ক্যাটাগরি: উপকূলীয় ও সামূদ্রিক | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা | লাইভলিহুড

ইলিশের গ্রাম নাইয়াপাড়া: কেবলই অতীত সুখ স্মৃতি

ইলিশের গ্রাম নাইয়াপাড়া

ইলিশের গ্রাম নাইয়াপাড়া

নাইয়াপাড়া
বৃহত্তর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত চরবংশী ইউনিয়নের মেঘনার পাড়ে হতদরিদ্র গ্রাম নাইয়াপাড়া। মেঘনা নদীতে মাছ ধরাই এ গ্রামের অধিকাংশ লোকের পেশা। পূর্বে মেঘনা নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়তো। তখন এ গ্রামের লোকেরা ছিল সচ্ছল। নির্বিচারে কারেন্ট জালে জাটকা নিধন ও মহাজনী দাদন ব্যবসাসহ বিভিন্ন সমস্যায় বন্দি হয়ে এ গ্রামের লোকেরা আজ নিঃস্ব, দরিদ্র। নাইয়াপাড়ার অধিবাসীদের এখন দুঃখ দুর্দশার অন্ত নেই। এ জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রেখেছে ওদের কিছু অতীত সুখ স্মৃতি।

কষ্টের শ্মশানে পোড়া সোনালি অতীত:
প্রায় সত্তর আশি বছর আগে বরিশালের একদল নদী ভাঙা জেলে পরিবার নাইয়াপাড়া গ্রামে এসে আশ্রয় নেয়। সে সময় তারা একেবারে নিঃস্ব সম্প্রদায় ছিল না। তাদের মূল পেশা ছিল ইলিশ মাছ ধরা। সে সময় নদীতে পাওয়া যেতো প্রচুর ইলিশ। সে ইলিশ ধরার জন্য বিশেষভাবে তৈরি হতো ইলিশ জাল। বড় ফাঁসের এ জালগুলো বাড়ির নারীরা দক্ষতার সাথে তৈরি করতো। নদীতে সে জাল ফেললে বড় ফাঁসের মাঝ দিয়ে সহজে চলে যেতো ছোট মাছ জাটকা। জালে আটকা পড়তো কেবলই বড় বড় ইলিশ। জাটকা গুলো স্বাভাবিক পরিবেশে নদীর মধ্যেই বড় হতো। জেলেরাই জাটকাকে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিতো। ইলিশের জীবনচক্রের সাথে জেলেদের জীবন চক্রও পরম নিবিড়তায় জড়িত থাকতো। কারণ এই ইলিশই ছিল তাদের আয় রোজগারের প্রধান উৎস। তাদের সবার ছিল বড় বড় ইলিশের নৌকা। ছিল বড় বড় জাল। সবার ঘরে ছিল প্রাচুর্য। সুখে ভরা ছিল সবার সংসার। মেঘনার এ পাড়ে এসেও তারা কারো মুখাপেক্ষী হয়নি। কারো করুণাও ভিক্ষা করেনি। সরকারি কোন খাস জমিও দখল করেনি। এ পাড়ার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলো জায়গা জমি। সে জমিতে বানিয়েছিল সুন্দর সুন্দর বাড়ি। গাছ গাছালি লতায় পাতায় ছাওয়া ছিল সে বাড়িগুলো। অথচ মাত্র কয় বছর থেকে তাদের অবস্থার অবনতি হতে হতে তারা আজ নিঃস্ব, দরিদ্র, হতশ্রী। হতাশায় ছেয়ে গেছে তাদের জীবন স্পন্দন।

দাদনের ফেরে নাইয়াপাড়ার জেলে সম্প্রদায়:
নাইয়াপাড়ার কাদেরের দোকানের সামনে নাইয়াপাড়ার মানুষেরা অলস সময় কাটায়। অতীতের সুখ স্মৃতি রোমন্থন করে ওরা কখনো হয় আবেগ আপ্লুত, কখনো হয় ক্ষুব্ধ বিদ্রোহী। মধ্যম বয়সী মোঃ মোস্তফা জানায়, কিভাবে বরিশাল থেকে নদীর এ পাড়ে তার বাপ চাচারা এসে বসত করেছিলো। মোস্তফা জানায়, “আমার পিতা মৃত সুলতান আহম্মেদ ব্যাপারী। এক সময় বরিশালের মেঘনা নদীতে আমাদের বসত ভিটা ভেঙে গেলে প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে এখানে চলে আসে। আমাদের একমাত্র পেশা মৎস্য ধরা। আমরা জেলে সম্প্রদায়। এক সময় আমরা প্রচুর ইলিশ মাছ ধরতাম। এই ইলিশ থেকেই আমাদের জীবন জীবিকা চলতো। আমাদের সুখের সময় একদল মুখোশধারী বন্ধু আসলো। তারা আমাদেরকে আরও লাভ দেখিয়ে লোভী করে তুলল। তারা আমাদেরকে দাদনের জালে জড়িয়ে ফেললো। সে আরও জানায়, তাদের অসহায়ত্ব আর সরলতার সুযোগে দাদন ব্যবসায়ীরা কীভাবে নির্মম শোষণ করেছিলো। তারা টাকার অংক ঠিকই ধরেছিল কিন্তু সরাসরি টাকা না দিয়ে, দিয়েছিলো মাছ ধরার সরঞ্জাম। সে সরঞ্জামের দাম ধরেছিল স্বাভাবিক বাজারের দ্বিগুণ তিনগুণ। কেউ প্রতিবাদ করলেই নেমে আসতো অমানুষিক নির্যাতন। সে আরও জানায়, একশ টাকায় আমাদেরকে দিতো বিশ/পঁচিশ টাকা। যে সুতার দাম ছিল পাঁচ হাজার টাকা সে সুতার দাম ধরা হয়েছিলো দশ হাজার টাকা, যে কাঠের মূল্য ছিল সিএফটি পাঁচশ টাকা ঐ কাঠ আমাদের কাছে ধরেছিল নয়শ টাকা। এই ভাবে দুইদিকে শোষণ করতো তারা। নগদ টাকা না দিয়ে মাল দিয়ে ঋণী করেছে। এই ঋণ পরিশোধ কখনো হতো না। আমরা এখন জড়িয়ে গেছি এক কঠিন ষড়যন্ত্রের জালে। আমরা কিছুই করতে পারিনি। এখন আমরা নদীতে মাছ ধরলেই তারা সামনে এসে দাঁড়ায়। মোঃ মোস্তফা অভিযোগ করেন, মৎস্যজীবী সেজে এই এলাকার প্রভাবশালীরাই নদীতে জাটকা ধরছে। তারাই জাটকা নিধনের প্রধান হোতা। তারাই দাদন দিয়ে নাইয়াদের নিঃস্ব করে ফেলেছে। পুলিশ এদের অতি কাছের লোক। পুলিশ আসলে ভেট দিয়ে বিদায় করে। এরা অসাধু ব্যবসায়ী। মোস্তফা আরও জানায় ‘আমরা এখন সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। আমাদের বাপ চাচার কেনা ঘর দুয়ার বেচে এখন ওদের দাদনের টাকা শোধ করতে হচ্ছে। দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমরা এখন বাঁচতে চাই। সরকার খাস জমি বন্দোবস্ত দিলে আমরা এখন কিছুটা বেঁচে থাকতে পারবো। ওরা যদি জাটকা ধরা বন্ধ করে তা হলে নদীতে অচিরেই ইলিশ পাওয়া যাবে।

মেঘনার বুকে ইলিশ ধরার নৌকা

মেঘনার বুকে ইলিশ ধরার নৌকা

আপনা গো মত সাহেবেরা আইসা আমাগোরে ধ্বংস করছে:
আসল কথা কইতে গেলে আপনা গো গায়ে আইসা পড়বো। একটা হইলো আল্লাহ দেয় না। তারপর হইলো ইলিশ মাছের বাচ্চা গুইলা এক ধরনের জাইল্লা আছে তারা মাইরা ফেলায়। এই যে, বাইচ্ছা গুইলা মারে এরা হইল পোয়া জাইল্লা। নেট জাল দিয়া দশটা মাছ ধরে কিন্তু দশ কোটি টাকার মাছ নষ্ট কইরা ফেলায়। আপনা গো মত সাহেব আইস্যা আমাগোরে ধ্বংস কইরছে। তারা জাত জাইল্লা না। জাইল্লার কাজ হইলো সম্মানের কাজ। জাইল্লার কাজ হইলো জ্ঞান বুদ্ধির কাজ। ওরা শুধু লক্ষ লক্ষ টাকার লোভ কইরছে। টাকার দিকে ওগো খেয়াল। নদী কেমনে বাঁইচবো, মাছ কেমনে হইবো ওরা জানে না’। ক্ষোভে আর কষ্টে কথাগুলো বলছিলেন নাইয়াপাড়ার আক্কেল আলী। বংশ পরম্পরায় এরা মাছ ধরতো। কিন্তু এখন নদীতে মাছ না পাওয়াতে তারা অন্য কাজে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আক্কেল আলী মাছ ধরা ছেড়ে খুলনার অন্য মালিকের ট্রলারে চাকরি নিয়েছেন। পরিবার পরিজন নাইয়া গ্রামেই থাকে। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসেন। মাছ না পাওয়াতে অনেকে ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর গিয়ে বদলার কাজ করে।

আক্কেল আলী আরও জানান, জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত নদীতে বড় ইলিশ থাকে। আষাঢ় শ্রাবণ মাসের ইলিশ থাকে তরতাজা। তারপর এরা ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার পর মাছগুলো খুব কাহিল হয়ে পড়ে। নাইয়ারা জানায়, নদীর পানি দেইখা আমরা কইতে পারে ইলিশে ডিম ছাড়ছে। তখন আমরা সাবধানে থাকি। ডিমগুলা যেন নষ্ট না হয় সেই ভাব করি। পোনাগুলা যেন বড় হইতো পারে সেইভাবে নদীতে নৌকা বাই’। মাঘ মাস থেকে বৈশাখ পর্যন্ত জাটকার মৌসুম। এই সময় জাটকা মাছ বড় হয়। স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করে। নদীর নির্দিষ্ট কয়টি জায়গায় এরা বড় হতে থাকে। বৈশাকের শেষে বৃষ্টি হলে জাটকারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। বর্ষার শুরুতে পানি বাড়লে তারাও দ্রুত বড় হতে থাকে। জাটকার বিচরণ ক্ষেত্রগুলো রক্ষা করতে পারলে হাজার কোটি টাকার সম্পদ নদী থেকে আহরণ করা যায়। নাইয়ারা বলেন, জাটকা ব্যবসা হিরোইন ব্যবসা থেকেও ঊর্ধ্বে। কারণ নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে জাটকারা দলবদ্ধ থাকে। এ সময় জাল ঢেললেই জাটকা উঠে। কিন্তু যারা জাটকা ধরে তাদের বোধ বিচার বলে কিছুই নাই। যারা জাটকা ধরে তারা আপনা গো মত কোট প্যান্ট পরা সাহেব। এরা আমাগোরে ঘৃণা করে। জাইলার কাজ নিচু কাজ বইলা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতো। এখন এরা আইসা আমগোরে তো ধ্বংস কইরলই। দেশের সম্পদ ও ধ্বংস কইরা ফালাইছে। আমরা এখন সর্বস্বান্ত হইয়া কথা কইতে পারি না।

শ্রম শোষণের নির্মম কারাগার:
অর্ধশত ছোট বড় জেলে নৌকা। এ নৌকাগুলো দিয়েই নদীতে মাছ ধরতে যেতো জেলেরা। এখন নৌকা নিয়ে নদীতে গেলে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়। খরচ পোষায় না। অগত্যা অসহায় হয়ে অনেকেই আর নদীতে যায় না। জরাজীর্ণ অবস্থায় নৌকাগুলো পড়ে আছে। খসে খসে পড়ছে নৌকার কাঠগুলো। কেউ কেউ সে কাঠগুলো বিক্রি করে ক্ষুধা নিবারণ করছে। দারুণ দৈন্যতায় দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে ওরা শ্রমদাসে পরিণত হয়েছে। এখন ঋণের আষ্টেপৃষ্ঠে ওরা বন্দি। আবদুল আজিজ, আবদুল হালিম, মোঃ সায়েদ, মোঃ আবছার, আলাউদ্দিন মাঝি, শফি বকাউল, সামছুদ্দিন ব্যাপারী জানায়, এই জালগুলা আমরাই বানাইছি, জাল বানানোর পর সেই জালে গাব দিয়ে শুকাই। তারপর নদীতে জাল ফেলতে যাই। প্রতি খেপে দশ বার দিন থাকি। আমরা কোন ছোট মাছ ধরি না। আমরা বড় মাছই ধরি। আমরা আগে নিজেই মাছ ধরতাম। যা পাইতাম তাই হতো আমাদের সম্পদ। এখন দাদন ব্যবসায়ীরা আমাগোরে খপ্পরে ঢেলাইয়া দিছে। কি ষড়যন্ত্রের জাল তারা আমাগোর ওপর ফালাইছে তা আমরা টেরও পাই নাই। নদীতে জাল ফেলাইলেই ওরা সামনে এসে খাওড়ায়। যে মাছ একশ টাকা হেই মাছ হেরা আমগোরে দেয় বিশ টাকা। জুলুম কইরা নেয়। বাধ্য হইয়া দিতে অয়। বহুত আগের দাদন। এই কইরা শোধও হয় না আমরাও মুক্তি পাইনা। আগে আছিলাম দাদন বেগর (দাদন মুক্ত মানুষ), এখন এরা জোরপূর্বক দাদন ঘচাইয়া দিয়া আমাদেরকে দিয়া নদীতে মাছ ধইরতে বাধ্য করায়’। জেলেরা এখন উপায় খুঁজতে চায় কিন্তু জমি জিরাত নেই। নদীতে মাছ নেই। এই শ্রমজীবী মানুষদের সামনে জেগে উঠছে হাজার হাজার একর খাস জমি। প্রভাবশালীরা লুটে নিয়ে যাচ্ছে সে জমি। অথচ তিল তিল করে নিঃস্ব হতে হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে একটি শ্রমজীবী সম্প্রদায়। এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাই তাদের একমাত্র ভরসা।

যাত্রার অপেক্ষায় ইলিশ ধরায় ব্যবহৃত কয়েকটি নৌকা

যাত্রার অপেক্ষায় ইলিশ ধরায় ব্যবহৃত কয়েকটি নৌকা

এ দ্যাশে ট্যাকা দিলে সব ঠিক:
নাইয়াপাড়ার পাশের গ্রামে জন্ম মফিজুর রহমানের। বয়স ৬৫ বছর। কৃষি কাজই মূল পেশা। শৈশব থেকেই নাইয়াপাড়ার সাথে তাঁর সম্পর্ক। মফিজুর রহমান জানান, নাইয়ারা কোনোদিন জাটকা ধরতেন না। জাটকা বলে একটা কিছু আছে তা কেউ জানতো না। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যারা আইন বানায় হেরাই আইন ভাঙে। এ দ্যাশে টাকা দিলে সব ঠিক। বড় বড় লঞ্চ স্টিমার আইসা জাটকাগুলারে ঢাকা নিয়া যায়। ঢাকায় অরা দেখেন না? আমাদের এখানের বাজারে নিয়মিত জাটকা ওঠে। বাজারের আড়তদাররাই জাটকা ব্যবসায়ী। ওদের বেবাকের লগে কানেকশন। ট্যাকার লেনদেন চলে হেগর লগে। ঘুষখোররা ঘুষরে ঘুষ কয় না, এটা ঘুষ না। তারা কয় পার্র্সিনটিজ, ইন্টিরিস্ট, বিনিফিট (পার্সেন্টেজ, ইন্টারেস্ট, বেনিফিট)।

নাইয়াদের পরিবেশ সচেতনতা:
আমার বাপ দাদা কোনোদিন কারেন্ট জাল দেখে নাই। আমাদের বাপ দাদারা নদীতে ইলিশ মাছ ধরতো। সে ইলিশ মাছের জাল অন্য জালের মত না। আমরা চাঁদপুর থেইকা সুতা কিন্না আনি। সেই সুতা দিয়া আমাদের বৌ ঝি’রা জাল বানায়। মাইয়া শিখছে মায়ের কাছে, মা শিখছে নানীর কাছে এইভাবে একজনের থাইক্কা একজনে শিখা এখন মাইয়ারাই এই কাজ করে। তারাই জানে কেমনে জাল বানাইতে অইবো। জাল বানাইবার সময় জালের ফাঁকগুলা অনেক বড় বড় কইরা বানায়। যাতে ফাঁক দিয়া জাটকা গুলা এপাশ ওপাশ চলাচল করতে পারে। ধরা পড়ে শুধু বড় বড় ইলিশ। জাল গুলাইনরে বানাইয়া আমরা গাবের কষের মাইঞ্জা দেই। দুই রকম গাব আছে গেরামে। একটা অইলো গিয়া বিলাতি গাব, হেগুলো খায়। পাইকলে খুব স্বাদ। আরেক গুলা কস্ গাব। জাইল্লা গাব কয় হেইগুলারে। এই জাইল্লা গাব দেই জালে। গাব গুলারে লইয়া ঢেঁকিতে চুইরা কস কইরা লই। কস বড় বড় মোটকাতে পঁচিশ ত্রিশ দিন মুখ বন্ধ কইরা রাইখা ভাল কইরা কসানো হয়। তারপর জালগুলারে হেই কসে ভাল কইরা ভিজাইয়া রোদে শুকাই। এইভাবে কইরলে জালগুলার সুতা খুব ভাল থাকে। জাল সহজে ছিঁড়ে না। বহুদিন জাল টিকে থাকে। এই জাল দিয়া মাছ ধরলে নদীর পানি ভালা থাকে। মাছের রোগ হয় না। মেশিনে যে জাল বাইর হইছে হে গুলান ম্যালা ক্ষতি করে। আবহাওয়ার ক্ষতি করে’। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আশি বছর বয়সের বৃদ্ধ নাইয়া তাহের আলী ব্যাপারী। ঘরের মেয়েরা জাল বানিয়েছে আর তিনি দাওয়ায় বসে তা জোড়া দিয়ে দিয়ে বেঁধে নিচ্ছেন। বরিশাল থেকে প্রায় ৫৫ বছর আগে বাবা জাহের আলী ব্যাপারীর সঙ্গে এ গ্রামে আসেন। নদী আর জাল ছাড়া তিনি আর কিছুই চিনেন না। অন্য কোন কাজও জানেন না। জালগুলো বানিয়েছে তার স্ত্রী আফিয়া খাতুন। তার তিন মেয়ে পারুল, মাকসুদা, ফাতেমা তারাও জাল বানায়। মায়ের কাছে শিখেছে। যে নদী ওদের রিজিক দেয়, সে নদী আর মাছের সঙ্গে ওদের জীবনের গাঁথুনি। ওরা জানে নদী আর মাছ টিকে থাকলে ওরাও বেঁচে থাকবে। বংশ পরম্পরায় ওরা শুধু মাছই ধরে নি প্রজ্ঞা মেধা আর জ্ঞানে নদী আর মাছকেও রক্ষা করেছিল।

অসহায়ত্বের সর্বোচ্চ শিকার নাইয়াপাড়ার নারীরা:
চরম দুর্দশায় পড়ে অসহায়ত্বের শিকার হয়েছে নাইয়াপাড়ার নারীরা। এক সময় পুরুষরা সবাই যেতে নদীতে মাছ শিকার করতে। নাইয়াপাড়ার বধূরা তখন ঘরের নানান কাজে ব্যস্ত রাখতেন নিজেদের। তাদের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল নাইয়াদের তৈরি করে দেয়া। মেয়েরাই বানাতো জাল। পুরো জালটাই তৈরি করতো নারীরা। মাছ ধরার যত সরঞ্জাম সবই যোগান দিতো নারীরা। প্রতি কাটালে মাছ ধরার জন্য জেলেদের ১২/১৪ দিন নদীতে থাকতে হতো। সেই সময়ের খাওয়া-দাওয়া থেকে সমস্ত সরঞ্জাম গুছিয়ে দিতো নারীরা। সময় মত উৎসব আনন্দে বিয়ে হতো মেয়েদের। নতুন ঘর বাধার জন্য অন্যরা সহযোগিতা করতো। কিন্তু এখন সে দৃশ্য পাল্টে গেছে। অভাবের প্রথম আঘাতটা লেগেছে নারীর ওপর। অভুক্ত আর স্বামীহীন জীবনে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। অভাবের তাড়নায় সোমত্ত মেয়েদের বিয়ে হচ্ছেনা। এমনি এক মেয়ে সাবেরা খাতুন। পঁচিশ বছর। বাবা হোসেন ব্যাপারী রুগ্ন অসুস্থ। এক সময়ের অবস্থাসম্পন্ন নাইয়া। এখন বদলা দেয়। পয়সার জন্য মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন। সাবেরা খাতুন অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। ইচ্ছা ছিল অনেক পড়ালেখা করার। কিন্তু অভাবের জন্য আর পড়া হয়নি। এখন বাবার অভাবী সংসারে বোঝা হয়েই আছে। মা আয়শা খাতুন। আক্ষেপ করে বলেন, ‘মেয়ে বিয়া লাক হইয়া সময় যাইতেছে’। আমরা তারে বিয়া দিবার পারতাছিনা। বিয়ার জন্য বেবাকে টাকা চায়। টাকা পয়সা হইলে জামাই পাওয়া যায়। আগে ঘরের মধ্যেই নারীদের ছিল নানান ধরণের কাজ। সংসারের নানান টুকটাক কাজ করে ওরা সংসারটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ঈদ পার্বণে নতুন কাপড় পড়ে হাসি আনন্দে ভরে উঠতো ছোট ছোট ঘরগুলো। মেতে উঠতো পাড়া। মাত্র কয় বছরে সে সব আর নেই। এখন অন্যের কাজ করে সামান্য যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে সংসার চলে। কখনো সোয়াবিনের ক্ষেত পরিষ্কার করা। সোয়াবিনের বিচি তুলে দেয়া। সোয়াবিন ভেঙ্গে ঝাড়ানোর কাজ করতে হয় ওদের। নিজেদের জাল নেই। মাঝে মাঝে অন্যদের জাল বুনে দেয় নারীরা। মাছের আকাল। নদীতে মাছ নেই। জীবনেরও আকাল বয়ে যাচ্ছে ওদের।

ধুলো জঞ্জালে ঢাকা রীণার শৈশব:
নাইয়াপাড়ার মা-বাবা হারা রীণা। নাইয়াপাড়ার সবার যখন প্রাচুর্য ছিল তখন রীণার জন্ম হয়নি। এখন তার বয়স সাত আট বছর। মা-বাবা হারা রীণা বড় ভাই আলতাফ হোসেনের কাছে থাকে। সোয়াবিনের ধূলা জঞ্জালের ভিতর কাজ করে যাচ্ছিলো সে। সন্ধ্যার পরও কুলার মধ্যে সোয়াবিনের দানা ঝেড়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করছে। চার মাইল দূরে চর থেকে সারাদিন তপ্ত রোদে পুড়ে সোয়াবিন তুলে ছিল সে। তারপর আটি বেঁধে মাথায় বোঝা করে এনেছে নাইয়াপাড়ায়। কাজ করছিলো তার বড় বোন খালেদা বেগমের সাথে। খালেদার স্বামী শাহ আলম আজ ক’বছর পঙ্গু হয়ে গেছে। মাছ ধরতে পারে না। তা ছাড়া নদীতে তো মাছই নেই। এখন সোয়াবিন তোলার কাজ করে কোন রকমে দিন যায়। আলতাফ জানায়, দশ বার বছর আগে তাদের অবস্থা খুব ভাল ছিল। ইলিশ মাছের আয়ে বাড়িতে সুন্দর চারচালা টিনের ঘর তুলেছিল। সে ঘর এখন ভেঙ্গে ঝাঁজরা হয়ে আছে। ঘরটি দেখলেই বুঝা যায় ঘর বানানোর রুচিটিও ছিল সুন্দর। বাবা ছিল হাফিজ উদ্দিন ব্যাপারী। রীণার জন্মের পরই তিনি মারা যান। কষ্ট আর দৈন্যতায় বেড়ে উঠছে রীণা। এখন অন্য নারীদের সাথে সেও কাজ করে। সারাদিন পায় দশ বার টাকা। স্কুলে একটা নাম লিখিয়েছে। চর বংশী প্রাইমারী স্কুল। কিন্তু স্কুল তেমন যাওয়া হয় না। ছেঁড়া বইয়ের পাতায় জমে ধূলার আস্তর। আগামি স্বপ্ন আর দেখতে পায় না রীণা। এখন ধূলোর জঞ্জালে ঢাকা পড়ে আছে রীণার সোনালি শৈশব।


View Larger Map
গুগল ম্যাপে লক্ষীপুর জেলা (A: রায়পুর উপজেলা)

পুনশ্চ:
লেখাটি এর আগে নিচের দুটি পাতায় প্রকাশিত হয়েছে-

পুন: পুনশ্চ:

  • জেলেদের সাক্ষাতকারের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা এ লেখায় তাদের মুখের কথা অবিকল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে ফলে এ লেখায় জেলেদের জবানিতে যে বর্ণনা রয়েছে তাতে আঞ্চলিক ভাষা বজায় রাখা হয়েছে এবং সে অংশে প্রমিত বাংলা বানান অনুসরণ করা হয় নি।

 


Visited 54 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question? Ask here

Visitors' Opinion

লেখক

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, পুরাতন হাস্পাতাল সড়ক, মাইজদি কোর্ট, নোয়াখালী-৩৮০০ । যোগাযোগ: ফোন: ০৩২১৬১৪৭০ (বাসা), সেল: ০১৭১১২২৩৩৯৯, ইমেইল: mhfoez@gmail.com। বিস্তারিত

Leave a Reply