ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ

মাছ চাষের সাধারণ সমস্যা ও সমাধান: পুকুরের পানিতে লাল স্তর

পুকুরের পানিতে লাল স্তরপুকুরের পানিতে লাল স্তর

মাছ চাষের ক্ষেত্রে খামারি/উদ্যোক্তাদের প্রায়ই কিছু সাধারণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মাছ চাষ কার্যক্রমের সাথে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকার ফলে দেখেছি, সমস্যাগুলো মাছ চাষে প্রায়ই বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। সমস্যাগুলোর মধ্যে পুকুরের পানির অ্যাসিডিটি-অ্যাকালিনিটি বা পিএইচ, অ্যামোনিয়া, অক্সিজেনসহ পানির গুণাগুণের তারতম্য ও এর প্রভাব, পানিতে ঘন সবুজ বা লাল স্তরের আবির্ভাব ও এর ফলে সৃষ্ট সমস্যা, পানির ঘোলাত্ব, শীতকালে মাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া ও রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি, খাদ্যের প্রতি মাছের অনীহা, মৎস্য খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। “মাছ চাষের সাধারণ সমস্যা ও তার সমাধান” শীর্ষক ধারাবাহিক এই লেখাটিতে মূলত: মাছ চাষে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উপরোক্ত সমস্যা ও এর সম্ভাব্য সমাধানগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আশাকরি লেখাটি মাছ চাষ কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্তদের কাজে আসবে। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়, “পুকুরের পানিতে লাল স্তর সমস্যা ও তার সমাধান”।

মাছ চাষের পুকুরের পানির উপরিস্তরে প্রায়ই লাল রংয়ের আস্তরণ পড়তে দেখা যায়। বিভিন্ন কারণে পুকুরের পানিতে লাল রংয়ের আস্তরণ পড়তে পারে। এর ফলে পানিতে অক্সিজেন মিশতে পারে না, মাছের খাবার দেখতে এবং খেতে সমস্যাসহ নানাবিধ অসুবিধার সৃষ্টি হয়। এ পর্বে পানিতে লাল রংয়ের আস্তরণ তৈরির কারণ ও সম্ভাব্য প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

লাল আস্তরণের কারণ:

বিভিন্ন কারণে পুকুরের পানিতে লাল রংয়ের আস্তরণ সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুকুরের পানিতে বিদ্যমান কয়েক প্রজাতির শৈবালের বংশ বৃদ্ধিই এর জন্য দায়ী। প্রধানত Rhodophyceae এবং Cryptophyseae গোত্রের জলজ শৈবালের কারণে পানির উপর লাল রংয়ের আস্তরণ দেখা যায়। এ ছাড়াও ইউগ্লেনা নামক আরেকটি এককোষী জীবের উপস্থিতির ফলেও পানিতে লাল আস্তরণের সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত যেসকল পুকুরে অ্যামোনিয়া বা নাইট্রোজেন ঘটিত যেকোনো পদার্থ ক্রমাগত আধিক্যের সৃষ্টি হয়ে থাকে সেখানে এ ধরনের শৈবালের উৎপত্তি হয়। এই দুই গোত্রের শৈবাল ছাড়াও আরও কয়েক প্রকারের শৈবালের কারণেও পানিতে লাল আস্তরণের সৃষ্টি হতে পারে। এসব শৈবালের বংশবৃদ্ধির সময় এক ধরনের আঠালো পদার্থ নির্গত হয়। এর ফলে পুকুরের পানিতে লাল আস্তরণের সৃষ্টি হয়।

লাল আস্তরণের ফলে সৃষ্ট সমস্যা:

এ আস্তরণের ফলে বায়ু মণ্ডলের অক্সিজেন পুকুরের পানিতে মিশতে পারে না, এতে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে পুকুরের অক্সিজেন সংকটের সৃষ্টি হয়ে মাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়াসহ কখনো কখনো মাছের মড়ক দেখা দিতে পারে। অক্সিজেন সমস্যা ছাড়াও লাল আস্তরণের কারণে সূর্যের আলো পানিতে প্রবেশ করতে পারে না, ফলে পানিতে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক খাদ্যকণা (প্ল্যাঙ্কটন) তৈরিতেও বাঁধার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সম্পূরক খাবার প্রয়োগের সময় লাল আস্তরণের কারণে মাছ তা ভালভাবে দেখতে পায়না বা খুঁজে পায়না ফলে  মাছের খাবারের অপচয় হয় এবং অতিরিক্ত খাবার জমা হয় যা পরবর্তীতে পচে পানিতে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস সৃষ্টি করে।

পুকুরের পানিতে লাল স্তর (কাছ থেকে দৃষ্ট)পুকুরের পানিতে লাল স্তর

প্রতিকার ও প্রতিরোধ:

একবার পুকুরে এসকল শৈবালের উৎপত্তি হলে সহজে পুকুরের পরিবেশ ভালো করা যায় না। সাধারণত খড়ের তৈরি দড়ি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেকোনো ধরনের শৈবাল ধ্বংসকারী ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে এদেরকে দমন করা যায়। শৈবাল ধ্বংসকারী ওষুধ হিসাবে তুঁতে বা কপার সালফেট (CuSO4) প্রয়োগ করা যেতে পারে। ৯০ সে.মি. গভীরতার প্রতি বিঘা পুকুরের জন্য ৪০০ গ্রাম কপার সালফেট ভালো করে পানির সাথে গুলে পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। অতঃপর জাল টেনে কপার সালফেট ভালোভাবে পানির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে ৫-৭ দিনের মধ্যে পানি পরিষ্কার হবে। অবশ্য কিছু দিন পরে পুনরায় এসব শৈবালের আবির্ভাব হতে পারে।

এগুলোকে একেবারে ধ্বংস করার জন্য পুকুর শুকিয়ে তলদেশের কাদা সরিয়ে ফেলতে হয়। অতঃপর পুকুরে ৩০-৫০ সে.মি. পানি দিয়ে তাতে পুনরায় বিঘা প্রতি ৪০০ গ্রাম কপার সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে কপার সালফেট মিশ্রিত পানির সাথে ৭-৮ দিন পর পুনরায় ১৮০-২১২ সে.মি. পানি প্রবেশ করিয়ে পুকুরটিকে আরও ৭-৮ দিন রেখে দিতে হবে। এ ভাবে ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের শৈবালের আবির্ভাবের আশঙ্কা থাকে না।

তথ্যসূত্র:

১। দাশ, বিষ্ণু (১৯৯৭) বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা (তৃতীয় খণ্ড)। বাংলা একাডেমী। ঢাকা, বাংলাদেশ।

২। মেগা ফিড স্কুল মাছ চাষ সহায়িকা, ২০২০।


Visited 1 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

ফ্রিল্যান্সার কনসালটেন্ট, অ্যাকুয়াকালচার সেক্টর। ট্রেনিং এন্ড অ্যাকুয়াকালচার স্পেশালিস্ট (সাবেক), এআইএন প্রজেক্ট, ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশ। যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] এবং মোবাইল: 01743889971 । বিস্তারিত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.