ক্যাটাগরি: মাৎস্য চাষ

পরিবর্তিত জলবায়ুঃ মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি এবং করণীয়

প্রতিনিয়ত আমাদের প্রিয় পৃথিবী উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হযে উঠছে। মূলত মানুষ কর্তৃক পরিচালিত উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন, জ্বালানিসহ মাত্রাতিরিক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার, ভূমি ও বন ব্যবহার, ভোগবিলাস ইত্যাদি নানা কর্মকান্ড থেকে দীর্ঘদিন ধরে উৎসারিত এবং বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত গ্রীন হাউজ গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়েছে। এবং ভবিষ্যতে তা আরও দ্রুতগতিতে বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন (আহমদ, ২০০৮) । অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এর প্রভাব প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ২০০৭ সালে রাজশাহীতে বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল ৯.৩৯ মিমি যা ২০০৮ এ হয়েছে ৮.০৪ মিমি ও ২০০৯ এ এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৭ মিমিতে। এছাড়াও দেখা যায় ২০০৭ সালে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ছিল ৩০.৯৪ ডি. সে. যা ২০০৮ এ হয়েছে ৩১.২ ডি. সে. ও ২০০৯ এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.০৩ ডি. সে. এ (তথ্যসূত্রঃ রাজশাহী আবহাওয়া অফিস,  ২০১০) । আর এই তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বন্যা ও খরার প্রবনতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে যার প্রেক্ষিতে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বাংলাদেশ ‌আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ২ ডি. সে. বা তার বেশ উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং ৪৫ সেন্টিমিটার বা তার বেশি সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্মুখীন হতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার বেশিরভাগ অংশ সমূদ্র পৃষ্ঠ থেকে খুব কম উচ্চতার মধ্য অবস্থিত বলে এর প্রভাব অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঠিক এরকম একটি অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও আভ্যন্তরীণ মৎস্যখাতের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে বা পড়তে শুরু করেছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। পরিবর্তিত জলবায়ু প্রেক্ষাপটে মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি এবং করণীয় কি হতে পারে তা সংক্ষেপে নিচে আলোচনা করা হল।

পরিবর্তিত জলবায়ু প্রেক্ষাপটে মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকিঃ

  • সম্ভাব্য সমুদ্র স্ফীতির কারণে উপকূলীয় এলাকার শত শত একর ঘের, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় লোনাজলে তলিয়ে যাবার হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
  • বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে ফলে নদী, নালা, খাল, বিল, হাওর, বাওর ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে ও মৎস্য প্রজাতির স্বাভাবিক বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্রের পরিসর কমে যাচ্ছে।
  • ঝড় ও বন্যার প্রকোপ বাড়ার শত শত চাষকৃত জলাশয়ে সমুদ্রের লবনাক্ত পানি ঢুকে যাচ্ছে ফলে একদিকে যেমন চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে অন্যদিকে জলজ জীববৈচিত্র্যের উপর ব্যাপক প্রভাব পরছে।
  • স্বাদু পানির প্রাপ্যতা, বিশেষ করে বড় বড় নদী অববাহিকা কমে যাচ্ছে এবং আরও যাবে ফলে একদিকে যেমন তীব্র পানি সংকট দেখা দেবে তেমনি স্বাদুপানির মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর অবলুপ্তি ঘটবে।

মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলায় করণীয়ঃ

  • বলা হয়ে থাকে বলা যত সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন করা তত কঠিন। এমন একটি কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত জলবায়ুর হুমকি মোকাবেলায় হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ নেই। প্রয়োজন কিছু একটা করার। সেই করণীয়টা কি হতে পারে তা নিচে দেয়া হল-
  • গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণ এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান নগন্য হলেও সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাহত না করে গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণ আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা করতে হবে।
  • পরিবর্তিত জলবায়ুর হুমকি মোকাবিলার জন্য তৃণমূল পর্যায়ের সাধারন মানুষ যেন সহজেই পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে নিজেকে এবং নিজের উৎপাদন গত পেশাকে মানিয়ে নিতে পারে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা যেমন-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
  • বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রাক পূর্বাভাস প্রদানে তথ্য ও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কমপিউটার মডেলের ব্যবহার করে আগাম সতর্ক সংকেতের সময় কাল বাড়িয়ে যথাস্থানে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌছানো হলে তৃণমূলের চাষী সহ অন্যান্য মানুষ ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারবে (আহমেদ, ২০০৫) ।
  • পরিবর্তিত পরিবেশ উপযোগী চাষপদ্ধতির প্রচলন করতে হবে এছাড়াও লবন ও খরা সহিষ্ণু উন্নত জাতের মাছ উদ্ভাবনের কর্মসূচী হাতে নেয়া প্রয়োজন যাতে করে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন বাড়বে অন্যদিকে তেমনই মৎস্য প্রজাতি রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে।

তথ্যসুত্রঃ

আহমেদ, আ. উ. (২০০৫), এডাপটেশন অপশনস ফর ম্যানেজিং ওয়াটার রিলেটেড এক্সট্রিম ইভেন্টস আন্ডার ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিম: বাংলাদেশ পারস্পেকটিভস, অন্তর্ভুক্ত মো: ম. কা. মীর্জা ও কা. খ. আহমদ (সম্পা), ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড ওয়াটার রিসোর্সেস ইন সাউথ এশিয়া, বালকেমা প্রেস, লাইডেন, পৃ: ২৫৫-২৭৮।

আহমদ, কা. খ. (২০০৮), জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ, গ্রামীন জীবনযাত্রার স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান, বাড়ি-৪, সড়ক-৩, ব্লক- আই, বনানী, ঢাকা-১২০৩, পৃ:১-১৪।


Visited 225 times, 3 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

গবেষক, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্তারিত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.