ক্যাটাগরি: মান নিয়ন্ত্রণ | মাৎস্য প্রযুক্তি

মাছ ও ফরমালিন: প্রেক্ষিত নিরাপদ খাদ্য

মাছে ভাতে বাঙ্গালি। শুধু বাংলাদেশই নয় সারা বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গেলে মাছের নাম সবার আগে এসে যায়। খাদ্য হিসেবে মাছ সারা দুনিয়াতেই জনপ্রিয়। প্রাণিজ আমিষ এর চাহিদা মেটাতে আর অপুষ্টিজনিত সমস্যা দূর করতে খাদ্য হিসেবে গুনগুন বিচারে মাছ সবার উপরে।

ফুড সেফটি বা নিরাপদ খাদ্য কথাটা আমাদের দেশের জন্যে খুব একটা আলোচিত বিষয় নয়। নদী নালার এ দেশে অতি পচনশীল হয়া সত্বেও মাছ নষ্ট হবার মত সময় পায় না। তার আগেই আমরা মাছকে খাবারের উপযোগী করে ফেলি। তার পরেও বাজার জাত করার দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমাদের দেশে বাজারগুলোতে মাছের পচন ধরে এবং ফুড সেফটির বিষয়টা তাই চাইলেও এড়ান যায় না। মাছের ক্ষেত্রে ফুড সেফটি নিশ্চয়তা বিধান করতে বরফ হলো সবচে জনপ্রিয় মাধ্যম। বরফ জাত করার মাধ্যমেই মূলতঃ আমাদের দেশে মাছ ধরার পর দূর দুরান্তে বাজারজাত করা হয়ে থাকে।

মাছ সম্ভবত প্রাণীজগতের সব চেয়ে পচনশীল একটা প্রাণী। সঠিক ভাবে বরফজাত করতে পারলে দীর্ঘ সময় মাছ ভাল থাকে। তবে সঠিক মানের বরফ আর পর্যাপ্ত ব্যাবস্থাপনার অভাবে অনেক সময় মাছের গুনা গুন নষ্ট হয়ে যায়। এতে ফুড সেফটির বিষয়টা যতটুকুন না বিবেচিত হয় তার থেকে বেশি গুরুত্ব পায় বিক্রেতার বানিজ্যিক লোকসান বা আশিক ক্ষতি।

মাছের এই পচে যাওয়া ও বিক্রেতার আশিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে আজকাল কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী ব্যাবহার করছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক ফরমালিন। এতে মাছ দীর্ঘ সময় ধরে ভালো থাকলেও প্রকৃত পক্ষে নষ্ট হয় ফুড সেফটি। ফরমালিন মানুষের জন্য কতটা মারাত্মক তা বলে শেষ করা যাবে না। ফরমালিন মানুষের দেহে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা যেমন পাকস্থলী ক্যান্সার, দৈহিক বিকলাঙ্গতা এমন কি প্রাণহানিও ঘটাতে পারে (রস, ২০০২)। পরিতাপের বিষয় হলো এ ফরমালিন সম্পর্কে তেমন না জানে ক্রেতা না জানে বিক্রেতা। আশার বিষয় হলো সরকার সময় সময় বাজারে শুধি অভিযান চালিয়ে বিষাক্ত ফরমালিন যুক্ত মাছ ধংস করে। DOF এর তত্তাবধানে দেশের সবচে বড় মাছ বাজার কাওরান বাজারে বিনা মূল্যে ফরমালিন পরীক্ষার ব্যাবস্থা করা হয়েছে (বি এস এস নিউজ ২০০৯)।

কিন্তু দেশের অসংখ্য মৎস্য বাজারের তুলনায় অপ্রতুল। তাই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক- আসলে কি খাচ্ছি আমরা? দেখার কি কেউ আছে? অবস্থা এই পর্যয়ে পৌঁছেছে যে- আমাদের অনুভূতিই বোধকরি ফরমালিন দিয়ে ধুয়া, নিঃসাড়।

সম্প্রতি কালের কন্ঠে এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ঢাকার কয়েকটি মৎস্যবাজারের ভোরের চিত্র যা যে কোন ভয়াবহতাকেই যেন হার মানাতে সক্ষম। চিত্রটি নিম্নরূপ-

কারওয়ান বাজার মাছের আড়ত। ভোর ৪টা ৫০ মিনিট। তখনো ট্রাক থেকে মাছ নামানো শুরু হয়নি। বেশির ভাগ মাছ এসেছে বাগেরহাট, খুলনা ও মেঘনা ঘাট থেকে। ট্রাক থেকে মাছ নামানোর পর বেশির ভাগ মাছ হাফ ড্রামে রাখা পানিতে ধোয়া হলো। কাছে গিয়ে ফরমালিনের ঝাঁজ বুঝতে পারলে একজন আড়ত কর্মী বলেন, ‘পানিতে একটু ওষুধ দেওয়া হয়েছে।’ কেন ফরমালিন দেওয়া হচ্ছে? উত্তরে তিনি জানান, ওষুধ না দিলে মাছ পচে যাবে। কারওয়ান বাজার আড়তের ৯০ শতাংশ মাছই এই ওষুধ (ফরমালিন) মিশ্রিত পানিতে ধোয়া হয়েছে।

যাত্রাবাড়ী মাছের আড়ত। সকাল ৬টা ২০ মিনিটের কাছাকাছি। এখানকার অবস্থাও কারওয়ান বাজারের মতোই। হাফ ড্রামে ফরমালিন মেশানো পানিতে মাছ ধুয়ে তোলা হচ্ছে। জানতে চাইলে আড়ত কর্মীরা বলেন, ‘পানিতে কিছু নেই।’ পানিতে ঝাঁজ কেন? উত্তরে আড়ত কর্মী বলেন, ‘এটা মাছের গন্ধ।’

নিউমার্কেট মাছের আড়ত। সকাল ৭টা ২৫ মিনিট। ইতিমধ্যে এখানকার আড়ত থেকে মাছ কিনে খুচরা দোকানিরা বাজারে প্রবেশ করেছেন। আড়ত থেকে কেনা মাছ পানিভর্তি প্লাস্টিক বালতির মধ্যে ফরমালিন মেশানো পানিতে ধুয়ে তুলতে ব্যস্ত প্রায় সবাই। মাছ বিক্রেতারা বলেন, ‘একটু-আধটু ওষুধ না দিলে মাছ পচে যায়।’ এভাবেই প্রতিদিন রাজধানীর বাজারে মাছ প্রবেশ করার সময় ফরমালিন মেশানো পানিতে ধোয়া হয়।

অতি সাম্প্রতিক এক গবেষনায় দেখা গেছে কাওরান বাজারে আসা মাছের প্রায় ৫% মাছই ফরমালিন যুক্ত। আর এই ফরমালিন যুক্ত মাছের মধ্যে সবচে বেশি হলো রুই জাতীয় মাছ (হক, ২০০৯)। ফুড সেফটি তথা নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে জনস্বার্থে মাছের পরিবহন ও বিক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি ক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ, ভ্রাম্যমাণ অভিযান জোরদারকরণসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপূর্ণ ভুমিকা পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আজ সময়ের দাবী।


Visited 289 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?

Visitors' Opinion

লেখক

প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫, বাংলাদেশ। বিস্তারিত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.