ক্যাটাগরি: ইভেন্ট | উৎসব | মেলা

মাছের মেলা: বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব

মেলা শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হরেক রকমের খেলনা, নানা ধরণের বাঁশির কান ফাটানো শব্দ আর হাজারো মানুষের কলরব। নামে মাছের মেলা হলেও এ মেলাও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এ মেলার বাতাসে ছড়িয়ে পড়া হাজারো মাছের আঁশটে ঘ্রাণ আপনাকে নিশ্চিত করবে যে মেলাটি মাছের। মাছকে উপলক্ষ করে জমে ওঠা এসব বিশাল মেলা জুড়ে থাকে গরম জিলাপি, ঝোল মাংসের ধোঁয়া ওড়া তরকারি আর পরোটা, ডিম ভুনা, তিলুয়া-বাতাসা, খই-মুড়িসহ নানা রকম মৌসুমি ফল, শিশুদের খেলনা, কিশোরী-তরুণীর প্রসাধনী, কাপড়চোপড়, বাঁশ-বেত আর কাঠের আসবাব, ঘর-সংসারের নানা রকম মাটির বাসন, কাঠের জিনিস, লোহালক্কড়ের সামগ্রী। আরও থাকে নাগরদোলা, বায়স্কোপসহ হরেক রকম চোখ ধাঁধানো পণ্য।

এই মেলাগুলো বর্তমানে এলাকার এমনকি দেশের ঐতিহ্যেরই অংশ হয়ে গেছে। এরকম দুটি মাছের মেলার নানাবিধ তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতেই আমার ক্ষুদ্র এই প্রয়াস। মেলা দুটির একটি হচ্ছে মৌলভীবাজারের শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা আর অন্যটি বগুড়ায় ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মাছের মেলা। দুটি মেলাই মাছের হলেও ঐতিহ্য আর বিশেষত্বে রয়েছে নিজস্বতা।

মৌলভীবাজারের শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা: ২০১১

স্থান: মৌলভীবাজার সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর দুই তীর জুড়ে
সময়: প্রতিবছর পৌষ মাসের আটাশ থেকে ত্রিশ তারিখ পর্যন্ত। মূলত মেলা জমে ওঠে উনত্রিশ তারিখে।
উল্লেখযোগ্য মাছ: বাঘাইর বা বাঘ, বোয়াল, গজার, চিতল, রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্ফু, পাবদা, কালিয়ারা, ঘাগট, টেংরা, পুঁটি আইড়সহ বিশাল বিশাল মাছ। ৩০-৩৫ কেজি ওজনের বোয়াল আর ৬২ কেজি ওজনের বাঘাড় এবারের রেকর্ড।
মাছের উৎস: কুশিয়ারা নদী, সুরমা নদী, মনু নদী, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, কাওয়া দিঘি হাওর, হাইল হাওরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের (বিশেষত খুলনা, নাটোর ও রাজশাহী) ছোট-বড় নদ-নদী আর খাল-বিল আর মৎস্য খামার সমূহ।
মাছের দর-দাম: ছোট আকারের মাছের দাম হাঁকানো হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের মাছের দাম হাঁকানো হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ। দাম যতই হাঁকানো হোক না কেন একটা সময় পর একেকটা মাছ আকার ভেদে বিক্রি হয় ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৮০ কেজি ওজনের বাঘাইর মাছ ৮৫ হাজার টাকা হাঁকা হলেও শেষ পর্যন্ত পঞ্চাশ হাজার টাকায় তা বিক্রি হয়েছে। ১৫ কেজি ওজনের ১টি বোয়াল মাছের দাম হাঁকা হয় ২২ হাজার টাকা। ৫০ কেজি ওজনের বাগাইর মাছের দাম হাঁকা হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীর সংখ্যা: মাছের আড়ত ৩০-৪০টি আর খুচরা ব্যবসায়ীর সংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিনশ।
ব্যবসার পরিমাণ: পঞ্চাশ লাখ টাকার উপরে মাছ বিক্রি। অন্য একটি সূত্রে জানা যায় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে।
ইজারা মূল্য: ১০ লাখ ১৮ হাজার টাকা। আয়কর ও ভ্যাটসহ ইজারা মূল্যসহ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৩ হাজার ৬শ’ টাকা।
বিশেষত্ব: সার্বজনীনতা তথা ধর্ম, বর্ণ সকল মানুষের মিলন মেলা। ২ কিমি জুড়ে বিস্তৃত দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা, ১০ হাজার লোকের আগমন ঘটে (অন্য সূত্রানুসারে লাখো মানুষের ঢল নামে।)
ঐতিহ্য: প্রায় দু’শ’ বছর (কোন কোন তথ্য-সূত্রানুসারে একশ বছর) পূর্বে পৌষ সংক্রান্তির উৎসবকে কেন্দ্র করে যে মেলাটি শুরু হয়েছিল তা আজ এই রূপ লাভ করেছে।
অন্যান্য: মাছ ছাড়াও ফার্নিচার গৃহস্থালি সামগ্রী, খেলনা সামগ্রী, নানা জাতের দেশীয় খাবারের (পিঠা-পুলি আর মুড়ি-মুড়কি ইত্যাদি) দোকানসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যের কয়েক হাজার দোকান ছাড়াও বায়স্কোপ, সার্কাস ও চরকি খেলার আয়োজন
তথ্যসূত্র: বাংলাটাইমস২৪, ১৪ জানুয়ারি ২০১১; বাংলাটাইমস২৪, ১৫ জানুয়ারি ২০১১; প্রথম আলো, ১৬ জানুয়ারি, ২০১১; প্রথম আলো, ১৫ জানুয়ারি, ২০১১, সমকাল, ১৫ জানুয়ারি ২০১১; কালের কণ্ঠ, ১৩ জানুয়ারি ২০১১; দৈনিক খোয়াই, ১৬ জানুয়ারি ২০১১; সমকাল, ২৪ জানুয়ারি, ২০১১

 

বগুড়ায় ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মাছের মেলা: ২০১১

স্থান: বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ী বন্দর সংলগ্ন পোড়াদহ
সময়: প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখযোগ্য মাছ: রুই, কাতল ,পাঙ্গাশ, বোয়াল, সিলভার কাপ মাছ প্রচুর এসেছিল মেলায়।  দুই মন কুড়ি কেজি ওজনের বাগার মাছ আর আধা মন ওজনের রুই এবারের রেকর্ড।
মাছের উৎস: যমুনা ও বাঙ্গালী নদী এবং এর আশেপাশের খাল, বিল, নদী ইত্যাদি ও মৎস্য খামার
মাছের দর-দাম: প্রায় ১০০ কেজি ওজনের এ বাঘাড় মাছটির দাম ৬০ হাজার টাকা হাঁকা হলেও পরে তা কেটে কেজি প্রতি ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ৫৫ কেজির মাছ বিক্রি হয় ৩৫ হাজার টাকায়। বড় মাছ কিনতে সক্ষম ক্রেতার সংখ্যা কম হওয়ায় কেটেও মাছ বিক্রি হয় প্রজাতিভেদে ২৫০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে।
ব্যবসায়ীর সংখ্যা:
ব্যবসার পরিমাণ:
ইজারা মূল্য:
বিশেষত্ব: প্রায় ১০০ বিঘা জমির উপরে পোড়াদহ মেলা ১ দিনের জন্য অনুষ্ঠিত হয় এবং লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে।
ঐতিহ্য: সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে প্রায় দেড়’শ বছর পূর্বে থেকে আয়োজিত হয়ে আসছে। বড় বড় মাছের পাশাপাশি এ মেলার কাঠের সামগ্রী ও মিষ্টিও খুব নামকরা। এ মেলা উপলক্ষে আশে-পাশের গ্রাম গুলিতে জামাই-মেয়েসহ সকল আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেয়ার প্রচলন রয়েছে। অতিথিদের আপ্যায়নে গ্রামে গ্রামে মুড়ি ভাঁজার ধুমও পরে যায় মেলা শুরু হবার অনেক আগে থেকেই।
অন্যান্য: বড় বড় মাছ, হরেক রকম মিষ্টি, বড়ই (কুল), কাঠ বা স্টিলের আসবাব পত্র, বিনোদনের জন্য নাগর দোলা, হোন্ডা খেলা, শিশুদের খেলনা, সার্কাস ছাড়াও প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ক্রয় বিক্রয় করা হয়। প্রায় ১৬ বছর পূর্বে থেকে পোড়াদহ মাছের মেলার পরের দিন এখানে বউ মেলা বসে। এ মেলায় শুধু মহিলারাই কেনা বেচা করে থাকে।
তথ্যসূত্র: ঢাকানিউজ২৪, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১১; দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০; সিএনএনবাংলা, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১১; অনলাইন মিডিয়া সার্ভিস, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১১;

পুনশ্চ: এক
মেলা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে আমাকে অনেক সংবাদ মাধ্যমের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। কয়েকটি বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্যের মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। তারপরও যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে যথাযথ তথ্য উপস্থাপনের। তবুও কোন তথ্যে ভুল থেকে গেলে লে মন্তব্যে অনুগ্রহকরে মন্তব্যে জানান।

পুনশ্চ: দুই
পাঠক, আমার জানা দুটি মাছের মেলার তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম। আরও তথ্য আপনাদের জানা থাকলে অনুগ্রহকরে মন্তব্যে জানান।


Visited 337 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত …

Leave a Reply