ক্যাটাগরি: বিদেশী মাছ | মাছ | মাৎস্য সম্পদ

লাল পাকু, Red Pacu, Piaractus brachypomus

লাল পাকু, Red Pacu, Piaractus brachypomus

লাল পাকু, Red Pacu, Piaractus brachypomus

লাল পাকু বাংলাদেশে থাই রূপচাঁদা বা পিরানহা নামে পরিচিত। এই মাছকে ইংলিশে Pirapitinga, Red Pacu, Red belly Pacu, Red Belled Pacu ইত্যাদি নামে ডাকা হয়ে থাকে। এছাড়াও এরা Vegetarian Piranha নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Piaractus brachypomum (Cuvier, 1818)।

মাছটির শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান –
রাজ্য (Kingdom): Animalia
পর্ব (Phylum): Chordata
শ্রেণী (Class): Actinopterygii
বর্গ (Order): Characiformes
গোত্র (Family): Serrasalmidae
গণ (Genus): Piaractus
প্রজাতি (Species): P. brachypomus

মাছটির অন্যান্য বৈজ্ঞানিক নাম (Synonyms):
Myletes brachypomus Cuvier, 1818
Colossoma brachypomum (Cuvier, 1818)
Myletes paco Humboldt, 1821
Colossoma paco (Humboldt, 1821)
Myletes bidens Spix & Agassiz, 1829
Colossoma bidens (Spix & Agassiz, 1829)
Reganina bidens (Spix & Agassiz, 1829)
Wateina fowleri Amaral Campos, 1946

দৈহিক গঠন:
আমাদের দেশের রূপচাঁদার সাথে এর দৈহিক আকার ও আকৃতির সাদৃশ্য রয়েছে। তবে রূপচাঁদার সাথে এর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো হল রূপচাঁদায় এডিপোজ পাখনা, কানকুয়া ও দাঁত নেই কিন্তু পাকুর এডিপোজ পাখনা (পৃষ্ঠদেশে পৃষ্ঠপাখনার পশ্চাদে), কানকুয়া ও দাঁত (মানুষের দাঁতের সদৃশ) রয়েছে।
সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য: নথিভুক্ত সর্বোচ্চ আদর্শ দৈর্ঘ্য প্রকৃতিতে ৮৮ সেমি (৩৫.২ ইঞ্চি) এবং এ্যাকুয়ারিয়ামে ৬০ সেমি (২৪ ইঞ্চি)।

ভৌগলিক বিস্তার:
আদিবাস কলম্বিয়া (Colombia), ভেনিজুয়েলা (Venezuela), পেরু (Peru), বলিভিয়া (Bolivia) ও ব্রাজিল (Brazil) আমাজন (Amazon) ও রিও-ওরিনোকো (Rio Orinoco) নদী অববাহিকায়। বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বিশেষত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চাষের মাছ এবং এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে বিস্তার লাভ করেছে।

আবাস স্বভাব (Habit and Habitat):
এরা নদীর মূলধারা ও এর অববাহিকায় বাস করে। নদীর নিকটবর্তী প্লাবনভূমি, প্লাবিত বনাঞ্চল ইত্যাদির কম স্রোত বিশিষ্ট অগভীর এলাকায় যেখানে জলজ উদ্ভিদের উপস্থিতি রয়েছে সেখানে এরা বাস করতে পছন্দ করে। এরা শান্ত মাছ হিসেবে বিবেচিত।

খাদ্য খাদ্যাভ্যাস:
প্রকৃতিতে এরা প্রধানত শাকাশী (herbivorous)। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে বন্য ফল, নাট ও বীজ। তবে সুযোগ পেলে এরা বিভিন্ন পতঙ্গ, প্রাণী-কণা (), ছোট ছোট মাছ ইত্যাদিও খেয়ে থাকে। তাই বৃহৎ পরিসরে বলা যায় এরা সর্বভুক (omnivorous)।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এরা বিভিন্ন ধরণের খাবার খেয়ে থাকে যেমন পিলেট (pellet), ফল (আপেল, কলা, পিচ, আঙ্গুর), পালং শাক, লেটুস পাতা, ডাল, সবজি ( বাঁধাকপি, গাজর) ইত্যাদি।

এ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবস্থাপনা:
এ্যাকুয়ারিয়ামের আদর্শ আকার: ৩০০x৯০x৯০ সিসি (১২০x৩৬x৩৬ কিউবিক ইঞ্চি) যার পানি ধারণ ক্ষমতা ২,৫৫০ লিটার। তবে ৯৪৬ লিটার পানিতেও এরা দিব্যি ভাল থাকে। পানির তাপমাত্রা: ৭৩-৮২ ডিগ্রী ফারেনহাইট (২৩-২৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড)। পিএইচ (pH): ৬.৫-৭.৫। তবে ৪.৮-৭.৫ মাত্রাতেও এরা দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। হার্ডনেস ০-১৫°H। লবনাক্ততা: স্বাদুপানি। বসবাসের স্তর: মধ্যস্তর। এরা শান্তি প্রিয় হলেও ছোট আকারের মাছ খেয়ে ফেলতে পারে। তবে সম বা বড় আকারের মাছ খায় না। এ্যাকুয়ারিয়ামে একই আকারের অন্য মাছের সাথে সহজেই পালন করা যায়।

জীবনকাল প্রজনন:
এরা ৫-১৫ বছর বা তার বেশী বেঁচে থাকে। একটি চীনা রেস্টুরেন্টে ২০ বছরের বেশী বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। হরমোন ব্যবহার করে সহজেই প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে এদের বাচ্চা উৎপাদন করা যায়। স্ত্রী মাছের উদর পুরুষদের চেয়ে স্ফীত ও অধিক গোলাকার আকারের হয়ে থাকে। পুরুষেরা স্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশী উজ্জ্বল হয়ে থাকে এবং এদের উদরে লাল বর্ণের উপস্থিতি স্ত্রীদের চেয়ে বেশী পরিলক্ষিত হয় বিশেষত প্রজনন ঋতুতে।

মৎস্য গুরুত্ব:
এরা জলজ উদ্ভিদ ও উদ্ভিদাংশ, পানিতে পতিত ফল, নাট ইত্যাদি খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে বাস্তুতাত্ত্বিক ভারসাম্যে ভূমিকা রাখে। খাবারের মাছ হিসেবে এর চাহিদা রয়েছে। এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে এর জনপ্রিয়তাও কম নয়।

পুনশ্চ:

অনেক সময় অসাবধানতাবসত লাল পাকুকে (Red Pacu, Red belly Pacu, Red Belled Pacu) লাল পিরানহা (Red Piranha, Red belly Piranha, Red Belled Piranha) হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে অথবা লাল পিরানহার বর্ণনায় লাল পাকু মাছের ছবি ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার ফলে পাকু ও পিরানহা মাছের প্রজাতি দুটি শনাক্তকরণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে যায়। এর কারণ মূলত লাল পাকু ও লাল পিরানহা এর মধ্যে বাহ্যিক পার্থক্য অতি সামান্যই যদিও খাদ্যাভ্যাস ও স্বভাবে রয়েছে বড় ধরণের পার্থক্য। যার ফলে মাছের এই প্রজাতি দুটি শনাক্তকরণে ভুল করার অবকাশ থেকে যায়। এজন্য লাল পাকু ও লাল পিরানহার মধ্যে পার্থক্য জানা থাকা জরুরী। লাল পাকু ও লাল পিরানহার মধ্যে পার্থক্য বিস্তৃতভাবে চিত্রসহ নিচে দেয়া হল। (ছক আকারে পার্থক্য রয়েছে এখানে)

দাঁতের গঠন:
দাঁতের গঠন দেখে খুব সহজেই পাকু ও পিরানহা পার্থক্য করা যায়। পাকু মাছের দাঁত অনেকটা মানুষের দাঁতে মত চতুর্ভূজাকার, ভোঁতা ও সোজা অন্যদিকে পিরানহার দাঁত ত্রিভূজাকার, তীর্যক, বাহিরের প্রান্ত সুতীক্ষ্ণ ও রেজরের মত ধারালো। পাকুর দাঁত দুই বা ততোধিক সারিতে থাকে অন্যদিকে পিরানহার দাঁত এক সারিতে থাকে।

লাল পাকুর উপরের চোয়ালের দাঁতের বিন্যাস

লাল পাকুর উপরের চোয়ালের দাঁতের বিন্যাস

লাল পাকুর নিচের চোয়ালের দাঁতের বিন্যাস

লাল পাকুর নিচের চোয়ালের দাঁতের বিন্যাস

লাল পাকুর উভয় চোয়ালে দাঁতের বিন্যাস

লাল পাকুর উভয় চোয়ালে দাঁতের বিন্যাস

লাল পিরানহার উভয় চোয়ালে দাঁতের বিন্যাস

পিরানহার উভয় চোয়ালে দাঁতের বিন্যাস

লাল পিরানহার দাঁতের সারির একাংশ

পিরানহার দাঁতের সারির একাংশ

 

চোয়ালের গঠন:
পাকু মাছের নিচের চোয়াল তুলনামূলক কম স্থূল ও কম মাংসল অন্যদিকে পিরানহার নিচের চোয়াল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী স্থূল ও মাংসল।

পিরানহা ও পাকুর চোয়ালের গঠনগত পার্থক্য

পিরানহা ও পাকুর চোয়ালের গঠনগত পার্থক্য

পিরানহা

লাল পিরানহা (Red piranha, Red belly Piranha, Red bellied Piranha, Pygocentrus nattereri Kner, 1858)

লাল পাকু, Red Pacu, Piaractus brachypomus

লাল পাকু, Red Pacu, Piaractus brachypomus

 

পরিপাকতন্ত্র, খাদ্যাভ্যাস স্বভাব:
পাকুর পরিপাকনালীর দৈর্ঘ্য তার মোট দৈর্ঘ্যের প্রায় তিন গুণ । এরা সর্বভুক (Omnivorous) অর্থাৎ এরা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় প্রকারের খাবারই খেয়ে থাকে, তবে প্রধানত উদ্ভিদভোজী (Herbivorous) ও শান্ত প্রকৃতির। অন্যদিকে পিরানহার পরিপাকনালীর দের্ঘ্য তার মোট দৈর্ঘ্যের প্রায় সমান। এরা সম্পূর্ণভাবে মাংসাশী (Carnivorous) অর্থাৎ কেবলমাত্র প্রাণীজাতীয় খাবারই খেয়ে থাকে। হিংস্র শিকারি মাছ হিসেবে পিরানহার পরিচিতি পৃথিবীব্যাপী।

পাকুর পরিপাকতন্ত্রের অঙ্গসংস্থান

পাকুর পরিপাকতন্ত্রের অঙ্গসংস্থান

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
পাকু মাছ ও এর পরিপাকতন্ত্র, চোয়াল ও দাঁতের ছবি তুলে দিয়েছেন বিডিফিশের লেখক SM Galib (শামস মুহাম্মদ গালিব), N Chaki (নিপা চাকী) এবং FH Fahad (ফয়জুল হাসান ফাহাদ) যাদের মেধা, সময় আর পরিশ্রম ছাড়া এই ছবিগুলো এখানে প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। তাদের সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

 

তথ্যসূত্র:

  • Froese R and Pauly D (Editors) (2017) Species Summery: Piaractus brachypomus (Cuvier, 1818), Pirapitinga . World Wide Web electronic publication. Retrieved on 01 February 2017 and from http://www.fishbase.org/summary/5808.
  • IUCN (2017) IUCN Red List of Threatened Species. http://www.iucnredlist.org/
  • John R. Quinn (1992) Piranhas: Fact and Fiction. TFH Publications. 128pp.
  • Rahman AKA (2005) Freshwater Fishes of Bangladesh. The Zoological Society of Bangladesh, Dhaka. p. 116.
  • Sabrina Hossain (2015) Piranha??? Or something else!!!. Scientificbangladesh.com. Retrieved on 01 February 2017 and from http://www.scientificbangladesh.com/en/news/piranha—-or-something-else!!!#.WHonNcncgX0
  • Seriouslyfish (2017) Species Profile: Piaractus brachypomus, seriouslyfish.com. Retrieved on 01 February 2017 and from http://www.seriouslyfish.com/species/piaractus-brachypomus/
  • Mike FishLore (2017) Species Profile: Red Pacu, fishlore.com. Retrieved on 01 February 2017 and from http://www.fishlore.com/profiles_red_pacu.htm
  • Wikipedia (2017) Pacu. Retrieved on 01 February 2017 and from https://en.wikipedia.org/wiki/Pacu

আরও পড়তে পারেন:

  • Chattarje N. and Mazumdar B. 2009. Induced breeding of pacu (Piaractus brachypomus) in captivity with pituitary extract. Aquaculture Asia Magazine, 14(2): 23.
  • Innes, W. 1966. Exotic Aquarium Fishes. Neptune, NJ: T.F.H. Publications, Inc.
  • Nelson, J. 2006. Fishes of the World, Fourth Edition. Hoboken, NJ: John Wiley & Sons, Inc..
  • Smith, R. 1992. Alarm signals in fishes. Reviews in Fish Biology and Fisheries, 2: 33-63.

Visited 88 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question? Ask here

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply