ক্যাটাগরি: বিদেশী মাছ | মাছ | মাৎস্য সম্পদ

বাংলাদেশের বিদেশী মাছ: কনভিক্ট সিচলিড, Convict Cichlid, Archocentrus nigrofasciatus

কনভিক্ট সিচলিড, Convict Cichlid, Archocentrus nigrofasciatus

কনভিক্ট সিচলিড, Convict Cichlid, Archocentrus nigrofasciatus

মধ্য আমেরিকার মাছ কনভিক্ট সিচলিড (Convict Cichlid, Archocentrus nigrofasciatus) এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে থাইল্যান্ড থেকে সর্বপ্রথম আমাদের দেশের নিয়ে আসে বাহারি মাছের ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য বড় শহরের (যেমন চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ইত্যাদি) বাহারি মাছের দোকানে এই মাছের দেখা মেলে।

শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান (Systematic position)
পর্ব: Chordata (chordates)
শ্রেণী: Actinopterygii (Ray-finned fishes)
বর্গ: Perciformes (perch-like fishes)
পরিবার: Cichlidae (cichlids)
গণ: Archocentrus
প্রজাতি: Archocentrus nigrofasciatus (Günther, 1867)

শব্দতত্ত্ব (Etymology)
Borstein (2014) অনুসারে গণ Archocentrus শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Arch অর্থাৎ পায়ু (anus) এবং গ্রিক শব্দ kentron অর্থাৎ হুল বা তীক্ষ্ণ আল (sting) থেকে যা পায়ুপাখনার কণ্টকিত পাখনা রশ্মির বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে প্রজাতি nigrofasciatus শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ nigro অর্থাৎ কালো (black) এবং গ্রিক শব্দ fasciatus অর্থাৎ ডোরাকাটা (striped) থেকে। আর সাধারণ নাম “Convict Cichlid” অর্থাৎ “আসামি সিচলিড” নামটি এসেছে এই মাছের দেহের সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগের জন্য। যুক্তরাজ্যের আসামীদের জন্য নির্ধারিত পোশাকের সাদা-কালো ডোরাকাটা (White-Black strip) দাগের সাথে এই মাছের দেহের সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগের মিল থেকেই এর নাম হয়েছে “Convict Cichlid” অর্থাৎ “আসামি সিচলিড”।

সমনাম (Synonyms)
Archocentrus nigrofasciatus (Günther, 1867)
Cichlasoma nigrofasciatum (Günther, 1867)
Cryptoheros nigrofasciatus (Günther, 1867)
Heros nigrofasciatus Günther, 1867

সাধারণ নাম (Common name)
বাংলা: কনভিক্ট সিচলিড, জেব্রা সিচলিড
English: Convict Cichlid, Zebra cichlid, Zebra chanchito

বিস্তৃতি (Distribution)
এই মাছের আদিবাস মধ্য আমেরিকা। প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে গুয়েতেমালা (Guatemala) থেকে কোস্টারিকা (Costa Rica) এবং আটলান্টিক (Atlantic) মহাসাগরের দিকে হন্ডুরাস (Honduras) থেকে পানামা (Panama) পর্যন্ত এদের বিস্তৃতি দেখতে পাওয়া যায় (Tropicalfishsite, 2014)।
তবে বাহারি মাছ হিসেবে এই মাছ পৃথিবীর দেশে দেশে বিস্তার লাভ করেছে যেমনটা করেছে বাংলাদেশ।
Fishbase (2014) অনুসারে প্রকৃতিতে এদের বিস্তৃতি 15°N – 8°N।

সংরক্ষণ অবস্থা (Conservation status)
IUCN 2013 অনুসারে আইইউসিএন এর হুমকিগ্রস্ত প্রজাতির লাল তালিকায় (The IUCN Red List of Threatened Species) এদের অবস্থান Not Evaluated অর্থাৎ এই মাছ সংরক্ষণ অবস্থা এখনও মূল্যায়ন করা হয়নি।

দৈহিক গঠন (Morphology)
পার্চ আকৃতির (perch like) দেহ পার্শ্বীয়ভাবে বেশ চাপা। জেব্রার মত এদেরও সারা দেহে (মাথা ও পাখনা ব্যতীত) সাদা বর্ণের মাঝে কালো বর্ণের ডোরাকাটা দাগ উপস্থিত। অন্যান্য সিচলিড মাছের মত এদের পৃষ্ঠ পাখনার শেষ প্রান্ত তীক্ষ্ণ (pointed) এবং পুচ্ছ পাখনার শেষ প্রান্ত গোলাকার। এদের দুটি পার্শ্বরেখা দেখতে পাওয়া যায়।
এদের পৃষ্ঠপাখনায় ১৭-১৯টি কণ্টকিত ও ৭-৯টি নরম পাখনা রশ্মি, পায়ু পাখনায় ৮-১০টি কণ্টকিত ও ৬-৭টি নরম পাখনা রশ্মি উপস্থিত (Fishbase 2014)।

সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য (Maximum length)
এরা ৬ ইঞ্চি বা ১৫ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে (Harrington, 2014)। অন্যদিকে Borstein (2014) অনুসারে এদের পুরুষেরা ৬ ইঞ্চি ও স্ত্রীরা ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে।বাংলাদেশে এই মাছের নথিভুক্ত সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১০ সেমি (Galib and Mohsin, 2011)।

আবাস্থল (Habitat)
এরা উষ্ণ জলের স্বাদুপানির মাছ। পরিণত মাছেরা হ্রদ, প্রবাহিত জলাশয় যেমন ছোট পাহাড়ি ছড়া ও ঝর্ণা (creeks and streams) এবং খরস্রোতা নদীর অগভীর এলাকায় থাকতে পছন্দ করে।

খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস (Food and feeding habit)
প্রকৃতিতে এরা শিকারি মাছ হলেও উদ্ভিদজাতীয় খাবারও খেয়ে থাকে। এরা বিভিন্ন ধরনের কীট (worms), ক্রাস্টেশিয়ানস (crustaceans), জলজ পতঙ্গ (insects), ছোট ছোট মাছ এমন কি জলজ উদ্ভিদাংশ (plant matter) (Mills and Vevers, 1989)। জলাশয়ে শেওলার প্রাধান্য থাকলে এরা প্রচুর পরিমাণে শেওলা খেয়ে থাকে।
বাহারি মাছের দোকানে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের প্যাকেটজাত বাণিজ্যিক মাছের খাবার যেমন- ফ্লেকস (flakes), পিলেট (pellets) ইত্যাদি এরা খেয়ে থাকে। এছাড়াও এরা জীবন্ত খাবার যেমন- ব্রাইন শ্রিম্প (brine shrimp), মাইসিস শ্রিম্প (mysis shrimp), ছোট ছোট ক্রিল (krill), রক্ত-কীট (bloodworms) ইত্যাদি খেয়ে থাকে। এমনটি এ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা ছোট আকারে জীবন্ত মাছও এরা শিকার করে খায়।

জীবনকাল ও প্রজনন (Lifecycle and Breeding)
এদের জীবনকাল আট থেকে দশ বছর বা তার কিছু বেশি (Fishlore 2014)।
এদের পুরুষ ও স্ত্রী মাছ আলাদা। একই বয়সের পুরুষেরা স্ত্রীদের চেয়ে সামান্য লম্বা হয়ে থাকে। পুরুষদের মাথা স্ত্রীদের চেয়ে তুলনামূলক বেশী গোলাকার। প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী মাছের উদরের দিকে গোলাপি থেকে কমলা বর্ণ ধারণ করে (তবে প্রজনন ঋতুতে অনেক সময় পুরুষদের উদরের বর্ণও কমলা হতে পারে।)। অন্যদিকে পুরুষে পৃষ্ঠ পাখনা স্ত্রীদের চেয়ে লম্বা ও শেষপ্রান্ত তীক্ষ্ণ (pointed) হয়ে থাকে। ডিম ধারণ করায় পরিপক্ব স্ত্রী মাছদের উদর কিছুটা স্ফীত হওয়ায় অভিজ্ঞরা সহজেই এদের আলাদা করতে পারেন। এরা দেড় ইঞ্চি লম্বা হলেই প্রজননে উপযোগী হয়ে থাকে (Borstein, 2014)
এরা জলাশয়ের তলদেশস্থ বালির গর্ত, পাথরের আড়াল, গুহা, সুরঙ্গ, গর্ত ইত্যাদিতে ডিম দিয়ে থাকে। মা-বাবা উভয়ে মিলে ডিম ও বাচ্চার যত্ন নিয়ে থাকে। তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে ডিমপোনা বের হয় এবং পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যেই ডিমপোনার কুসুম থলি মিলিয়ে যায় এবং প্রকৃতি থেকে খাবার সংগ্রহ শুরু করে।
অন্যান্য সিচলিড এর চেয়ে এই মাছ এ্যাকুয়ারিয়ামে প্রজনন করানো সহজ। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের সহজেই প্রজনন করানো যায়। বড় আকারের এ্যাকুয়ারিয়ামে প্রতি সপ্তাহে পঞ্চাশ ভাগ পানি পরিবর্তনের ব্যবস্থা থাকা ভাল। প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামে অন্য প্রজাতির বা ভিন্ন বয়সের কনভিক্ট সিচলিড মাছ রাখা অনুচিত। এরা সহজেই জুটি গঠন করে এবং পরিণত মায়েরা প্রতি মাসেই ডিম ডিম পেড়ে থাকে। প্রতিবারে মায়েরা ১০০-১৫০টি ডিম দিয়ে থাকে। ডিমের আশ্রয়ের জন্য পাথরের টুকরা ব্যবহার করে গুহা সদৃশ কাঠামো, ফুলদানী, মাটির পাত্র, পিভিসি পাইপ ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়।
এরা প্রজনন এলাকায় (breeding territory) অন্য মাছের উপস্থিতি পছন্দ করে না। অন্য মাছ যাতে উপস্থিত না থাকতে পারে তার জন্য এদের মাঝে আক্রমণাত্মক আচরণ পরিলক্ষিত হয়।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এসময় খাবার হিসেবে আর্টেমিয়ার (Artemia) তথা ব্রাইন শ্রিম্পের (Brine Shrimp) বাচ্চা ইত্যাদি খাবার হিসেবে সরবরাহ করতে হয়। এছাড়াও চূর্ণ করা ফ্লাক্স (flakes) বা পিলেটও (pellet) সরবরাহ করা যায়। .

উপযোগী পরিবেশ (Suitable Environment)
স্বাদুপানির এই মাছ জলাশয়ের তলদেশের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। প্রকৃতিতে এই মাছের অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে- পিএইচ (pH): ৭-৮, হার্ডনেস (Hardness): ৯-২০ dH, এবং তাপমাত্রা: ২০-৩৬ ডিগ্রী সে (Fishbase, 2014)।
Fishlore (2014) অনুসারে এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের অনুকূল তাপমাত্রা ৭০-৮০° ফা. বা ২১-২৭° সে., হার্ডনেস (Hardness): ১০-১৫ dH এবং পিএইচ ৭-৮।
Harrington, 2014 অনুসারে এদের জন্য সহনশীল মাত্রা: পিএইচ ৬.৫-৮.৫, তাপমাত্রা ৬৫-৮৫° ফা. বা ১৮-৩০° সে.।

রোগ (Diseases)
বাংলাদেশে এই মাছে র রোগের উপস্থিতি বিষয়ক কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic importance)
এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী এর চাহিদা রয়েছে। শক্ত প্রকৃতির এই মাছের ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ায় যারা এ্যাকুয়ারিয়ামে বাহারি মাছ পালন শুরু করতে আগ্রহী তারা এই মাছ নির্বাচন করতে পারেন নিশ্চিতভাবেই।
এছাড়াও পোনা উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
মাছের আচরণবিদ্যা গবেষণায় গবেষণা প্রাণী হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে।
তেলাপিয়ার মত এই মাছও প্রকৃতিতে উন্মুক্ত হয়ে পড়লে তা প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নানাবিধ বাস্তুতাত্ত্বিক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারনা করা হয়। প্রধানত শিকারি ও আক্রমণাত্মক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশীয় মাছের উপর এই মাছের ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দেয়।

বাজার মূল্য:
বাংলাদেশে ১৫০ টাকায় এক জোড়া কনভিক্ট সিচলিড মাছ পাওয়া যায় (Galib and Mohsin, 2011)।

 

তথ্য সূত্র (References)

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply