রসের ফলে ১য় সংকর পুরুষে (F1) কেবলমাত্র সাদা বর্ণের মোরগ-মুরগীর পাওয়া যায় এবং ২য় সংকর পুরুষে (F2) সাদা ও রঙ্গিন মোরগ-মুরগীর অনুপাত পাওয়া যায় ১৩:৩।

পরিপূরক জিন (Complementary gene):
একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশে যদি দুইজোড়া জিন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে তবে সেই জিনগুলিকে পরিপূরক জিন বলে। এক্ষেত্রে এক জোড়া জিন নির্ধারক (Determiner) হিসেবে এবং অন্য জোড়াটি প্রবর্তক (Initiater) হিসেবে কাজ করে। পরিপূরক জিনের ক্রিয়ায় বিশুদ্ধ সাদা বর্ণের ফুল বিশিষ্ট দুটি গাছের মধ্যে ক্রসের ফলে ১য় সংকর পুরুষে (F1) কেবলমাত্র বেগুনী বর্ণের ফুল বিশিষ্ট গাছই পাওয়া যায় এবং ২য় সংকর পুরুষে (F2) বেগুনী ও সাদা বর্ণের ফুল বিশিষ্ট গাছের অনুপাত পাওয়া যায় ৯:৭ যা মেন্ডেলের ২য় সূত্রের ব্যতিক্রম।

সম্পূরক জিন (Supplementary gene):
দুটি স্বাধীন ও প্রকট জিনের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে যদি জীবদেহে নতুন বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত তবে সেই জিন-দ্বয়কে সম্পূরক জিন বলে। সম্পূরক জিনের ক্রিয়ায় কালচে ও অ্যালবিনো বর্ণের লোম বিশিষ্ট ইঁদুরের ক্রসের ফলে ১য় সংকর পুরুষে (F1) কেবলমাত্র অ্যাগাউটি বর্ণের লোম বিশিষ্ট ইঁদুরই পাওয়া যায় এবং ২য় সংকর পুরুষে (F2) অ্যাগাউটি, কালচে ও অ্যালবিনো বর্ণের লোম বিশিষ্ট ইঁদুরের অনুপাত পাওয়া যায় ৯:৩:৪ যা মেন্ডেলের ২য় সূত্রের ব্যতিক্রম।

লিঙ্গ-সংযোজিত বংশগতি (Sex-linked Inheritance):
জীবের লিঙ্গ নির্ধারণকারী ক্রোমোজোমকে সেক্স ক্রোমোজোম বলে। জীবের লিঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য অনেক বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিন এই সেক্স ক্রোমোজোমে অবস্থান করে। এই জিনসমূহ সেক্স-লিঙ্কড জিন (Sex-linked gene) আর বৈশিষ্ট্যসমূহকে সেক্স-লিঙ্কড বৈশিষ্ট্য (Sex-linked characters) বলে। যেমন: মানুষের চোখের রং, বর্ণান্ধতা, হিমোফিলিয়া ইত্যাদি। এসব বৈশিষ্ট্যের বংশানুক্রমিক সঞ্চারণকে লিঙ্গ-সংযোজিত বংশগতি (Sex-linked Inheritance) বলে।

সেক্স ক্রোমোজোম সাধারণত x, y, z বা o অক্ষর দিয়ে চিহৃত করা হয়। সেক্স-লিঙ্কড জিন সাধারণত x ক্রোমোজোমে অবস্থান করে এবং এরা প্রচ্ছন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে।

 

তথ্যসূত্র:

 

কুইজে অংশ নিতে লিঙ্কটি অনুসরণ করুন

 

Visitors' Opinion

লেখক

প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বিস্তারিত

Leave a Reply