আইপিআরএস অপারেশন নকশা, নির্মাণ এবং এর মান ও মৌলিক নীতি:

আইপিআরএস উন্নত পরিচালন দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যে সব ফ্যাক্টরগুলি বিবেচনা করতে হবে তা নিম্নরূপ:

১. পুকুরের পানির গভীরতা ২-৩ মিটার হতে হবে। পুকুরটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে সমান বা সামান্য আয়তাকার হলে ভালো হয়। ৩০০০০ ঘন মিটার এর চেয়ে বড় আয়তনের পুকুরে এ প্রযুক্তি স্থাপন করলে এর পরিচালনা করা অধিক সহজ হয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। আইপিআরএস পুকুর পরিচালনার জন্য পানির বিনিময়ের প্রয়োজন নেই; শুধু মাত্র বাষ্পীভবন এবং ওয়েস্ট কালেকশান জোন হতে প্রতিদিন ময়লা পানি ফেলে দেয়ার জন্য যে টুকু পানি নির্গমন করা লাগে শুধুমাত্র সেটুকু পানি পরবর্তীতে যোগ করার প্রয়োজন হতে পারে।

২.একটি কার্যকর আইপিআরএস খামার স্থাপনে অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা নির্ভরযোগ্য উৎস হতে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। এটি এ প্রযুক্তি স্থাপনে অন্যতম পূর্বশর্ত।

৩. আইপিআরএস এর সেলগুলোতে মজুদ করার জন্য আঙ্গুলিপোনা সমান আকারের, প্রায় একই ওজনের, পরজীবী এবং রোগমুক্ত হওয়া উচিত। রেসওয়েতে পোনা পরিবহন এবং মজুদ করার আগে রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।অবশ্যই পোনার জিনগত বিশুদ্ধতা ও অন্তঃপ্রজনন মুক্ত হতে হবে। আইপিআরএস এর সেলগুলোতে পোনা মজুদ করার আদর্শ পদ্ধতি (গ্রেডিং) ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় অর্থাৎ বিভিন্ন সেলে ছোট, মাঝারি এবং বড় আকারের আঙ্গুলিপোনা মজুত করতে হবে যাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সমস্ত সেলে মাছ উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য উপযোগী হয় অথবা সমবয়সী, সম আকৃতির মাছ মজুদ করা যেতে পারে যাতে একই সময়ে সমস্ত মাছ বিক্রির উপযোগী হয়। এলাকা বা অঞ্চল ভিত্তিক মাছের বাজার, চাহিদা নিরূপণ করে মাছের উৎপাদন পরিকল্পনা করা উচিত।

৪. আইপিআরএস রেসওয়েতে চাষ করা বিভিন্ন ধরণের মাছকে খাওয়ানোর জন্য উচ্চমান ও পুষ্টি সমৃদ্ধ (৩০% প্রোটিন) খাবার ব্যাবহার করতে হবে এবং মজুদকৃত মাছের আকার অনুযায়ী ফিড পিলেটের আকার অবশ্যই উপযুক্ত হতে হবে।

৫. রেসওয়েতে মাছ খাওয়ানোর জন্য হাত দ্বারা অথবা প্রোগ্রামযুক্ত অটো-ফিডার দ্বারা অথবা প্রয়োজন ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতি একত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। খাবারের সর্বোত্তম কার্যকারিতার জন্য ৯০% স্যাটেশন ফিডিং (মাছকে পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খাওয়ানো) কৌশল অবলম্বন করে অর্থাৎ সেলের ভেতর যে পরিমাণ মাছ থাকবে সেগুলোকে যে কোন এক বেলা যতক্ষণ খায় সে পরিমাণ খাবার হিসেব করে মাছের ফিডিং চার্ট নির্ধারণ করে খাবার দেয়া।

৬. আইপিআরএস এর মূল সেল ও সেলের বাইরে যে প্রজাতির মাছ মজুদ করা হয় তা নির্ধারিত ওজন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছালে বাজারজাত করার পরিকল্পনা করতে হবে। বাইরের অংশের মাছ প্রয়োজন ক্ষেত্রে আংশিক আহরণ করা যেতে পারে ও পুনরায় মজুদ করা যেতে পারে কিন্তু সেলের ভেতরের মাছ কোনভাবেই আংশিক আহরণ বা গ্রেডিং করে মাছ বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ সেলের ভিতর উচ্চ ঘনত্বে মাছ থাকার কারণে আংশিক আহরণের ফলে মাছগুলো মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়তে পারে ও আঘাতজনিত কারণে মাছের মৃত্যু হার বেড়ে যেতে পারে।

৭. আইপিআরএস এর যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। জেনারেটর, ব্লোয়ার, এয়ার ফিল্টার, লুব্রিকেশন পয়েন্ট, ফিস কনফিনমেন্ট গেট, ভালভ, জয়েন্ট, ফিটিংস ইত্যাদির নিয়মিত সময়সূচী প্রণয়ন করে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. আইপিআরএস একটি অত্যাধুনিক মৎস্য চাষ প্রযুক্তি। তাই এর প্রত্যেকটি ধাপে বিস্তারিত রেকর্ড যেমন পানির গুণগতমানের নিয়মিত পরিস্কার রেকর্ড, প্রাত্যহিক ফিডিং রেকর্ড, মাছের নমুনায়ন ও খাদ্য পুনঃমূল্যায়ন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, জেনারেটর ইত্যাদি মনিটরিং রেকর্ড, বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি রাখা অত্যন্ত জরুরী। এতে আইপিআরএস এর উৎপাদন সক্ষমতা ও মূল্যায়ন সহজ হয়।

৯. শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা এবং অপারেটরদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

পুকুরের নকশা:
আইপিআরএস স্থাপনের জন্য একটি পুকুরের যে আদর্শ বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে তা নিম্নরূপ:
১. পুকুরের গড় গভীরতা ২-৩ মিটার হতে হবে। যেহেতু পুকুরের আয়তন আইপিআরএস এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই আইপিআরএস প্রযুক্তি স্থাপনে পুকুরের গড় গভীরতা ৩ মিটারের বেশি হওয়া উচিৎ নয়।
২. পুকুরের চারপাশে বাধ/পাড়ের প্রস্থ থেকে উচ্চতার ঢাল ১.৫:১ বা পুকুরের ঢালের সমতল ন্যূনতম এমন হওয়া উচিৎ যাতে পাড়ের ক্ষয় রোধ হয়।একটি আদর্শ পুকুরের জন্য ঢালের অনুপাত ২:১ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এছাড়া পুকুরের ঢালের মাটির ক্ষয় প্রতিরোধে জিও শিট দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া যেতে পারে এতে পুকুরের পাড়ের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে।
৩. যে পুকুরে আইপিআরএস প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে সে পুকুর আয়তক্ষেত্রাকার হওয়া উচিত। পুকুরের দৈর্ঘ্যও প্রস্থের অনুপাত প্রায় ৩:১ হলে ভালো হয়। এর বেশী হলে (>৪:১ দৈর্ঘ্য: প্রস্থ) পানি সঞ্চালনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। পুকুরের ঢাল ও তলদেশ নিয়মিত ও মসৃণ হওয়া উচিত এতে পানির প্রবাহ ও মিশ্রণ ভালো হয়।আইপিআরএস পুকুরের গভীরতম অংশে স্থাপন করা উচিত নয় বিশেষ করে (>৩.৫ মিটার) গভীর এলাকায় আইপিআরএস তৈরি করা এড়িয়ে চলতে হবে। পুকুরের ন্যূনতম আয়তন (দৈর্ঘ্য X প্রস্থ X গভীরতা)৩০০০০ ঘনমিটার এর কম হওয়া উচিত নয়।এ আয়তনের পুকুরে ন্যূনতম তিন টি রেসওয়ে সেল তৈরি করা যায়।
৪. আইপিআরএস এর পুকুরটি এমন যায়গায় হতে হবে যেখানে বিদ্যুৎ, ও যোগাযোগের ভালো সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদিত মাছ পরিবহন, মৎস্য খাদ্য পরিবহন ও মজুদ করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে।
৫. একটি আদর্শ রেসওয়ে সেলের ভলিউম হতে হবে ২২০ ঘনমিটার এবং মাছ হতে উৎপাদিত বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রতিটি সেলের জন্য পুকুরের আয়তন সাপেক্ষে ১০০০০ ঘন মিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। চাষকৃত মাছের সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রতি ঘন মিটারে ১৫০ কেজি ও আঙ্গুলি পোনা বা মজুদ পোনা উৎপাদন প্রতি ঘন মিটারে সর্বোচ্চ ১২৫ কেজি।

আইপিআরএস এর নকশা এবং মূল নির্মাণ উপাদান:
১. হোয়াইট ওয়াটার ইউনিট: আইপিআরএস একটি প্রবাহিত পানি ব্যবস্থাপনায় মাছ চাষ পদ্ধতি।
অধিক মৎস্য উৎপাদনের জন্য অধিক খাদ্য প্রয়োগ করতে হয় ফলে প্রচুর পরিমাণ বর্জ্য নির্গমন হয় ফলে চাষের পুকুরে মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। সুতরাং উৎপাদিত বর্জ্য দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য পুকুরে একটি ধারাবাহিক পানির স্রোত ও মিশ্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইপিআরএস প্রযুক্তিতে রেসওয়ে সেলগুলোর মাথায় ও পুকুরের মাঝে হোয়াইট ওয়াটার ইউনিট কৌশলগতভাবে স্থাপন করা হয় ফলে সেলের ভেতর ও বাইরে পানির এ মিশ্রণ ও চলাচল সর্বোচ্চ নিশ্চিত হয়।
হোয়াইট ওয়াটার ইউনিট (WWU)মূলত বড় এয়ারলিফট। বৈদ্যুতিক চালিত ব্লোয়ারগুলি মুক্ত বাতাসকে বহুগুণে উচ্চ চাপে নিম্নমুখী এয়ারটিউব গুলোতে সরবরাহ করতে ব্যবহৃত হয়। ব্লোয়ারগুলিকে সাধারণত “পুনরুত্পাদনশীল ব্লোয়ার” বলা হয়। ব্লোয়ারগুলিতে ডিফিউজারে সরবরাহ করা বাতাসের পরিমাণের তুলনায় কম শক্তি প্রয়োজন(২.২৫ ঘনমিটার/মি)হয়। ডিফিউজার, “কলোরাইট অ্যারোটিউব”, সাধারণত রাবার কম্পোজিট এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম কার্যক্ষম, ছিদ্রযুক্ত টিউব যা অগভীর জলে বাতাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ডিফিউজার টিউবগুলি ৬-৭ সেমি ব্যবধানে একটি র‍্যাকের উপর ভাজে ভাজে উপরে স্থাপন করা থাকে। ডিফিউজার ট্রেগুলি একটি ভাসমান ফ্রেমের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং প্রায় ০.৯-১.২ মিটার পানির নিচে স্থির থাকে।
নিয়মিত পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে বর্তমানে বেশিরভাগ ভাগ (৫-মিটার চওড়া) WWU -তে সহজে অপসারণযোগ্য চারটি ডিফিউজার ট্রে দিয়ে সজ্জিত থাকে।
প্রতিটি ডিফিউজার টিউব থেকে নির্গত ছোট ছোট বাতাসের বুদবুদগুলির একটি আবদ্ধ ঢাকনার মাধ্যমে উপরে উঠে তীব্র স্রোত তৈরি করে। WWU রেসওয়ে সেলের সাথে ভাসমান অবস্থায় সংযুক্ত থাকে ফলে পানির গভীরতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সামঞ্জস্য করতে পারে। প্রতিটি রেসওয়ে চ্যানেলের মাথায় একটি একক WWU দিয়ে সজ্জিত থাকে।

২. রেসওয়ে সেল:
আইপিআরএস রেসওয়ে সেলগুলো নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত কাঠামো মূলত: ৫ মিটার চওড়া X ২.৩ মিটার গভীর X ৩০ মিটার লম্বা একটি আয়তক্ষেত্রাকার বক্স এর মতো যার প্রতিটি খোলা প্রান্তে মাছকে আবদ্ধ করার জন্য একটি জাল বা গ্রিল প্যানেল লাগানো থাকে।
আইপিআরএস এর সেলগুলোকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। প্রথমত সংযোগ অঞ্চল (CZ), এখানে হোয়াইট ওয়াটার ইউনিট (WWU) বসানো ও সংযুক্ত থাকে। এটা প্রতিটি সেল ওয়ালের সমস্ত দৈর্ঘ্যর ২ মিটার অংশ ব্যাবহার করে। দ্বিতীয়ত প্রোডাকশন জোন বা মাছ উৎপাদন অঞ্চল (PZ), এটি ২২ মিটার লম্বা রেসওয়ে সেল এর মূল অংশ যেখানে মাছ চাষের জন্য ব্যাবহার হয়। মূলত এ অঞ্চলটি আপস্ট্রিম এবং ডাউনস্ট্রিম কনফিনমেন্ট গেট নিয়ে গঠিত যা সংযোগ অঞ্চল (CZ) ও বর্জ্য সংগ্রহ অঞ্চল বা শান্ত অঞ্চল (QZ) কে পৃথক করে। তৃতীয়ত, নিস্তব্ধ বা শান্ত অঞ্চল হল অবশিষ্ট ৬ মিটার অংশ ও সেলের সবচেয়ে দূরবর্তী পানির নিম্ন প্রবাহের অংশ যেখানে মাছ হতে উৎপন্ন বর্জ্য, অন্যান্য জৈব কণা বা ময়লা জমা হয়। উৎপাদন অঞ্চল হতে উৎপন্ন সকল জৈব পদার্থ ও অন্যান্য থিতানো জৈবকণা পানির স্রোতে ভেসে ভেসে এখানে জমা হয়। এটিকে একটি নিষ্ক্রিয় অঞ্চল বলা যায়। এর আসল ডিজাইনে কঠিন জৈব পদার্থের জমা হওয়ার জন্য ৩ মিটার লম্বা সেগমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে এর আধুনিক হালনাগাদ করা নকশায় বর্ধিত কঠিন পদার্থ সংগ্রহ এবং অপসারণের জন্য একটি ৬ মিটার সেগমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রেসওয়ে মেঝে সম্পূর্ণ ৩০-মিটার দৈর্ঘ্য জুড়ে একটি সমতল, মসৃণ কংক্রিটের পৃষ্ঠ এবং দেয়ালগুলি সাধারণত এ মেঝের কংক্রিটের পাদদেশে তৈরি করা হয়। সেলের দেয়ালগুলো সাধারণত পুকুর পাড়ের দৈর্ঘ্যের সমান্তরালে থাকে এবং প্রতিটি দেয়ালই ধারাবাহিকভাবে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে শুরু হয়। রেসওয়ে দেয়ালের উচ্চতা পুকুরের পাড়ের উচ্চতা থেকে ২৫-৩০ সেমি বেশী হওয়া উচিৎ যাতে বৃষ্টির পানি ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে বা অতিবৃষ্টি তে সেল হতে মাছ না বেরিয়ে যেতে পারে। পুকুরের তলদেশ সমান হতে হবে এবং রেসওয়ে মেঝের উচ্চতা পুকুরের তলদেশ হতে কিছুটা উপরে হতে হবে (১০-১২ সেমি)। কারণ রেসওয়ে দেয়ালের নির্দিষ্ট ওজন কে ধরে রাখার জন্য সেলের মেঝের ভিত্তি প্রাচীর শক্তিশালী ও স্থায়ীত্বশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। রেসওয়ের মেঝের ঘনত্ব নির্ভর করে পুকুরের মাটির ধরন ও স্থায়িত্বের উপর। মেঝের ভিত্তিটাকে শক্ত ও মজবুত করতে এবং সেলের দেয়ালগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য রিইনফোর্সিং রড (১.৫ সেমি রিবার) ব্যাবহার করা হয়। ৩-৪ মিটার পর পর ব্যবধানে কনক্রিটের পিলার তৈরি করা হয় যাতে দেয়ালে কাঠামোগতভাবে নিরবচ্ছিন্ন অতিরিক্ত শক্তি পায়। রেসওয়ের সমস্ত দেয়াল ও বর্জ্য সংগ্রহ অঞ্চলে রড বাধার কাজ শেষ হলে মেঝেতে সিমেন্ট, বালি ও কনক্রিটের সমন্বয়ে ১০ সেমি পুরুত্বে ঢালাই করতে হবে।এভাবে রেসওয়ের নিচের অংশটি একটি মসৃণ, সমতল পৃষ্ঠ হিসেবে তৈরি করতে হবে যাতে পৃষ্ঠের শেষ প্রান্তে QZ অঞ্চলের সাথে সংযুক্তি ঘটে।
রেসওয়ের দেয়াল নির্মাণের জন্য টেকসই এবং কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী উপকরণ ব্যাবহার করতে হবে। সাধারণত কংক্রিট ব্লক, ইট, পাথর, রেডি মিক্স, ফাইবারগ্লাস রিইনফোর্সড প্লাস্টিক (এফআরপি), ফাইবারগ্লাস এবং হাই-ডেনসিটি পলিথিন (এইচডিপিই) ইত্যাদি দিয়ে দেয়াল তৈরির কাজ করা যায়। উপকরণের উপর ভিত্তি করে দেয়ালের ঘনত্ব ২৫-৩০ সেমি পর্যন্ত হতে পারে।

৩. প্রোডাকশন জোন বা উৎপাদন অঞ্চল (PZ):
উৎপাদন অঞ্চল (PZ) ২২ মিটার লম্বা, ৫ মিটার চওড়া ও ২.৩ মিটার গভীর আয়তক্ষেত্রাকার একটি ট্যাংক এবং এর ভলিউম ২২০ ঘনমিটার। পানির প্রবাহ ও মাছ ধরা সহজ হয় এবং মাছ হতে উৎপন্ন জৈব পদার্থ যাতে নিচের মেঝেতে জমতে না পারে এবং সহজে পানির প্রবাহের সাথে বের হয়ে যেতে পারে সেজন্য এর দেয়াল ও মেঝে সমতল ও মসৃণ থাকে। মূলত: এ অঞ্চলেই মাছ চাষ করা হয় এবং মাছকে খাওয়ানো হয়।

৪. শান্ত অঞ্চল বা বর্জ্য পদার্থ জমা হওয়ার জায়গা:
এটি আইপিআরএস এর নিচের দিকের প্রান্তে অবস্থিত শান্ত অঞ্চল। এটি আইপিআরএস এর যে কয়েকটি সেল থাকে তার সবগুলো জুড়ে থাকে অর্থাৎ সমস্ত আইপিআরএস সেল এর একটি সাধারণ সংযোগ অঞ্চল। এটি ২৫-৩০ সেমি প্রস্থ ও ২৫-৩০ সেমি উচ্চতার একটি দেয়াল দ্বারা আলাদা থাকে বা দুই ভাগে ভাগ করা থাকে। এখান থেকে কঠিন বর্জ্য পদার্থ অপশনের জন্য প্রতিটি ভাগে একটি মেকানিক্যাল সাকশান ডিভাইস স্থাপন করা থাকে।

৫. কনফিনমেন্ট গেট ও স্লট বা খাজ:
কনফিনমেন্ট গেট বা সহজ করে বলতে এটিকে একটি প্রবেশ পথের আবদ্ধকরণ অবস্থা বোঝায়। মূলত: আইপিআরএস এর রেসওয়ে সেলগুলোর বা উৎপাদন অঞ্চলের উভয়প্রান্তে (আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিম) এমন একটি নেট যা চাষকৃত মাছকে উৎপাদন অঞ্চল আবদ্ধ করতে সহায়তা করে ও সেলের ভেতর পানি প্রবাহকে সহজতর করতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গেট নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মূলত ৩০৪ স্টেইনলেস স্টিল, ফাইবারগ্লাস বা অনুরূপ শক্তিশালী কিন্তু তুলনামূলক হালকা ওজনের উপাদান দিয়ে এক কাঠামো নির্মাণ করতে হয়। পানিতে সহনশীল, সহজে জং বা মরিচা ধরে না এমন ধাতু নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরী।
রেসওয়ে সেল গুলোর দেয়াল গুলোর সামনে ও শেষের প্রান্তে ৩০ সেমি দূরত্বে অবস্থিত দুটি স্লট থাকে, প্রতিটি স্টল ৬-৭ সেমি চওড়া ও ৬-৭ সেমি গভীর করে কাটা থাকে। স্লটগুলো সাধারণত স্টিল ফ্রেমের নেট বসানোর কাজে ব্যাবহার করা হয়। এটি মাছকে নিরাপদ ও সেলের ভিতর আবদ্ধ অবস্থা নিশ্চিত করে। স্লটগুলি সমান্তরাল ও প্রতিটি দেয়ালের উপর থেকে নিচের দিকে থাকে, একই ভাবে নিওয়ালের দেয়ালের উপরে বিপরীত দিকের দেয়ালে সংশ্লিষ্ট অপর স্লটের সংযোগ স্থাপন করে। এছাড়া সেলের যে প্রান্তে সম্পূরক ভাবে অক্সিজেন সঞ্চালনের জন্য যে পাইপ বসানো থাকে সেখানেও অতিরিক্ত স্লট কাটা হয় এবং এ স্লটে ১০-১২ সেমি এর দুটি স্লট থাকে এবং প্রতিটি স্লট ৫০৬ সেমি প্রস্থ ও ৫-৬ সেমি গভীর করে কাটা থাকে। এ স্লটে সাধারণত নরম নেটের ফ্রেম থাকে।

৬. নি-ওয়াল বা স্বল্প উচ্চতা সম্পন্ন দেয়াল:
রেসওয়ে সেলের মধ্যে বাতাস যুক্ত পানি সঞ্চালন কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর জন্য , CZ এবং PZ অঞ্চলের মধ্যে প্রতিটি সেলের সম্মুখ প্রান্তে একটি স্বল্প উচ্চতার দেয়াল স্থাপন করা থাকে। এ দেয়ালের কাজ হল WWU-এর মাধ্যমে যে পানির স্রোত সামনের দিকে প্রবাহিত হয়ে সেটা যাতে পেছনেWWUতে ফিরে না আসে তা বাধা দেয়া এবং রেসওয়ের ভিতর সমস্ত পানি যাতে সেলের বাইরে থেকে প্রবেশ করে তা নিশ্চিত করা। এ ওয়াল টি মূলত: রেসওয়ে দেয়ালের সমান ঘনত্বে (২৫-৩০ সেমি) এবং একই উপকরণে তৈরি। এটা ৬০-৮০ সেমি উচ্চতা বা পানির গভীরতার উপর নির্ভর করে উচ্চতা সমন্বয় করে তৈরি করতে হয় এবং রেসওয়ের পুরো ৫ মিটার প্রস্থ জুড়ে থাকে।
এছাড়া রেসওয়ে সেলের QZ অঞ্চলের শেষ প্রান্তে আরেকটি ৩০-৪০ সেমি উচ্চতার নী-ওয়াল স্থাপন করতে হয়। এ দেয়ালটি QZ অঞ্চল হতে কঠিন বর্জ্য পদার্থ বাইরে যেতে বাধা দেয়। এছাড়া উন্মুক্ত পুকুর হতে যাতে মাছ সেলের ভিতর ঢুকতে না পারে সে জন্য এ দেয়াল কাজ করে।

৭. ওয়ার্কিং ওয়াকওয়ে:
ওয়ার্কিং ওয়াকওয়ে আইপিআরএস এর জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। মূলত: আইপিআরএস এর সমস্ত দৈনন্দিন কাজ যেমন মাছে খাবার দেয়া, মাছের নমুনায়ন, সেলের ভেতর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ, মাছের চলাচল ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, স্লটগেটে লাগানো নেট পরিষ্কার করা এবং অন্যান্য কাজ সম্পাদনের জন্য এ ওয়াকওয়ে ব্যাবহার করা হয়। সেলের শুরুর প্রান্ত ও শেষের প্রান্তে এ ওয়াকওয়ে স্থাপন করা হয়। এগুলো ন্যূনতম ১ মিটার চওড়া হতে হয়, কিন্তু এটি ১.৮ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। সাধারণত ইস্পাত, ফাইবারগ্লাস, কনক্রিট ও কাঠের তক্তা দিয়ে এ ওয়াকওয়ে তৈরি করা যেতে পারে।
এ রাস্তাগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া উচিত। এ রাস্তা গুলি এমন ভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে স্লটে লাগানো মেসনেট গুলো উঠাতে নামাতে কোন বাধা না পায়। যেমন রাস্তাগুলি নির্মাণের সময় গেট স্লটের ৩০ সেমি এর কাছাকাছি পর্যন্ত না যায়।

৮. সাপ্লিমেন্টারী এ্যারেশান বা পরিপূরক বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা:
এটি আইপিআরএস পরিচালনার জন্য একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ও মূল নীতির অংশ। এখানে একটি ব্লোয়ার মেশিন ব্যাবহার করা হয় যার মাধ্যমে উচ্চ ঘনত্ব ও নিম্নচাপের বাতাস সেলগুলোর মধ্যে সরবরাহ করা হয়। একটি স্টিল পাইপের মাধ্যমে সমস্ত সেলগুলোকে সংযুক্ত করা হয় এবং প্রতিটি সেলের দুইপাশের দেয়াল ঘেঁষে ১৫ মিটার পর্যন্ত এয়ার ডেলিভারি পাইপ বিন্যস্ত থাকে। এ ডেলিভারি পাইপের সাথে দেয়ালের প্রতিটি পাশে ১০ টি করে ড্রপ টিউব রয়েছে এবং প্রতিটি একটি ”টি” ফিটিংয়ের সাথে ডিফিউজার অ্যারোটিওব সাথে সংযুক্ত হয়। এ পাইপগুলোতে বিভিন্ন ভালভ ফিটিংস এরেশান টিউব ইত্যাদি লাগানো থাকে। এ পাইপগুলোর মাধ্যমে ব্লোয়ার হতে বাতাস পানিতে প্রবাহিত হয়।

৯. বাফেল ওয়াল:
আইপিআরএস এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাফেল ওয়াল যদিও একটি সাধারণ কাঠামো কিন্তু এ প্রযুক্তির সঠিক কার্যকারিতা এর উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। পুরো পুকুরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ জুড়ে পানির প্রবাহকে ঠিক রাখতে এবং একটি সঠিক ঘূর্ণন নিয়ন্ত্রণ করতে বাফেল ওয়ালের ভূমিকা অপরিসীম। এটি বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায় যেমন ইটের দেয়াল, মাটির তৈরি পাড় বা এইচ ডি পি ই লাইনার দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। এটি এমন ভাবে তৈরি করা যাতে পুকুরে পানির উচ্চতার চেয়ে ২০-৩০ সেমি বেশী থাকে।

বাফেল ওয়াল সাধারণত তির্যকভাবে পুকুরের একটা অংশ জুড়ে প্রসারিত থাকে এবং পুকুরের নিকটতম পাড় ও বাফেল ওয়ালের মধ্যে একটি ফাকা জায়গা নির্দেশ করে। এ ফাকা জায়গার আয়তন মূলত: আইপিআরএস এর মোট প্রস্থের ৩০০%। এ ওয়ালটি অপ্রয়োজনীয় অংশ মনে হতে পারে কিন্তু এটি না থাকলে পুকুরে পানির প্রবাহ ও পানির মিশ্রণ যথাযথ হবে না।

আগামী পর্বে থাকবে-

আইপিআরএস এ মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা
মাছের আঙ্গুলি পোনা মজুদ ক্যালকুলেটর
আইপিআরএস এ মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনা
কঠিন বর্জ্য পদার্থ অপসারণ পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা
পানির রসায়ন
রেসওয়েতে মাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
আইপিআরএস প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ সিস্টেম


Visited 293 times, 1 visits today | Have any fisheries relevant question?
ইন-পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম (আইপিআরএস) এর পরিচালন নীতি ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন: পর্ব-২

Visitors' Opinion

মোঃ আবু নাঈম

মোঃ আবু নাঈম, এম এস ইন ফিসারিজ টেকনোলজি (বাকৃবি), প্রকল্প ব্যাবস্থাপক এস এস জি এগ্রো লিমিটেড, সুপার স্টার গ্রুপ। Contact: 01717063142, nayeem_officexp@yahoo.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.