ক্যাটাগরি: জলাশয় | মাৎস্য ব্যবস্থাপনা | মাৎস্য সম্পদ | স্বাদুপানি

মরে যাচ্ছে দেশের ছোট-বড় নদীঃ বর্তমান ও ভবিষ্যত

প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন প্রত্রিকায় দেশের কোন না কোন নদী মরে যাবার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। নদীমাতৃক এই দেশে নদী মরে যাবার খবরে যে প্রতিক্রিয়া হবার কথা তা হতে দেখা যায় না। কিন্তু এই নদীর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত দেশের বেশিরভাগ মানুষের ভাগ্যলিপি। তাই এই লেখায় দেখানোর চেষ্টা করা হবে কিভাবে নদীগুলো মরে যাচ্ছে এবং নদীগুলোকে বাঁচানোর উপায় কী? প্রথমেই দেখে নেয়া যাক দেশের দৈনিক পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ।

গত ৯ মে ২০১০ তারিখের প্রথম আলোর আলোকিত উত্তরে “একসময়ের স্রোতস্বিনী আত্রাই আজ মৃতপ্রায়ঃ হারিয়ে যাচ্ছে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- একসময় স্রোতস্বিনীর নদী আত্রাই আজ শুকিয়ে নালা, কোথাও বা শুষ্ক বালি আবার কোথাও বা চলছে ধান চাষ। অথচ একসময় শুশুকের তাড়া খেয়ে বড় বড় বোয়াল, চিতল নদী থেকে লাফ দিয়ে চলমান নৌকায় উঠে আসার মতো ঘটনাও ঘটতো। আজ সেই নদী হারিয়েছে তার যৌবন হারিয়েছে ঐতিহ্য সেই সাথে মৎস্য সম্পদ। এই নদী শুকিয়ে যাওয়ায় নৌ-পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে মাছ হারিয়ে জেলেরা হারিয়েছে তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পেশা, কৃষকেরা বঞ্চিত হয়েছেন জমিতে সেচ দেয়ার সুযোগ থেকে, স্থানীয় বাসিন্দারা বিশেষত গৃহবধূরা হারিয়েছেন গেরস্থালির নানা কাজ যেমন কাপড় কাচা, গোসল করার সুযোগ। অন্যদিকে বর্ষায় এ নদী যাও বা একটু বেঁচে ছিল তাকেও সম্পূর্ণ ভাবে মেরে ফেলার জোর পরিকল্পনা চলছে। জানা যায় রাবার ড্যাম করে শুষ্ক মৌসুমের জন্য পানি সংরক্ষণ করা যায় কি না, সেটাই ভাবা হচ্ছে। সেটি হলে এর চূরান্ত এবং চিরস্থায়ী মৃত্যর ষোলকলা পূরণ হতে বেশী সময় লাগবে না।

গত ১ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে ঝালকাঠি ওয়েব এর “স্লুইজ গেটের মরণ ফাঁদে মরে যাচ্ছে নদীমাতৃক ঝালকাঠির ২৯৩ টি খাল ॥ আসন্ন শুকনো মৌসুমে গ্রামীন নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে॥ অলস পড়ে আছে কোটি টাকার প্রকল্প” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়- ঝালকাঠিতে অসংখ্য নদী-খাল জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু স্লুইজ গেটের মরন ফাঁদে পড়ে মরে যাচ্ছে ঝালকাঠি জেলার ২৯৩টি খাল। পানি আটকে রাখার জন্য ঝালকাঠির ২৯৩ ও কাউখালীর ১১টি খাল মিলিয়ে মোট ৩০৪টি খালে স্থাপন করা হয় স্লুইজ গেট। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ১১২টি খাল, রাজাপুরে ৭৬টি, নলছিটিতে ১০৫টি এবং পিরোজপুর জেলার কাউখালীর ১১টি খাল ব্যবহার করা হয়। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্ম দিয়ে জমিতে নালার মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে কৃষি কাজে পানি সরবরাহ করাই ছিল এর প্রথম পর্যায়ের উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্যায় বহুল ও প্রযুক্তিগত নানা সমস্যায় এ পদ্ধতি ভেস্তে যায়। ফলশ্রুতিতে স্লুইজ গেটের মরণ ফাঁদে মরে যাচ্ছে নদীমাতৃক ঝালকাঠির ২৯৩ টি খাল।

গত ২২ মে ২০১০ তারিখের আমার দেশ অনলাইনের প্রকাশিত “বৃহত্তর ময়মনসিংহের নয় সীমান্ত নদীর বেহালদশা : মরে যাচ্ছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- উজানের বাধায় জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের ৯টি আন্তর্জাতিক নদীর এখন বেহালদশা। শুকনো মৌসুমে মরা গাঙে পরিণত হয় অভিন্ন নদী জিনজিরাম, চিতলখালী, ভোগাই-কংস, নিতাই, সোমেশ্বরী, জাদুকাঠা-রক্তি, জালুখালী, নায়াগাঙ ও উমিয়াম। অভিন্ন নদীগুলোর পানি প্রবাহ কমতে থাকায় প্রায় মরে যাচ্ছে ময়মনসিংহ-জামালপুরের প্রধান নদ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। শুকনো মৌসুমে উজান থেকে আসা পানির পরিমাণ দিনকে দিন কমতে থাকায় নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার ৯টি সীমান্ত নদী খুবই ছোট। এগুলোর উত্পত্তি ভারতের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে। বর্ষায় নদীগুলো থাকে অত্যন্ত খরস্রোতা। আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে উপচে পড়ে নদীগুলো। প্লাবিত হয় (ফ্লাশ ফ্লাড) নদীতীরের বাসিন্দাদের বাড়িঘর। আর শুকনো মৌসুমে হয়ে পড়ে প্রবাহ বিহীন। তখন সেচকাজের পানিও পাওয়া যায় না। নব্বইয়ের দশক থেকেই শুরু হয় ব্রহ্মপুত্রের মরণদশা। নদের বুকে চর পড়ে ভরাট হয়ে গেছে মাইলের পর মাইল। ব্রহ্মপুত্র নদ এখন হেঁটেই পার হওয়া যায়। অনেক স্থানে এখন হাঁটু পানি। সাধারণ নৌকা চলার সময়েই আটকে যায়, শুকনো মৌসুমে পণ্যবাহী নৌকা বা ট্রলার চলার উপায় থাকে না। ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন শাখা নদীপথেও নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এরই মধ্যে পেশা পরিবর্তন করেছে। নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং নদের তীরবর্তী বাজারগুলো অচল হয়ে পড়েছে। ব্রহ্মপুত্রের উভয় পাড়ের উর্বর পলি মাটিতে প্রতিবছরই আবাদ হয় নানা ফসল। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকরা সময়মতো সেচ দিতে না পারায় তাদের আবাদকৃত কৃষিপণ্যের উত্পাদন মার খাচ্ছে। মরে যেতে থাকা গাঙ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে । নদের পাড়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতভিটা। চলছে অবৈধ দখল।

গত ০৩ অক্টোবর ২০১০ তারিখ রবিবার দৈনিক ইত্তেফাকে হাবিবুর রহমান বাদল এর “বিষাক্ত বর্জ্যে শীতলক্ষ্যা মরে যাচ্ছে নদী বাঁচাতে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়- শীতলক্ষ্যাও এখন বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শিল্প বর্জ্য আর নর্দমার ময়লায় সয়লাব শীতলক্ষ্যা। দশ লাখের বেশী মানুষের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা চলে এই নদীতেই। পানির সঙ্গে সেই ময়লা একাকার হয়ে পানি আর পানি থাকে না। কলকারখানার বর্জ্য আর মানুষের সৃষ্ট বর্জ্যের ভয়াবহ দূষণে অত্যাধুনিক বিদেশী প্লান্টেও এ নদীর পানি বিশুদ্ধ করা যাচ্ছে না। বিশুদ্ধ করার পরও পানিতে দুর্গন্ধ থেকেই যায়। পানির দুর্গন্ধে নদীর পাড়ে বাস করাও কষ্টকর। ডাইং শিল্পকারখানার বর্জ্যই ৮০ শতাংশ। এছাড়াও কারখানাগুলোর বর্জ্যের ড্রেনেজ সিষ্টেম রয়েছে সরাসরি শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গায়। শিল্প-কারখানা থেকে ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিন, নানা ধরনের এসি দস্তা, নিকেল, সিসা, ফসফোজিপসাম, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি।

আমাদের প্রতিদিনে “মরে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- যে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল রাজধানী ঢাকা, সেই নগরীর মলমূত্র, আবর্জনা, রাসায়নিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে নদীটি। বুড়িগঙ্গার পানি আর পানি নেই। বিষ হয়ে গেছে। শরীরে বিষ নিয়ে বুড়িগঙ্গা আর কতদিন বেঁচে থাকবে? সবার চোখের সামনেই ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে কালের স্বাক্ষী বুড়িগঙ্গা। রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বুড়িগঙ্গাকে। প্রতিদিন ১০ হাজার ঘনমিটারের বেশি শিল্পবর্জ্যসহ কাঁচাবাজার, গৃহস্থালি ও হাসপাতালের বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এসবের সঙ্গে রয়েছে নগরীর প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষের পয়:বর্জ্য, যার ২০ শতাংশ পরিশোধিত, ৪০ শতাংশ সেপটিক ট্যাঙ্কের মাধ্যমে আংশিক পরিশোধিত এবং বাকি ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরের গৃহস্থালি ও অন্যান্য শিল্প থেকে প্রতিদিন ৭ হাজার টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এরমধ্যে ৬৩ শতাংশ অপরিশোধিত সলিড বর্জ্য বিভিন্ন সংযোগ খালের মধ্য দিয়ে নদীতে পড়ছে। এছাড়া ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম এমনকি পারদের মতো ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্যের ভারে নদীর অবস্থা এখন মুমূর্ষ। প্রতিদিন ৪৯টি রুটের প্রায় ১৭৫টির বেশি লঞ্চ-স্টিমার ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন টন বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলছে। এই পরিমাণ বর্জ্য থেকে টনকে টন রাসায়নিক পদার্থ পলি হিসেবে নদীর তলদেশে জমা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে প্রায় ৭ ফুট পলিথিনের স্তর জমে গেছে।

০৯ জানুয়ারী ২০১০ তারিখের সমকালে জিয়াউল হাসান পলাশের “মরে যাচ্ছে ধানসিঁড়ি” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়- ধানসিঁড়ি নদী বর্তমানে মরা রূপ নিয়েছে। দিনে দিনে এটি নাব্যতা হারানোর ফলে মিলিয়েও গেছে এককালের খরস্রোত। সেই ধারায় অতীতের ১১ মাইল দীর্ঘ ধানসিঁড়ি নদী ভরাট হতে হতে বর্তমানে এসে ৪ মাইলে ঠেকেছে। শুধু তা-ই নয়, ক্রমে ক্রমে শীর্ণ হয়ে পড়ায় তা এখন খাল হিসেবেই পরিগণিত। শুরুতে ধানসিঁড়ি নদীটি সুদীর্ঘ থাকার পাশাপাশি প্রায় ৫শ’ ফুট প্রশস্ত ছিল। নদীর দুপাশ দিয়ে আরও দুটি নদী প্রবাহিত। এর একদিকে ঝালকাঠির সুগন্ধা, অন্যদিকে কাউখালির জাঙ্গালিয়া নদী প্রবহমান। নদী থেকে রূপান্তরিত এই খালটি ১৮ থেকে ২০ হাত চওড়া। শুকনো মৌসুমে পানির গভীরতা থাকে ২ হাত।

৪ জুলাই ২০১০ তারিখের দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত “কপোতাক্ষ-ভৈরবের শাখা নদী মরে যাচ্ছে: বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি থাকে সামান্য” শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- সাজেদ রহমান দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভৈরব এবং কপোতাক্ষ থেকে বের হওয়া নদীগুলো বর্ষার কয়েক মাস পানি থাকে, বাকি সময়গুলো শুকিয়ে যায়। আর নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ নদীর দু’তীরে দখল করে বসতবাড়ি-মার্কেট তৈরি করছে। দখল হয়ে যাচ্ছে নদী। আবার এর ফলে বর্ষা মৌসুমে অনেক সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে অনেক এলাকায়। নোনা পানি ঠেকাতে বিদেশীদের পরামর্শে ১৯৬০-এর দশকে উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প (কোস্টাল এমব্যাঙ্কমেন্ট প্রজেক্ট, সংক্ষেপে সিইপি) গ্রহণ করা হয়। নির্মাণ করা হয় ২ হাজার মাইল বেড়িবাঁধ, ৭শ’ ৮০ স্লুইস গেট ও ৯২টি পোল্ডার। কিন্তু অপরিকল্পিত এসব পোল্ডার বৃহত্তর এলাকায় মৃত্যু ফাঁদ হয়ে দেখা দিয়েছে। মোট নির্মিত ৯২টি পোল্ডারের মধ্যে ৩৯টি বৃহত্তর খুলনা জেলায়, যার ২৪টি পোল্ডারই যশোর খুলনা অঞ্চলের এই জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী। পোল্ডার এবং স্লুইসগেট নদীর পানির স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করছে। ফলে ভৈরব-কপোতাক্ষের অসংখ্য শাখা ও উপনদী এখন মৃত। ইতোমধ্যে এই সব নদীর শাখা নদী বেতনা, মুক্তেশ্বরী, হরিহর, শ্রীনদী, টেকা, ভদ্রা, বুড়িভদ্রা, সালতা, শোলমারি, তেলিগাতি, হামকুড়ো, ময়ূর মরে গেছে। নদী মরে ভয়ঙ্কর জলাবদ্ধতার শিকার এই অঞ্চলের ২৭টি বিল, এক কথায় যাদের পরিচয় বিল ডাকাতিয়া নামে।

পরিমল মজুমদার মুক্তমনায় “মরে যাচ্ছে তিস্তা” শিরোনামের পোষ্টে লিখেছেন তিস্তার পানি প্রবাহ এ এযাবতকালের সর্ব নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তিস্তা ব্যারাজ থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার পর্যন্ত নদী এখন মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। স্রোত না থাকায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। ১৯৭৭ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ভারত একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার দূর্বার গতিকে থামিয়ে দেয়। এর ৭০ কিলোমিটার ভাটিতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মিত হলে নদীর স্রোতধারা ক্ষীণ হয়ে সরু ফিতার আকার ধারণ করে। এর প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে গেছে। তিস্তার শাখা-প্রশাখা গুলো পানির অভাবে মরে গেছে। পরিবেশের উপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। মরুকরণ প্রক্রিয়া দ্রুততর হওয়ায় বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও বিভিন্ন ধরণের গাছ-পালা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে হারিয়ে গেছে পাখির দল। বর্ষা কালেও নদীতে আর এখন দেখা যায় না ঘড়িয়াল কিংবা শুশুক। মাছও নেই, একারনে মাছের আকাল এখন তিস্তায়। নদী মরে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় দু’দেশের দু’টি ব্যারাজকে। তিস্তা নদীকে বাঁচাতে হলে এর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে।

৪ মার্চ ২০১০ তারিখের আমারদেশ অনলাইনে প্রকাশিত “বাংলাদেশ ঘিরে ১৪ মিনি ফারাক্কা” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘বাংলাদেশ ঘিরে এখন ১৪ ‘মিনি ফারাক্কা’। ভারত নির্মিত এসব ‘ফারাক্কার’ কারণে মারাত্মক পানি সঙ্কটে পড়ছে বাংলাদেশ। দু’দেশের মধ্যে প্রবহমান অভিন্ন নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি কোনো আন্তর্জাতিক আইন-কানুনেরও তোয়াক্কা করছে না।’ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিয়া মুহাম্মদ আদেল সম্প্রতি এক লেখায় এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন। ‘ভাটির দেশগুলোকে দ্বিগুণ ভোগান্তিতে ফেলে উজানের দেশগুলো একই পরিমাণ লাভবান হচ্ছে’ শীর্ষক এই লেখায় তিনি বিশ্ব পানি পরিস্থিতি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন পদ্ধতি, পানির প্রবাহ আটকাতে বাঁধ নির্মাণে করণীয় ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেন। তার লেখা অনুযায়ী ফারাক্কার মতো বড় বাঁধ ছাড়াও বাংলাদেশের চারপাশ ঘিরে কমপক্ষে ১৪টি মিনি ফারাক্কা বাঁধ দিয়েছে ভারত। এছাড়া ছোট ছোট বিভিন্ন নদীতেও বাঁধ দেয়া হয়েছে। এর ফলে মার্চ থেকে মে—এই শুষ্ক মৌসুমে মারাত্মক পানি সঙ্কটে পড়ছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পানির প্রবাহ ঠিক না থাকায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে বন্যা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

উল্লেখিত প্রতিবেদন গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নদী মরে যাবার কারণে শুধু মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে না ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, হারিয়ে যাচ্ছে মাছ, জলচর পাখি, উভচর, সরীসৃপ আর জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। যার পরোক্ষ প্রভাব ঘুরে ফিরে আবার মানুষের উপরই পরতে বাধ্য। তাই প্রয়োজন নদীর এই মরণ প্রক্রিয়াকে থামানো। তার আগে দেখে নেয়া যাক নদী মরে যাবার প্রত্যক্ষ কারণগুলো। নদী মরে যাবার প্রধান কারণ হচ্ছে-

  • উজানে বাঁধ দিয়ে শুষ্ককালে পানি প্রত্যাহার করায় ভাটি অঞ্চলের নদী গুলো প্রাকৃতিকভাবে যে পরিমাণ পানি প্রাপ্তির অধিকার রাখে তা না পাওয়া। ঠিক একই ভাবে বর্ষা কালে অতিরিক্ত পানি হঠাৎ ছেড়ে দেয়ায় পানি ও এর সাথে মাত্রারিক্ত পলি এসে একই সাথে ভাঙ্গন এবং পলি পতনের ঘটনা ঘটায় নদী তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে।
  • বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, স্লুইজগেট ও বাঁধসহ সেচ প্রকল্প, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ব্রিজসহ রাস্তা নির্মাণ, ইত্যাদি অপরিকল্পিত অবকাঠামো নদী প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করে ফেলছে।
  • কল-কারখানার বর্জ্য কোনরকম ট্রিটমেন্ট ছাড়াই নদীতে সরাসরি নিক্ষেপ করার ফলে শিল্প কারখানা অধ্যুষিত এলাকা যেমন- ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা ইত্যাদি এলাকার নদীগুলো মাত্রারিক্ত দূষণের শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে একই সাথে চলছে নদী দখলের মতো ঘটনা যার ফলে নদীগুলো তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী বাঁচাতে হলে নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য গুলো ফিরিয়ে দিতে যা যা প্রয়োজন তা করাই হবে এর প্রকৃত সমাধান। একটি মিথ্যা যেমন চক্রাকার শত মিথ্যার জন্ম দেয় তেমনই নদী বাঁচাতে একটা কৃত্রিম কার্যক্রম বাস্তবায়ন শত শত কৃত্রিম কার্যক্রমের জালে আমাদের জড়িয়ে ফেলে। কিন্তু বাস্তব সমাধানে পৌঁছা সম্ভব হবে না। তাই প্রয়োজন প্রাকৃতিক সমাধান। নদী বাঁচানোর একমাত্র পথ হলো নদীকে তার নিজের মতো চলতে দেয়া।


Visited 108 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question? Ask here

Visitors' Opinion

লেখক

প্রফেসর, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত ...

Leave a Reply