ক্যাটাগরি: জলাশয় | মাৎস্য সম্পদ

জলাভূমির গুরুত্ব

জলাভূমি বলতে এমন একটি স্থান বা এলাকা কে বোঝায় যার মাটি মৌসুমভিত্তিক বা স্থায়ীভাবে আদ্র বা ভেজা থাকে। সাধারণভাবে জলাভূমি উচ্চ উপাদনশীল একটি বাস্তুতন্ত্র। রামসার কনভেনসন (Ramser Convention) অনুযায়ী জলাভূমি বলতে বোঝায় নিচু ভূমি যার পানির উৎস প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম, পানির স্থায়িত্বকাল সারাবছর বা মৌসুমভিত্তিক, পানি স্থির বা গতিশীল, স্বাদু, আধা-লবনাক্ত বা লবনাক্ত, এছাড়াও কম গভীরতাসম্পন্ন সামুদ্রিক এলাকা যার গভীরতা ছয় মিটারের কম ও অল্প স্রোত যুক্ত।

আমাদের দেশের নানারকম জলাভূমির মধ্যে রয়েছে প্লাবনভূমি, নিচু জলা, বিল, হাওর, বাওর, জলমগ্ন এলাকা, উন্মুক্ত জলাশয়, নদীতীরের কাদাময় জলা, জোয়ারভাটায় প্লাবিত নিচু সমতলভূমি এবং লবনাক্ত জলাধার ইত্যাদি। এছাড়া সমগ্র পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের জলাভূমি দেখা যায় যথাঃ মার্শ (marshes), মোহনা (estuaries), মাডফ্ল্যাট (mudflats), ফেনস (fens), পকসিনস (pocosins), সোয়াম্পস (swamps), ডেলটাস (deltas), কোরাল রিফ (coral reefs), বিলাবগস (billabongs), লেগুন (lagoons), সেলো সিজ (shallow seas), বগ (bogs), লেক (lakes) ইত্যাদি।

বলা হয়ে থাকে যেখানে পানি সেখানেই মাছ। পৃথিবীর মোট আহরিত মাছের দুই তৃতীয়াংশ আসে জলাভূমি থেকে। তাই মৎস্য খাতে জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়াও জলাভূমির রয়েছে হাজারো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বসমূহ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো-

বন্যা নিয়ন্ত্রনঃ
জলাভূমি প্রাকৃতিক পানির আধার এমন কি উ‍‍‌ৎস হিসেবেও কাজ করে। বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি ধারন করে বন্যা নিয়ন্ত্রন করে।

পানির গুনাগুন উন্নয়নঃ
জলাভূমি পানির রাসায়নিক উপাদান নিয়ন্ত্রন করে ও অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান শোষন করে পানির গুনাগুন উন্নতকরনের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রাখে। এছাড়া জলাভূমি দূষিত পানি বিশুদ্ধকরনেও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।

খাদ্য উৎপাদনঃ
জলজ বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদক হিসেবে জলাভূমির ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীর মোট উৎপাদনশীলতার ২৪% জলাভূমি নিয়ন্ত্রন করে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রানীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে|
এছাড়াও পৃথিবীর প্রায় তিন বিলিয়ন জনসংখ্যার (যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক) প্রধান খাদ্য ভাত যা আসে ধান থেকে আর এই ধানের বেশীরভাগই উৎপাদিত হয় জলাভূমিতে।

জলজ প্রাণীর বাসস্হান ও সংরক্ষণঃ
জলাভূমি মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রানীর বাসস্হান হিসেবে কাজ করে| মাছ চাষের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে জলাভূমির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য প্রজাতি সংরক্ষণেও সংরক্ষিত জলাভূমি গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করে।

অতিথী পাখীর আশ্রয়স্থলঃ
আমাদের দেশে মূলত শীতকালে আগত অভিপ্রয়ানকারী পাখীর প্রধান আশ্রয়স্থল হিসেবে যেমন জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে তেমনই তাদের খাবারের প্রধান উৎস্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয় জলাভূমি।

সাংস্কৃতিক মুল্যঃ
পৃথিবীর অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। আমাদের দেশের হাওর এলাকার সংস্কৃতি অন্য এলাকা থেকে আলাদা। এ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার ধরণ ও আচার-অনুষ্ঠানের উপর হাওরের প্রভাব অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তেমনইভাবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে বনকে কেন্দ্র করে যা সহজেই অন্য এলাকার সংস্কৃতি থেকে তাদের করেছে বৈচিত্র্যময়।

পর্যটন শিল্প ও বিনোদনের উৎসঃ
পৃথিবীর অনেক দেশেই জলাভূমিকে উপলক্ষ্য করে পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বছরের বিভিন্ন সময় অবসর কাটানোর জন্য আমাদের দেশের বিশিষ্ট জলাভুমি যেমন সুন্দরবন, কাপ্তাই লেক, হাকালুকি হাওর ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিস্তার লাভ করতে পারে সেই সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে যেমন: মাছ শিকার, পাখি দর্শন, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ প্রভৃতি|

বিবিধঃ
জলাভূমিতে জন্মানো নানাবিধ উদ্ভিদ রান্নার জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাগজ তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে অনেক জলজ উদ্ভিদ। এছাড়াও জলাভূমি পাট পঁচাতে এমন কি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সহজ ও স্বল্পব্যয়ী যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জলাভূমি ভূমিকা রাখতে পারে যেমন আমাদের দেশের কাপ্তাই লেক।

বিঃদ্রঃ অনেকটা নিরবেই কেটে গেল বিশ্ব জলাভূমি দিবস ২০১০। প্রতি বছর ২ ফেব্রুয়ারীতে পৃথিবী জুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার-এ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশসমূহ কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ড (Convention on Wetlands) নামক একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরবর্তিতে এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ১৫৮ টি দেশ স্বাক্ষর করে এবং পৃথিবীর ১৬৯ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ১৮২৮টি সাইট আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়। আমাদের দেশের টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবন সেই তালিকায় স্থান পায়। এই দিবসকে স্মরণ করে বিডিফিশে এই লেখাটি প্রকাশ করা হল।


Visited 340 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

গবেষক, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্তারিত

Leave a Reply